Published : 13 Jun 2026, 08:44 AM
অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, প্রতিকূল স্রোত ডিঙিয়ে, স্বপ্ন পূরণের দোরগোড়ায় অ্যান্ডি রবার্টসন। একসময় ছিলেন ‘পার্ট-টাইম’ ফুটবলার। কৈশোরে শারীরিক গড়ন লম্বাটে ছিল না বলে বাদও পড়েছিলেন। সেই রবার্টসন এখন স্কটল্যান্ড দলের অধিনায়ক। রূপকথার মতোই তার পথচলা!
কৈশোরের ক্লাব সেল্টিক থেকে প্রত্যাখ্যাত হলেও হাল ছাড়েননি রবার্টসন। কুইন্স পার্ক, ডানডি ইউনাইটেড হয়ে, হালসিটি ঘুরে রবার্টসন ২০১৭ সালে পা রাখেন আরেক স্বপ্নের ঠিকানায়, লিভারপুলে। অ্যানফিল্ডের আঙিনায় ৯টি বছর কাটিয়ে কদিন আগে ৩২ বছর বয়সী এই সেন্টার-ব্যাক যোগ দিয়েছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের আরেক দল টটেনহ্যাম হটস্পারে।
এ মুহূর্তে অবশ্য ক্লাব নয়, রবার্টসনের ভাবনা জুড়ে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ। আপাতত পরিকল্পনা গ্রুপ পর্ব নিয়ে। রোববার বস্টনে হাইতির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ‘সি’ গ্রুপে পথচলা শুরু করবে স্কটিশরা।
গ্রুপের বাকি দুই দল মরক্কো ও ব্রাজিল। রবার্টসন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে নিজেদের শেষ ম্যাচের দিকে। এটি যে তার কাছে স্বপ্নের ম্যাচ।
গ্ল্যাসগোতে জন্ম নেওয়া রবার্টসন ক্লাব ক্যারিয়ার ঈর্ষণীয় সাফল্যই পেয়েছেন। লিভারপুলের হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, এফএ কমিউনিটি শিল্ড, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, উয়েফা সুপার কাপ, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ- সব শিরোপার স্বাদ নিয়েছেন তিনি। তারপরও প্রাপ্তির খাতার একটা পাতা খালি ছিল এতদিন। বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা।
হাইতির বিপক্ষে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড বাহুতে জড়িয়ে যখন রবার্টসন বস্টনের সবুজে পা রাখবেন, শূন্য সে পাতায়ও পড়ে যাবে প্রাপ্তির আঁচড়। এসব ভাবতেই যেন তার মনের গহীনে স্মৃতি আর আবেগের ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
“এইরকম মুহূর্তে, আমার মনে হয়, এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আপনি কোথা থেকে এসেছেন, আপনার পথচলা কেমন ছিল এবং এই মুহূর্তগুলো পাওয়ার জন্য কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছেন।”
“আমি এই পথচলাকে ভালোবাসি। যে পথে হেঁটেছি, সেটাকেও ভালোবাসি। অনেক কঠোর পরিশ্রম করেছি। ত্যাগ স্বীকার করেছি। কিন্তু এর বিনিময়ে যে পুরস্কার পেয়েছি, তাতে প্রতিটি মুহূর্ত সার্থক। আমি কখনও দেশের অধিনায়ক হওয়ার কথা ভাবিনি। ছোট একটা বালক হিসেবে, অবশ্যই, স্বপ্ন ছিল দেশের হয়ে খেলা।”
ছোট বেলাতেই দাগ পড়েছিল রবার্টসনের স্বপ্নে। সাফল্য পাওয়ার মতো লম্বা গড়ন ছিল না তার। এখন যদিও তিনি ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি লম্বা, কিন্তু ১৫ বছর বয়সে ছোটখাট গড়নের ছিলেন বলে সেল্টিকের দুয়ার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার জন্য। কিন্তু দমেননি। বাধা-বিপত্তি থেকে শিখেছেন, খুঁজে নিয়েছেন ছুটে চলার পথ।
“পেশাদার ফুটবলার হওয়ার পথটা সহজ নয়। যতগুলো ড্রেসিংরুমে আমি গিয়েছি, সবখানে দেখেছি, সব ফুটবলারের চলার পথেই বাধা-বিপত্তি থাকে। আমার মনে হয়, এটা মানুষকে সহনশীল করে তোলে।”
“প্রথমবার সেল্টিকে সেই প্রত্যাখ্যানের অনূভূতি, সেখান থেকে যে দুঃখ পেয়েছিলাম এবং এর সঙ্গে চারদিক থেকে যা এসেছিল, সেটি ছিল আমার জন্য বিশাল এক মুহূর্ত। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে, লড়াই করে ফিরে আসাটাও কঠিন ছিল।”
কঠিন পথে হেঁটেছিলেন বলেই রবার্টসন এখন অনেক কিছু পাওয়ার খুব কাছাকাছি। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের আঙিনায় পা রাখতে চলেছে স্কটল্যান্ড। হাইতি ও মরক্কো ম্যাচের পর তারা মুখোমুখি হবে ব্রাজিলের। অপেক্ষা ফুরাবে রবার্টসনেরও।
বিশ্বকাপের রেকর্ড চ্যাম্পিয়নদের চেয়ে সব দিকেই যোজন যোজন পিছিয়ে স্কটল্যান্ড। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে সবশেষ দেখায় তাদের কাছে ২-১ গোলে হেরেছিল স্কটিশরা। রবার্টসন তখন চার বছরের শিশু।
আগামী ২৫ জুন মায়ামিতে ব্রাজিলের বিপক্ষে মাঠে নেমে রবার্টসনের লক্ষ্য একটাই- অতীত পরিসংখ্যানে তাকিয়ে ভড়কে যাওয়া নয়, বরং স্বপ্ন পূরণের রোমাঞ্চ নিয়ে মাঠে নিংড়ে দিতে চান সামর্থ্যের সবটুকু।
“আমার মনে হয়, আমরাই সবসময় নিজেদের ইতিহাস লিখতে চাই। স্কটিশ জাতীয় দলের ইতিহাসকে আমরা ভালোবাসি। অতীতের মানুষগুলোকে ভালোবাসি। তাদের প্রতি আমাদের অনেক শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, নিজেদের গল্পটা আমাদেরই লিখতে হবে। আমার মনে হয় না, ব্রাজিলের বিপক্ষে অতীতের ফলাফল বা ম্যাচগুলোর কোনো প্রভাব থাকবে।”
“কিন্তু আমরা জানি, এটা কঠিন একটা ম্যাচ হতে চলেছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলা সব খেলোয়াড়ের স্বপ্ন এবং অন্য মহাদেশের হলে এই সুযোগটাও সবসময় আসে না। বিশ্বকাপ সেই সুযোগটা করে দেয়। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকি। আশা করি, ব্রাজিলের জন্য আমরা ম্যাচটা কঠিন করে তুলতে পারব।”