Published : 06 Jun 2026, 10:42 PM
স্পেনে ১৯৮২ সালের ১৩ জুন থেকে ১১ জুলাই বসে বিশ্বকাপের দ্বাদশ আসর। ১০৩ দলের বাছাই পর্ব পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয় ২২টি দল। সরাসরি খেলে গত আসরের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও স্বাগতিক স্পেন।
এই আসর দিয়ে লাতিন আমেরিকা থেকে বিশ্বকাপ ফেরে ইউরোপে। স্রেফ মাঠের খেলাই নয়, ট্রফিও; পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে নিজেদের শিরোপা জেতে ইতালি। বিশ্বকাপের সফলতম দলের তালিকায় বসে ব্রাজিলের পাশে।
১৯৮২ সালের স্পেন আসর নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত। এই আসর দিয়েই বিশ্বকাপে অভিষেক হয় আর্জেন্টাইন জাদুকর দিয়েগো মারাদোনার। ফুটবল কতটা নান্দনিকভাবে খেলা যায় দেখায় ব্রাজিল। এই দলের শিরোপা জিততে না পারা নিয়ে চর্চা হয় এখনও।
মারাত্মক সব ফাউল ও দুর্বল রেফারিংয়ের জন্য হয় তীব্র সমালোচনা। এর প্রেক্ষিতেই পরের আসরে খেলোয়াড়দের আরও বেশি সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় ফিফা। বিস্ময়করভাবে বরাদ্দকৃত আসনের চেয়ে বিক্রি করা হয় অতিরিক্ত টিকেট। তাই কিছু ম্যাচে দর্শকদের খেলা দেখতে হয় দাঁড়িয়ে!
১৯৬৬ সালের ৬ জুলাই লন্ডনে ফিফা কংগ্রেসে দ্বাদশ আসর আয়োজনের দায়িত্ব পায় স্পেন। এই আসরে খেলা হয় নতুন ফরম্যাটে।
বাছাই পর্ব পার হতে পারেনি গত দুই আসরের রানার্সআপ নেদারল্যান্ডস। একই পরিণতি হয় সুইডেন, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়ার। ১৯৭৪ ও ১৯৭৮ আসরে বাছাই পর্ব উতরাতে না পারা ইংল্যান্ড ফেরে বিশ্বকাপে। তাদের সঙ্গী হয় বেলজিয়াম, চেকোস্লোভাকিয়া, এল সালভাদর, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চিলি।
বিশ্বকাপে অংশ নেয় যে দেশগুলো-
ইউরোপ: অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, চেকোস্লোভাকিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, ইতালি, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন, স্পেন, পশ্চিম জার্মানি ও যুগোস্লাভিয়া
দক্ষিণ আমেরিকা: আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি ও পেরু
উত্তর আমেরিকা: হন্ডুরাস ও এল সালভাদর
এশিয়া: কুয়েত
আফ্রিকা: আলজেরিয়া ও ক্যামেরুন
ওশেনিয়া: নিউ জিল্যান্ড
এ্ই আসর দিয়ে অভিষেক হয় আলজেরিয়া, ক্যামেরুন, হন্ডুরাস, কুয়েত ও নিউ জিল্যান্ডের
২৪টি দেশ ছয়টি গ্রুপে খেলে, গ্রুপগুলো হলো-
গ্রুপ ১: ইতালি, পোল্যান্ড, ক্যামেরুন, পেরু
গ্রুপ ২: পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া, চিলি
গ্রুপ ৩: আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম, হাঙ্গেরি, এল সালভাদর
গ্রুপ ৪: ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, চেকোস্লোভাকিয়া, কুয়েত
গ্রুপ ৫: স্পেন, নর্দান আয়ারল্যান্ড, হন্ডুরাস, যুগোস্লাভিয়া
গ্রুপ ৬: ব্রাজিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন, স্কটল্যান্ড, নিউজিলান্ড
প্রতিটি গ্রুপের সেরা দুই দল যায় পরের রাউন্ডে। সেখানে ১২ দলকে ভাগ করা হয় ৪ গ্রুপে। শীর্ষ চার দল যায় সেমি-ফাইনালে।
প্রথমবারের মত ‘টাইব্রেকার’ ও ‘গোল্ডেন বল’ এর প্রচলন হয় এই আসর দিয়ে।
প্রথম পর্ব
গ্রুপ ১ থেকে পরের রাউন্ডে যায় পোল্যান্ড ও ইতালি। এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় পোল্যান্ড।
তিনটি করে ড্রয়ে ইতালি ও ক্যামেরুনের পয়েন্ট হয় সমান- ৩। গোল পার্থক্যও হয় সমান- ০। বেশি গোল করায় টিকে যায় ইতালি, বিদায় নেয় আফ্রিকার দল ক্যামেরুন। দুটি ড্রয়ে ২ পয়েন্ট পায় পেরু। এই গ্রুপে একমাত্র হারের তেতো স্বাদ পায় তারাই।
গ্রুপ ২ থেকে পরের ধাপে যায় পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। এই দুই দলের সঙ্গে আলজেরিয়ারও পয়েন্ট ছিল ৪। তিন দলেরই জয় দুটি করে। গোল পার্থক্যে এগিয়ে থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি, রানার্সআপ অস্ট্রিয়া।
ক্যামেরুনের মতো আলজেরিয়াও টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় দারুণ চমক দেখিয়ে। বিশ্ব মঞ্চে ফেরাটা রাঙাতে পারেনি চিলি, হারে তিন ম্যাচেই।
এই গ্রুপেরই এক ঘটনা বিশ্বকাপে দারুণ প্রভাব ফেলে। ২৪ জুন চিলিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে পরের রাউন্ডে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল করে আলজেরিয়া। সমীকরণ জেনেই মাঠে নামে ইউরোপের দুই দল পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। ১-০ ব্যবধানে পশ্চিম জার্মানির জয়ে গোল পার্থক্যে এগিয়ে থেকে এই দুই দলই যায় পরের রাউন্ডে। এর পর থেকে বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে শেষ রাউন্ডের দুটি ম্যাচ হয় একই সময়ে।
গ্রুপ ৩ থেকে পরের রাউন্ডে যায় বেলজিয়াম ও আর্জেন্টিনা। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় বেলজিয়াম। দুই জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ আর্জেন্টিনা। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হাঙ্গেরি। বিশ্বকাপ অভিষেকে শূন্য হাতে ফেরে এল সালভাদর।
১৫ জুন তাদের বিপক্ষেই ১০-১ ব্যবধানের জয়ে আসরের প্রথম হ্যাটট্রিক করেন হাঙ্গেরির লাসলো কিশ। বিশ্বকাপে চূড়ান্ত পর্বে আর কোনো দল এখন পর্যন্ত ১০ গোল দিতে পারেনি।
গ্রুপ ৪ থেকে পরের রাউন্ড যায় ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। তিন জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে প্রতাপের সঙ্গে গ্রুপ সেরা হয় ইংল্যান্ড। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয় ফ্রান্স। দুই ড্রয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয় চেকোস্লোভাকিয়া। অভিষেকে কুয়েতের প্রাপ্তি ১ পয়েন্ট।
গ্রুপ ৫ থেকে এগিয়ে যায় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও স্পেন। ১৯৫৮ সালের পর প্রথমবার খেলতে এসে এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট করে পায় স্পেন ও যুগোস্লাভিয়া। দুই দলের গোল পার্থক্যও ছিল সমান। বেশি গোল করায় টিকে যায় স্বাগতিক স্পেন। দুটি ড্র থেকে হন্ডুরাসের প্রাপ্তি ২ পয়েন্ট।
গ্রুপ ৬ থেকে পরের রাউন্ডে যায় ব্রাজিল ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। অনিন্দ্য সুন্দর ফুটবলের পসরা সাজিয়ে তিন জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। জিকো, সক্রেটিস, ফালকাওদের নিয়ে গড়া ‘স্বপ্নের দলটি’ গ্রুপ পর্বে করে ১০ গোল, হজম করে দুটি।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট করে পায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও স্কটল্যান্ড। গোল পার্থক্যে এগিয়ে থাকায় জিকোদের সঙ্গী সোভিয়েত ইউনিয়ন। অভিষেকে ১২ গোল হজম করে শূন্য হাতে ফেরে নিউ জিল্যান্ড।
দ্বিতীয় রাউন্ড
গ্রুপ এ: পোল্যান্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বেলজিয়াম
গ্রুপ বি: পশ্চিম জার্মানি, ইংল্যান্ড, স্পেন
গ্রুপ সি: ইতালি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা
গ্রুপ ডি: ফ্রান্স, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া
গ্রুপ ‘এ’ থেকে সেমি-ফাইনালে যায় পোল্যান্ড। তাদের মতো একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নেরও। গোল পার্থক্যে পিছিয়ে থাকায় বিদায় নেয় তারা। দুই ম্যাচেই হারে গ্রুপের আন্য দল বেলজিয়াম।
গ্রুপ ‘বি’ থেকে শেষ চারে যায় পশ্চিম জার্মানি। একটি করে জয় ও ড্রয়ে তাদের পয়েন্ট ছিল ৩। দুটি ড্রয়ে ২ পয়েন্ট পায় ইংল্যান্ড। স্পেনের পয়েন্ট ছিল ১।
গ্রুপ ‘সি’ থেকে লাতিন আমেরিকার দুই দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে হতাশায় ডুবিয়ে সেমি-ফাইনালে যায় ইতালি। এতে সবচেয়ে বড় অবদান পাওলো রস্সির। জাদুকরী ফুটবলে ব্রাজিলের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানের জয়ে তিনি করেন হ্যাটট্রিক।
শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা হারে দুই ম্যাচেই। ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় ইতালি। ব্রাজিলের প্রাপ্তি ২ পয়েন্ট।
গ্রুপ ডি থেকে শেষ চারে যায় ফ্রান্স। দুই জয়ে তাদের পয়েন্ট ছিল ৪। নিজেদের মধ্যে ড্র করে অস্ট্রিয়া ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড।
সেমি-ফাইনাল
১৯৩৪ ও ১৯৬৬ সালের পর এই আসরেও সেমি-ফাইনালের চার দল ছিল ইউরোপের।
৮ জুন বার্সেলোনার মাঠ কাম্প নউয়ে রস্সির জোড়া গোলে ২-০ ব্যবধানে পোল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে যায় ইতালি।
সেভিয়ার মাঠে আরেক সেমি-ফাইনাল যেন হাজির হয় সব রোমাঞ্চ নিয়ে। এই ম্যাচেই বিশ্বকাপ দেখে প্রথম টাইব্রেকার।
১৭তম মিনিটে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। ২৬তম মিনিটে মিশেল প্লাতিনির গোলে সমতা ফেরায় ফ্রান্স। ১-১ সমতায় ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ৯২ ও ৯৮তম মিনিটে দুই গোল করে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ফ্রান্স।
লড়াকু পশ্চিম জার্মানি ১০২ ও ১০৮ মিনিটের দুই গোলে ম্যাচ নিয়ে যায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে যায় পশ্চিম জার্মানি।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সকে ৩-২ গোলে হারায় পোল্যান্ড।
ফাইনাল
১১ জুলাই, ১৯৮২। ৯০ হাজার দর্শকে পূর্ণ রেয়াল মাদ্রিদের স্টেডিয়াম সান্তিয়াগো বের্নাবেউ। গোলের জন্য অপেক্ষায় কাটে পুরো প্রথমার্ধ। অবশেষে ৫৭তম মিনিটে জালের পথ দেখান রস্সি। পরে আরও দুই গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইতালি। শেষ দিকে একটি গোল করলেও সেভাবে আশা জাগাতে পারেনি পশ্চিম জার্মানি।
৩-১ গোলের জয়ে ১৯৩৮ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে ইতালি।
এক নজরে দ্বাদশ বিশ্বকাপ
স্বাগতিক: স্পেন
চ্যাম্পিয়ন: ইতালি
রানার্সআপ: পশ্চিম জার্মানি
মোট ম্যাচ: ৫২
মোট গোল: ১৪৬
গোল গড়: ২.৮১
সর্বোচ্চ গোল: পাওলো রস্সি (ইতালি)
সেরা খেলোয়াড়: পাওলো রস্সি (ইতালি)