Published : 07 Jun 2026, 09:29 AM
বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, ট্রফিতে ভরা ক্যাবিনেট, বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত- হুলিয়ান আলভারেসকে বর্ণনা করা যায় আরও নানাভাবে। আসন্ন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন হতে যাচ্ছেন আতলেতিকো মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড।
রিভার প্লেটে বেড়ে ওঠা, ম্যানচেস্টার সিটিতে পেপ গুয়ার্দিওলার কোচিংয়ে তারকা হয়ে ওঠা এবং বর্তমানে দিয়েগো সিমেওনের আতলেতিকো মাদ্রিদের অপরিহার্য একজন খেলোয়াড় আলভারেস ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে খেলার অপেক্ষায়। বিশ্ব সেরার পুরস্কারটি জিততে কী প্রয়োজন, তা তিনি জানেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন আর্জেন্টিনার হুলিয়ান আলভারেস।
ফুটবলের আঙিনায় আলভারেসের অর্জন
২০০০ সালের ৩১ জানুয়ারি জন্ম আলভারেসের। ফুটবলে তার হাতেখড়ি জন্মশহর কর্দোবার কালচিনে। কৈশোরের মাঝামাঝি সময়ে তিনি যোগ দেন রিভার প্লেটে, সেখানে কোচ মার্সেলো গায়ার্দো তাকে আধুনিক স্ট্রাইকার হিসেবে গড়ে তোলেন: প্রেসিংয়ে গতিময়, দ্রুত ও পাসিং আক্রমণে ক্ষিপ্র এবং গোলমুখে ভয়ঙ্কর।
রিভার প্লেটে তার উত্থান ছিল যেমন দ্রুত, তেমনই অবিস্মরণীয়। ২০১৮ সালে মাদ্রিদে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী বোকা জুনিয়র্সের বিপক্ষে ঐতিহাসিক কনমেবল লিবের্তাদোরেস ফাইনাল জয়ী দলের অংশ ছিলেন তিনি। সত্যিকার অর্থে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন ২০২১ সালে। গোল ও অ্যাসিস্ট করে এবং শিরোপা জিতে ইউরোপজুড়ে সবার নজর কাড়েন তিনি।
বেশ কয়েকটি ক্লাবের সঙ্গে লড়াইয়ে জিতে ২০২২ সালে আলভারেসকে দলে টানে ম্যানচেস্টার সিটি। ইংল্যান্ডে গুয়ার্দিওলার কোচিংয়ে শীর্ষ-স্তরের ফুটবলের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেকে তিনি মানিয়ে নেন দ্রুতই। প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, কমিউনিটি শিল্ড, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, উয়েফা সুপার কাপ ও বর্তমানে ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ নামে পরিচিত টুর্নামেন্ট জিতে সমৃদ্ধ করেন ক্যারিয়ার।
ইংলিশ ফুটবল রাঙিয়ে, ২০২৪ সালের অগাস্টে ছয় বছরের চুক্তিতে আতলেতিকো মাদ্রিদে যোগ দেন আলভারেস।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলভারেস আর্জেন্টিনার হয়ে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন: ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ, একই বছর ফিনালিস্সিমা ও ২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতেছেন। ২৬ বছর বয়সে তিনি বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের মূল খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে আসন্ন বিশ্বকাপে অংশ নেবেন।

সতীর্থ ও কোচদের চোখে আলভারেস
“হুলিয়ান আজ সবার থেকে আলাদাভাবে নজর কেড়েছে। সে অসাধারণ এক ম্যাচ খেলেছে, আমাদের জয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে, লড়াই করেছে, দৌড়েছে, প্রতিটি বলের জন্য লড়াই করেছে, সুযোগ তৈরি করেছে এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন ছিল- যেমনটা এই বিশ্বকাপ জুড়েই ছিল সে। এটা তার প্রাপ্য।”
- ২০২২ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
“আপনি যা কিছুই দেখেন না কেন, হুলিয়ানের যে গুণটি আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান, তা হলো তার বিনয়। নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম করার ইচ্ছা, একজন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েও (পা মাটিতে রাখা), আতলেতিকো মাদ্রিদের হয়ে খেলা এবং প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, প্রতিটি ম্যাচে নিজের সর্বস্ব দিয়ে দৌড়ানো।”
- আতলেতিকো মাদ্রিদ কোচ দিয়েগো সিমেওনে।
“হুলিয়ান তো হুলিয়ানই। যেকোনো ক্লাবের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে সে। পেপ গুয়ার্দিওলার কোচিংয়ে সিটি ছিল তার জন্য মানানসই, ‘এল চোলো’র (সিমেওনে) কোচিংয়ে আতলেতিকোও তার জন্য মানানসই, বার্সা বা রেয়াল মাদ্রিদও তার জন্য মানানসই হতো। সে এমন একজন খেলোয়াড়, যাকে যেকোনো কোচই নিজের দলে চাইবে। তার কোচ তাকে যা করতে বলে, সে তাই করে, এমনকি মাঠে এমন ভূমিকা পালন করতে হলেও, যেটা তার জন্য সহজাত নয়।”
- আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি

পরিসংখ্যানের আলোয় আলভারেস
• ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আলভারেস চারটি গোল করেন; গ্রুপ পর্বে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ও শেষ ষোলোয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি করে গোল করার পর, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে জোড়া গোল করেন তিনি।
• ২২ বছর বয়সে ২০২২ সালের সেই আসরে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন আলভারেস।
• ম্যানচেস্টার সিটিতে থাকাকালীন তিনি ১০৩টি ম্যাচ খেলে গোল করেন ৩৬টি, অ্যাসিস্ট ১৯টি, আর শিরোপা জেতেন সাতটি।
• আলভারেস আর্জেন্টিনার হয়ে ৫১টি ম্যাচে ১৪টি গোল করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে করা জোড়া গোল এবং ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে ৪-১ গোলের স্মরণীয় জয়ে করা একটি গোল।
বিশ্ব মঞ্চে আলভারেস
প্রতিভাবান এই ফরোয়ার্ড ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে অংশ নেন অপার সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু শুরুর একাদশে তার জায়গা নিশ্চিত ছিল না। টুর্নামেন্টের শুরুতে বেঞ্চে থাকলেও, পরে জায়গা করে নেন একাদশে। আর সেই টুর্নামেন্ট বদলে দেয় তার ক্যারিয়ার।
প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত হারের পর, কোচ লিওনেল স্কালোনি দল পুনর্গঠন করেন এবং আলভারেস তার প্রাণশক্তি, গতি ও নিখুঁত ফিনিশিং দিয়ে সুযোগটি দারুণভাবে কাজে লাগান।
বিশ্বকাপে তার প্রথম গোলটি আসে পোল্যান্ডের বিপক্ষে, যে ম্যাচে জয় আর্জেন্টিনাকে জায়গা করে দেয় শেষ ষোলোয়। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও গোল করেন আলভারেস। তবে তার সেরাটা দেখা যায় সেমি-ফাইনালে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করেন দুটি- প্রথমটি দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে, দ্বিতীয়টি মেসির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে। তিনি একটি পেনাল্টিও আদায় করেন, যা থেকে ৩৪তম মিনিটে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে এগিয়ে নেন মেসি।
ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে তিনি গোল করতে না পারলেও, দলের শিরোপা জয়ে তার ছিল উল্লেখযোগ্য অবদান।

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে আলভারেস ও আর্জেন্টিনার প্রত্যাশা
চার বছর আগে কাতারে জেতা শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে আর্জেন্টিনা ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে নামবে। সেই দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড় আছে এবারের দলেও। সঙ্গে যোগ হয়েছে বেশ কিছু নতুন প্রতিভা।
স্কালোনির দল ‘জে’ গ্রুপে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানকে। ১৬ জুন কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের অভিযান। ২২ জুন ডালাস স্টেডিয়ামে অস্ট্রিয়া ও এর পাঁচ দিন পর একই মাঠে গ্রুপের শেষ ম্যাচে জর্ডানের মুখোমুখি হবে তারা।