Published : 06 Jul 2026, 09:58 AM
মরক্কো যেন আরব্যরজনীর রূপকথার মতো। অন্তহীন। কাতার বিশ্বকাপে যে গল্পের পাতা ওল্টানো শুরু হয়েছিল, উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপেও তা শেষের নামগন্ধ নেই, বরং পৃষ্ঠা বেড়েই চলছে। এরই মধ্যে দলটি উঠে গেছে কোয়ার্টার-ফাইনালের মঞ্চে। ফ্রান্স বাধা পেরুতে পারলে রূপকথার আরেক খণ্ডের শুরু হবে; নিশ্চিতভাবেই।
রূপকথার সব পাতায় সমান সৌন্দর্যের বুলি থাকে না। মরক্কোও তাই পারেনি। কানাডার বিপক্ষে তাদের শেষ ষোলোর ম্যাচে ৩-০ গোলের জয়টি ফুটবলীয় সৌন্দর্যের দৃষ্টিকোণ থেকে তাই ছন্দময় হয়ে ওঠেনি; বরং বলা ভালো, জয়টি ছিল রূঢ়, কর্কষ। তবু, লক্ষ্য পূরণের উচ্ছ্বাস ছিল পরতে পরতে।
ওই ম্যাচে মাত্র ৫টি শট লক্ষে রেখে জিতে মরক্কো। এবারের বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জেতা দলগুলোর মধ্যে লক্ষে রাখা শটের হিসাবে যা সবচেয়ে কম। এবং বিস্ময়কর হলেও সত্য, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই ম্যাচের প্রথমার্ধে শটের চেয়ে হলুদ কার্ড দেখানোর সংখ্যা ছিল বেশি!
কিন্তু হিউস্টনে মরক্কোই শেষ পর্যন্ত হেসেছিল। কথায় আছে, একটি দুর্দান্ত দলের চিহ্ন হচ্ছে, কষ্ট করে বা বাজেভাবে হলেও তারা জিততে জানে। মরক্কো সেটিই করে দেখাল সহ-আয়োজক কানাডার স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে। এখন তারা বিশ্বকাপের দুর্দান্ত দলের একটি এবং শিরোপার দাবিদারও।
কেবল, এ আসরেই এখন পর্যন্ত অপরাজিত নয় মরক্কো। বরং সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে হাকিমি-দিয়াসরা অজেয় সবশেষ ৩৪ ম্যাচে! অবশ্য, এই পরিসংখ্যানের মধ্যে কালির দাগ আছে একটু। সেটা আফ্রিকান নেশন্স লিগের ফাইনালে। সেনেগালের কাছ থেকে আদালতের সিদ্ধান্তে যে জয়টি জুটেছিল মরক্কোর ভাগ্য। জয়টি বিতর্কিত হলেও চিত্তাকর্ষক বটে।
আফ্রিকার নেশন্স চ্যাম্পিয়নশিপের ২০২৫ সালের আসরে কেনিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলে হারের পর, আর এই তেতো স্বাদ পায়নি মরক্কো। ওই টুর্নামেন্ট ছিল আফ্রিকার ঘরোয়া লিগের খেলোয়াড়দের নিয়ে।
কেনিয়ার বিপক্ষে ওই হারের পর আর পিছু ফিরে তাকায়নি মরক্কো। কানাডার বিপক্ষে ম্যাচে, শুরুর ১৫ মিনিটে একটু কুঁকড়ে ছিল তারা, কিন্তু বাকি সময়ে কখনও, কারোই মনে হয়নি, ম্যাচটা তারা হারতে পারে। ম্যাচের লাগাম শক্ত মুঠোয় ধরে রেখেছিল তারা।
কানাডা অবশ্য শুরুর দিকে দুটি সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু মরক্কোর গোলকিপার ইয়াসিন বোনু রুখে দেন জনাতেন ডেভিড ও ট্যানি ওলুওয়াসেইয়ের প্রচেষ্টা। ওই পনের মিনিটে প্রতিপক্ষের বক্সে বলে কোনো স্পর্শই ছিল না মরক্কোর; চলতি আসরে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার এমনটা ঘটল তাদের বেলায়।
পনের মিনিট পরবর্তী চিত্রনাট্যে যথারীতি আধিপত্য মরক্কোর। থিতু হয়ে গেলে ‘এটলাস লায়ন্স’দের খাঁচায় বন্দি করে রাখা কঠিন। কানাডা কোচ জেসি মার্শের ম্যাচ শেষের প্রতিক্রিয়া, অল্প কথায় বুঝিয়ে দিলেন তা।
“তারা একটু দমে গিয়েছিল, কিন্তু ভেঙে পড়েনি।”

টেক্সাসের ওই ম্যাচে মূলত মুখোমুখি হয়েছিল সোনালি প্রজন্ম নিয়ে গড়া দুটি দল। যেখানে আলো ছড়িয়েছিল কেবল মরক্কো। কানাডার ক্ষেত্রে দূর্ভাগ্য ছিল, আলফুঁস ডেভিস। চোটের কারণে অধিনায়ক বেঞ্চে ছিলেন অসহায়ের মতো। সবাই মরক্কোকে দেখল, কানাডার স্টেফান ইস্টাকউয়ের বিপদজনক পাসগুলোকে নিস্ক্রিয় করে দিতে এবং স্ট্রইকার ডেভিডকে অনেকটা ছিটকে ফেলে দিতে।
তর্কসাপেক্ষে এ মুহূর্তে বিশ্বের সেরা রাইট ব্যাক আশরাফ হাকিমি বল পায়ে আতঙ্ক ছড়ালেন। কানাডার খেলোয়াড়দের চোখে মুখে তা ফুটেও উঠল। দুটি অ্যাসিস্ট করলেন সৃষ্টিশীল ফুটবলার ব্রাহিম দিয়াস। বর্তমানে তার অ্যাসিস্ট সংখ্যা ৪টি, আফ্রিকার খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ।
কানাডাকে হারানোর পর মরক্কো কোচ মোহমেদ ওয়াহ্বি অকপটে মেনে নেন, তার দলের শুরুর বিবর্ণতা। দ্বিতীয়ার্ধে কৌশলের কিছু রদবদলে, আজেদিন উনায়ির জ্বলে ওঠা, জোড়া গোল করা এবং প্রয়োজনের সময় দলের টিকে থাকা নিয়ে উচ্ছ্বাস ঝরল তার কণ্ঠে।
“প্রথমার্ধ ভীষণ তীব্র ছিল। বিরতিতে কিছু রদবদল করতে হয়েছিল। আমরা কখনই চাপমুক্ত ছিলাম না। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আমরা নিজেদের খেলার ধরন বা দর্শন বদলায়নি। কাজে লাগানোর মতো অনেক ছক ছিল এবং সেরাটাই বেছে নিয়েছিলাম আমরা।”
“আমরা বিশ্বকাপে খেলছি, যার অর্থ হচ্ছে, কঠিন মুহূর্ত আসবে। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আপনি যখন সেরা অবস্থায় থাকবেন না, তখন আপনাকে দৃঢ়তা ধরে রাখতে হবে, টিকে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমরা কার জন্য এবং কীসের জন্য খেলছি।”
এ প্রশ্নগুলোর উত্তরও এখন মরক্কো মিলিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায়। ফ্রান্সকে হারাতে পারলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে খেলার হাতছানি তাদের সামনে। ২০২২ সালে, কাতারের আসরে প্রথম আরব-আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেরা চারে খেলার কীর্তি গড়েছিল তারা।
এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে চার ম্যাচ জিতেছে মরক্কো। ২০২২ সালে দুটি, চলতি আসরে দুটি। আফ্রিকার বাকি সব দলের নকআউটে পাওয়া জয় মরক্কোর সমান। আরেকটি জয় পেলে হাকিমিরা গত আসরের অর্জনের পুনরাবৃত্তিই কেবল করবেন না, নিজেদের জয়ের রেকর্ডটাকেও তুলবেন আরেকটু উঁচুতে।
এই মরক্কো এখন শিরোপার দাবিদারদের একটি। যদিও, কানাঘুঁষা আছে, তাদের পূর্ণ সামর্থ্যের পরীক্ষা হয়নি এখনও। কিন্তু এটাও সত্যি, চলতি আসরে পথচলার শুরুতে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে তারা রুখে দিয়েছিল মুগ্ধতা ছড়ানো ফুটবল খেলে। এরপর স্কটল্যান্ড এবং হাইতির বিপক্ষে তারা পেয়েছিল দুটি ভিন্ন স্বাদের জয়।
স্কটল্যান্ডের জালে দ্বিতীয় মিনিটে করা গোলটি আগলে রেখে জিতেছিল মরক্কো। আগেই গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে যাওয়া হাইতি শুরুতে তাদের চেপে ধরলেও, পরে দাপটের সাথে ৪-২ গোলে জিতেছিল তারা।
শেষ বত্রিশে এসে নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হয় মরক্কো। এ ম্যাচেও পারফরম্যান্সের দিক থেকে সেরা দল ছিল তারাই। যদিও ছিটকে যাওয়ার চোখ রাঙানি এড়াতে ঘাম ছুটে গিয়েছিল তাদের। শেষ মুহূর্তের গোলে ম্যাচ সমতা ফেরানোর পর, অতিরিক্ত সময় শেষে টাইব্রেকারে জিতেছিল মরক্কো।

কানাডার বিপক্ষে অবশ্য তাদের জয়টি এসেছিল হেসেখেলে। যদিও খেলার মান উচুঁ দরের ছিল না। বিসিসি ফাইভ লাইভে বিশেষজ্ঞ ক্রিস্ট সুটোন তাই মনে করিয়ে দেন, হাকিমিদের জন্য সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
“মরক্কো তাদের সেরা ছন্দে ছিল না (কানাডা ম্যাচে) এবং তাদের সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা আসছে। ঢিমেতালের শুরু দিয়ে তারা আমাকে বিস্মিত করেছিল। জানি না, কানাডাকে হালকাভাবে নেওয়ার ঔদ্ধত্য তাদের মধ্যে ছিল কিনা। তবে, তাদের পারফরম্যান্সে একটা কিছুর কমতি ছিল।”
তারপরও, আফ্রিকার যে কোনো দলের চেয়ে মরক্কোর এই দলটিই বিশ্বকাপ জয়ের বেশি যোগ্য, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তাদের কোনো সাফল্যই রাতারাতি আসেনি। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মেদের দীর্ঘমেয়াদের পৃষ্ঠপোষকতার বড় ভূমিকাও রয়েছে এর পেছনে।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯৮- এই সময়ে চার বিশ্বকাপের তিনটির অংশ ছিল মরক্কো। এরপর তারা ছোটে উল্টোরথে। ২০ বছর ছিল বিশ্বকাপের আঙিনায় অনুপস্থিত। ওই পৃষ্ঠপোষকতার কারণে প্রাণ ফিরে দেশটির ফুটবলে। প্রবাসীরাও হন দেশমুখী। তাদের মধ্যে হাকিমি, দিয়াসরা উল্লেখযোগ্য, যাদের জন্ম-বেড়ে ওঠা স্পেনে।
এই প্রজন্মকে নিয়ে কেবল মরক্কানরাই নয়, অনেকেই আশাবাদী। কেননা, এই দলটি আফ্রিকার ও অনান্য আরব দেশগুলোর জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল দল হয়ে ওঠা এবং নিজেদের উপর আস্থা রাখার মতো উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলটির কোচ ওয়াহ্বির কণ্ঠে ফুটে উঠল সে তৃপ্তি।
“এটা কোনো বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। আজ থেকে আমরা কোনো বিস্ময় নই। যখন লোকে বলে, মরক্কো আসল দাবিদার, বড় ফুটবল জাতি, এটা আমাদের জন্য গর্বের উৎস।
“এটা সবে শুরু এবং আমি আশা করি, আগামী অনেক বছর ধরে, বিশ্বকাপে আমরা একই যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারব। আমরা এগিয়ে যেতে চাই, আমরা থামতে চাই না।”
চার বছরে আগে, মরুভূমি’র বিশ্বকাপে মরক্কোর সাফল্য কিছুটা অবিশ্বাস্য ছিল, কিন্তু উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে তাদের এবারের যাত্রা উদ্দেশ্যপূর্ণ। এটা এখন আর কেবল ফুটবলের স্রেফ রূপকথা নয়। রূপকথার চেয়ে বেশি কিছু, যেখানে কল্পনার চেয়ে সত্যি গল্পের ছড়াছড়ি।