ছত্রিশের ছোঁয়ায় ছত্রিশ বছরের অপেক্ষা ঘুচবে আর্জেন্টিনার?

আরেকটি বিশ্বকাপ, আবারও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে আশায় বুক বেঁধেছেন সমর্থকরা।

আবু হোসেন পরাগবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Nov 2022, 04:53 AM
Updated : 18 Nov 2022, 04:53 AM

‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল…’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতার লাইন। আর্জেন্টাইনদের জন্য অপেক্ষাটা অবশ্য আরও তিন বছর বেশি- ছত্রিশ। সেই যে ১৯৮৬ সালে দিয়েগো মারাদোনার হাত ধরে বিশ্বকাপ জিতল আর্জেন্টিনা, তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেল। আটটি বৈশ্বিক আসর কেটে গেল। এলো দুটি নতুন চ্যাম্পিয়ন। ব্রাজিল আরও দুইবার শিরোপা ঘরে তুলল। কিন্তু আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের আক্ষেপ আর ঘুচল না আর্জেন্টিনার। 

সময়ের পরিক্রমায় এসে গেছে আরও একটি বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার সামনে আরেকটি সুযোগ। কাটবে বৈশ্বিক আসরে তাদের ৩৬ বছরের শিরোপা খরা? 

বিশ্বকাপ মিশন শুরুর আগে আর্জেন্টিনার নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আরেকটি ৩৬ সংখ্যা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৩৬ ম্যাচ ধরে যে অপরাজিত আছে আলবিসেলেস্তেরা। 

আবু ধাবিতে গত বুধবার প্রীতি ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ৫-০ গোলে হারিয়ে আরও দীর্ঘ হয়েছে তাদের এই অপরাজেয় ধারা। এখন কাতার বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে হার এড়ালে ইতালির সবচেয়ে বেশি টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্ব রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলবে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। 

প্রায় সাড়ে তিন বছরের দুর্দান্ত এই পথচলায় ইউরোপিয়ান দলগুলির বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ম্যাচ খেলেছে যদিও স্রেফ তিনটি- জার্মানি, ইতালি ও শক্তি-সামর্থ্যে অনেক পিছিয়ে থাকা এস্তোনিয়ার বিপক্ষে একটি করে। 

এই সময়ে বেশিরভাগ ম্যাচই আর্জেন্টিনা খেলেছে দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলির বিপক্ষে। এই অঞ্চলের দলগুলির বিপক্ষে খেলা যদিও সহজ কোনো ব্যাপার নয়। বলিভিয়ার লা পাসে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে তিন হাজার ৬০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত স্টেডিয়ামে খেলতে গিয়ে বেশিরভাগ দলের যখন ঘাম ছুটে যায়, সেখান থেকেও জিতে এসেছে আর্জেন্টিনা। 

এবার বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে তারা পেয়েছে কাতারের টিকেট। তাদের একটি আন্তর্জাতিক ট্রফির আক্ষেপ ছিল ২৮ বছরের। তা ঘুচিয়ে এক বছরের মধ্যে জিতে নিয়েছে দুটি শিরোপা। গত বছর ব্রাজিলকে তাদের মাঠেই ১-০ গোলে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের পর লন্ডনের ওয়েম্বলিতে ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে ঘরে তোলে ‘ফিনালিস্সিমা’ নামের ট্রফি।

আর্জেন্টিনার এই বদলে যাওয়ার শুরুটা মূলত ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের পর লিওনেল স্কালোনি কোচ হয়ে আসার পর থেকে। তার কোচিংয়ে বর্তমান দলের খেলোয়াড়রা অনেক দিন ধরেই খেলছেন একসঙ্গে। আগে বেশিরভাগ ম্যাচে দলটিকে ধুঁকতে হতো রক্ষণের ঘাটতিতে। সেখানে এই দলের রক্ষণ বেশ আঁটসাঁট। ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি, লিসান্দ্রো মার্তিনেস, মার্কোস আকুনিয়ারা আছেন ভরসা হয়ে। গোলপোস্টে বড় নির্ভরতা এমিলিয়ানো মার্তিনেস। 

মাঝমাঠের সেনানী রদ্রিগো দে পল, লেয়ান্দ্রো পারেদেসদের সঙ্গে আক্রমণে লিওনেল মেসি, আনহেল দি মারিয়াদের রসায়নটাও দারুণ। মেসি নিজেও আছেন দারুণ ছন্দে। জাতীয় দলের হয়ে সবশেষ চার ম্যাচে তার গোল ১০টি! এই ম্যাচগুলির প্রতিপক্ষ যদিও বড় কোনো দল নয়। তবে গোল করাও তো সহজ কোনো কাজ নয়। 

ক্লাব পিএসজির হয়েও এই মৌসুমে মেসির পারফরম্যান্স দারুণ। গোল করে এবং করিয়ে অবদান রেখেছেন নিয়মিত। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১৯ ম্যাচে তার গোল ১২টি, অ্যাসিস্ট ১৪টি। 

মেসির নিজের ও আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপে তাদের ফেভারিটদের তালিকায় ওপরের দিকে রাখার লোকের অভাব নেই। তবে ১৯৮৬ সালে সবশেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর তারা ফেভারিট হিসেবে টুর্নামেন্টে এসেছে তো অনেকবারই। প্রতিবারই ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। মাঝে দুইবার ফাইনালে হার সঙ্গী হয়েছে তাদের। এমনকি একবার বিদায় নিতে হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকেও। 

মেসি তাই সতর্ক। আর্জেন্টিনা অধিনায়ক কদিন আগেই যেমন বলে দিয়েছেন, ফেভারিট ‘হাইপে’ গা ভাসাতে চান না তারা, “আমরা ভালো ফর্ম নিয়ে বিশ্বকাপে খেলব। কিন্তু আমরা এই হাইপের ফাঁদে পা দিয়ে বিশ্বাস করতে পারি না যে, আমরা ফেভারিট এবং আমরা (বিশ্বকাপ) জিতব। আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে এবং ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে হবে।” 

ক্লাব ফুটবলে মেসি গড়েছেন অসংখ্য রেকর্ড। বার্সেলোনার হয়ে দুই দশকের অধ্যায়ে সব শিরোপাই জিতেছেন একাধিকবার। সেই তুলনায় জাতীয় দলের হয়ে কিছু জিততে পারছিলেন না বলে খোদ আর্জেন্টিনাতেও তাকে সমালোচনার শূলে চড়ানো হয়েছিল একটা সময়। ২০১৪ বিশ্বকাপ এবং পরের দুই বছর দুটি কোপা আমেরিকা, টানা তিন ফাইনালে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়ও বলে দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফিরে আসেন অবসর ভেঙে। 

এই নিয়ে টানা পঞ্চম বিশ্বকাপে খেলবেন রেকর্ড সাতবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকা। আগের চার আসরে তিনি ম্যাচ খেলেছেন ১৯টি। এখনও খেলছেন, এমন ফুটবলারদের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে মারাদোনার সবচেয়ে বেশি ২১ ম্যাচ খেলার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া তার জন্য স্রেফ সময়ের ব্যাপার। 

আর যদি আর্জেন্টিনা এবার ফাইনালে উঠতে পারে এবং সব ম্যাচেই খেলেন মেসি, তাহলে বিশ্বকাপে সাবেক জার্মান মিডফিল্ডার লোথার মাথেউসের ২৫ ম্যাচ খেলার বিশ্ব রেকর্ডও নতুন করে লেখা হয়ে যাবে। 

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৬ গোল করলেও নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচে অবশ্য জালের দেখা পাননি মেসি। তবে নকআউটে তার ৪ অ্যাসিস্ট ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ। 

কাতারের আসরে তাই অনেক রেকর্ডই নিজের করে নেওয়ার হাতছানি ৩৫ বছর বয়সী মেসির সামনে। এবারের আসর তার শেষ বিশ্বকাপ- ফুটবলের মহাতারকা এই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন আগেই। বিশ্বকাপের পর জাতীয় দলে তার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। ৩৪ বছর বয়সী দি মারিয়া যেমন আগেই বলে দিয়েছেন, বিশ্বকাপই আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ। 

মেসি-দি মারিয়ার এই শেষের শুরুটা হবে আগামী মঙ্গলবার, লুসাইল স্টেডিয়ামে সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। কাতারের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম এটি। ৮০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই মাঠেই হবে বিশ্বকাপের ফাইনাল। আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে মেসির শেষ বিশ্বকাপ রাঙাতে পারবেন তার সতীর্থরা? ১৮ ডিসেম্বর এখানে ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারবেন মেসি? 

সময়ই দেবে জবাব!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক