Published : 20 Jul 2026, 02:50 PM
বিশ্বকাপ শুরুর সময়ও নিজেকে অনেকটা খুঁজে ফিরছিলেন রদ্রি। চোট কাটিয়ে ফেরার পর আগের সেই চেনা রূপে তাকে দেখা যাচ্ছিল না। বিশ্বকাপের শেষ দিনটিতে সেই তিনিই শ্রেষ্ঠত্বের আকাশে ধ্রুবতারা। তার দল জিতেছে তো বটেই, জিতেছেন তিনিও। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপেসহ সবাইকে টেক্কা দিয়ে বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার তিনিই!
এই শুরু আর শেষের যে মাঝের ভ্রমণ, সেখানেই রদ্রি ছিলেন অনন্য। গোল করেননি, গোলে সহায়তা করেননি। কিন্তু এমনভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন, দলের শিরোপা জয়ে তার অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, ‘গোল্ডেন বল’ উঠেছে তার হাতে।
দল আর নিজ সাফল্যের যুগলবন্দিতে রদ্রির ক্যারিয়ার পেয়েছে চোখধাঁধানো পরিপূর্ণতা। যেখানে খামতি বা অপ্রাপ্তির ছায়া নেই, শুধুই সাফল্যের ঝলমলে রোদ।
ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জিতেছেন তিনি চারটি, লিগ কাপ তিনটি, এফএ কাপ দুটি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ক্লাব বিশ্বকাপ, উয়েফা সুপার কাপ, কমিউনিটি শিল্ড একটি করে। স্পেনের হয়ে জিতেছেন ২০২২-২৩ নেশন্স লিগ, ২০২৪ ইউরো। জিতেছেন ২০২৪ সালের ব্যালন দ’র। সঙ্গে এবার বিশ্বকাপে জোড়া প্রাপ্তি।
বাকি কি কিছু আছে?
দেশের হয়ে বিশ্বকাপ ও ইউরো, ক্লাবের হয়ে ইউরোপ সেরা ও ব্যালন দ’র জয়ীদের ছোট্ট তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ৩০ বছর বয়সী মিডফিল্ডার। এখানে তার সঙ্গী জার্ড মুলার, ফ্রানৎস বেকেনবাউয়া ও জিনেদিন জিদানের মতো কিংবদন্তি।
অথচ অসাধারণ ফর্মে থাকার সময়ই ভয়াবহ চোটে মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে লম্বা সময়। স্পেনকে ২০২৪ ইউরো জেতানোয় তার ছিল বড় অবদান। ম্যানচেস্টার সিটির ৭৪ ম্যাচের রেকর্ড অপরাজেয় যাত্রায় তিনিই ছিলেন দলের প্রাণভ্রোমরা। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ওই চোটে পড়েন তিনি। পরের মাসেই পান ব্যালন দ’র। কিন্তু মাঠে ফিরতে ফিরতে মৌসুম প্রায় শেষই হয়ে যান।
ফেরার পর লম্বা সময় ধুঁকেছেন। আগের সেই ধার দেখা যায়নি। বিশ্বকাপেও এসেছিলেন সেই সংশয়কে সঙ্গী করেই। কিন্তু একের পর এক ম্যাচে মিডফিল্ড মাস্টারক্লাস মেলে ধরে তিনি চেনালেন নিজের জাত।
যদিও গোল্ডেন বল জয়ে লিওনেল মেসিকেই মনে করা হচ্ছিল সবচেয়ে ফেভারিট, কোনো গোল ও অ্যাসিস্ট ছাড়া রদ্রি এই পুরস্কার জিতে যাওয়ায় প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। তবে স্পেনের শিরোপা জয়ের অভিযান ভালোভাবে অনুসরণ করলে পরিষ্কার হবে, রদ্রিও দারুণভাবেই উপযুক্ত এই স্বীকৃতির।
গোল বা অ্যাসিস্ট নেই বলে তার খেলা হয়তো সেভাবে নজর কাড়ে না, কিন্তু মাঠে গোটা দলকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার কাজটি করেন তিনিই। আসরজুড়ে প্রতি ম্যাচেই তিনি দাপিয়ে বেরিয়েছেন গোটা মাঠ। রক্ষণে সহায়তা, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করা, আক্রমণে উৎস জোগানো, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ধ্বংস করা, হুমকিগুলো বন্ধ করা, সবই করেছেন তিনি।
টুর্নামেন্টজুড়ে স্পেনের রক্ষণভাগ যে অসাধারণ পারফর্ম করেছে, তাতে বড় অবদান ছিল রদ্রির। নিয়মিতই তিনি রক্ষণে সহায়তা করেছেন চার ডিফেন্ডারকে। থার্ড সেন্টার ব্যাকের ভূমিকা থেকে চোখের পলকে আবার ডিপ লায়িং প্লেমেকার হয়ে গেছেন। গোটা দলের চাবি ছিল তার হাতেই। তার সুরেই সবাই ছন্দ তুলেছে।
পরিসংখ্যানে সেই ছাপ আছে কিছুটা। গত বিশ্বকাপে ৬৩৮টি পাস সম্পন্ন করে রদ্রি ভেঙে দিয়েছিলেন ২০১০ সালে গড়া শাভি এর্নান্দেসের রেকর্ড। এবার নিজেকেই ছাড়িয়ে অবিশ্বাস্যভাবে ৭৯০টি পাস সম্পন্ন করেছেন তিনি!
তার নিকটতম দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এবার তারই দুই সতীর্থ পাউ কুবার্সি (৬৬৮) এবং এমরিক লাপোখ্ত (৬১৮)।
ফাইনালে ৯৯ মিনিট মাঠে থেকে ১০৫ পাসের ১০১টিই সম্পন্ন করেছেন। ডুয়াল সম্পন্ন করেছেন ৮০ শতাংশ। ট্যাকল (৮) ও লং বলে (৮) ছিলেন সবার ওপরে।
স্পেনের মাঝমাঠের স্তম্ভ রদ্রি আশা করেন, প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা থেকে তরুণ প্রজন্ম শিখতে পারবে। হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বিশ্বকাপ জিতে তিনি ফুটবলের প্রধান পুরস্কারগুলোর সংগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন।
তার কাজটা খুব চমকপ্রদ নয়, এজন্য সেরার স্বীকৃতি পেয়ে চমকে গেছেন নিজেও। একটু আবেগাব্লুতও হয়েছেন। ভয়ানক চোট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা তাকে দোলা দিচ্ছে। নিজের এই প্রত্যাবর্তনকে তিনি মনে করছেন তরুণদের জন্য উদাহরণ।
“মনে হচ্ছে যেন নিখুঁত এক চিত্রনাট্য। আমি এটা একেবারেই আশা করিনি।
আমি চাই নতুন প্রজন্ম দেখুক যে, একজন ফুটবলার, সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও যিনি নরকে পতিত হন, তিনি আবার উঠে দাঁড়তে পারেন, ফিরে আসতে পারেন। এটি প্রতিকূলতা জয় করার একটি দারুণ উদাহরণ এবং সবার জন্য শিক্ষা, সবসময় বিশ্বাস রাখতে হবে। সত্যি বলতে, এটা অবিশ্বাস্য।”
উদ্বেলিত তিনি দলের সাফল্যেও। তার মতে, তীব্র তাড়নার শক্তিতেই লিওনেল মেসির দলকে তারা হারাতে পেরেছেন।
“এটাই এই দলের (সাফল্যের) রহস্য। আমরা সবসময় জয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ি। শেষ পর্যন্ত, ঈশ্বরই তার পুরস্কার দেন। আমরা সাহসী ছিলাম।
সত্যি বলতে, আনন্দে আত্মহারা আমরা। এই দলটি অসাধারণ। আমরা দুইবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে কঠিন টুর্নামেন্ট। এমন কিছু অর্জন করা ছিল সবচেয়ে দুরূহ। আমরা আর্জেন্টিনার মতো একটি দুর্দান্ত দলকে হারিয়েছি, যেখানে ছিলেন ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় মেসি।”
ফাইনালে একতরফা খেলেও অবশ্য লম্বা সময় গোল পায়নি স্পেন। দলের জয়সূচক গোলটির সময় তিনি মাঠেও ছিলেন না। তবে জয়ের বিশ্বাস তার ছিল।
“আর্জেন্টিনা তো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দল। ম্যাচে তারা খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু তাদের রক্ষণ ভাঙা ছিল কঠিন। তার পরও আমরা পেরেছি, কারণ স্পেন আসলেই খুব ভালো দল এবং শেষ পর্যন্ত, ফলাফলটি ন্যায্যই ছিল।”