মাটি বাঁচানোর বৈশ্বিক আলোচনায় বাংলাদেশের জায়গা কোথায়?
প্রতি বর্ষায় বানের জলে ভেসে যাচ্ছে ফসলি জমির উর্বরতা আর কৃষকের সার। মাটির ক্ষয় রোধে বৈশ্বিক যে মহাযজ্ঞ চলছে, সেখানে ব-দ্বীপ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কতটা জোরালো?
প্রতি বর্ষায় হাওরে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল আর উপকূল ও চরাঞ্চলে নদীভাঙন বাংলাদেশের কৃষকের জন্য এক নির্মম বাস্তবতা। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষক কেবল তার আজন্ম লালিত ফসলি জমিটার অস্তিত্বই হারান না; ধারদেনা করে জমিতে প্রয়োগ করা রাসায়নিক সারও মুহূর্তেই বানের জলে ভেসে যায়। মাটির এই ক্রমাগত ক্ষয়ক্ষতি ও পুষ্টি উপাদানের অপচয় নিঃশব্দে আমাদের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে স্থায়ী হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ঠিক এই সময়েই মাটির উপরিভাগের উর্বর স্তর ও পুষ্টি উপাদান রক্ষার কার্যকর উপায় খুঁজতে চীনের ইয়াংলিংয়ে একত্র হয়েছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মৃত্তিকা-বিজ্ঞানীরা।
চীনের নর্থওয়েস্ট এ অ্যান্ড এফ ইউনিভার্সিটিতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ল্যান্ড অ্যান্ড ওয়াটার ডিভিশন এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক অন সয়েল ইরোশন’ (ইনসার)-এর যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সংস্থাটির প্রথম বার্ষিক সভা। এফএও-র গ্লোবাল সয়েল পার্টনারশিপের অধীনে যাত্রা শুরু করা এই আন্তর্জাতিক মঞ্চটিতে বিশ্বের অন্তত ৭২টি দেশের বিশেষজ্ঞ যুক্ত হয়েছেন। আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিনটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র: মৃত্তিকা ক্ষয় পরিমাপ ও ম্যাপিং, মাটি ও পানি সংরক্ষণ চর্চা এবং এর অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, আইন ও নীতিনির্ধারণ। মাটির ক্ষয় রোধে বিশ্বজুড়ে ‘গ্লোবাল সয়েল ইরোশন ম্যাপ’ তৈরির মতো বহুমাত্রিক উদ্যোগ নিয়ে এশিয়াসহ পাঁচ মহাদেশের গবেষকেরা যখন উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী অধিবেশনে যুক্ত, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির শিকার বাংলাদেশের উপস্থিতি সেখানে কতটা জোরালো?
সম্মেলনের সামগ্রিক কর্মসূচিতে বাংলাদেশ থেকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইকোসিন্থ সলিউশনসের পক্ষে একটিমাত্র প্রতিনিধিত্বের জায়গা পাওয়া গেছে। অনলাইনের মাধ্যমে চর ও হাওরের বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর দুটি সুনির্দিষ্ট গবেষণা পোস্টার সেখানে উপস্থাপন করা হয়। একটিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বন্যার পূর্বাভাসভিত্তিক সার প্রয়োগের সময়সূচি নির্ধারণের ওপর—যাতে আকস্মিক বন্যায় সার ধুয়েমুছে না যায়। অন্যটিতে প্রস্তাব করা হয়েছে স্থানীয় মাটির ক্ষয় নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদ্ধতির সঙ্গে ‘ইউরিয়া ডিপ প্লেসমেন্ট’ (ইউডিপি)—যা আমাদের মাঠে ‘গুটি ইউরিয়া’ নামে পরিচিত—তার মেলবন্ধন ঘটানো।
এই প্রস্তাবগুলো কোনো কল্পিত ধারণা নয়, এ দেশের মাটিতেই পরিচালিত মাঠপর্যায়ের ধারাবাহিক গবেষণার ফল। ইতিপূর্বে বরিশাল ও যশোরে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত পদ্ধতিতে জমিতে নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দেওয়ার তুলনায় গুটি ইউরিয়া মাটির ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার গভীরে প্রয়োগ করলে নাইট্রোজেনের অপচয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। একই সঙ্গে সারের ব্যবহার দক্ষতা এক-চতুর্থাংশ বৃদ্ধি পায় এবং শতকরা ২০ ভাগ কম সার ব্যবহার করেও ধানের ফলন বাড়ে প্রায় ১৮ শতাংশ। এর ফলে কৃষকের নিট মুনাফা বৃদ্ধির পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষাকারী উপাদান ও জৈব কার্বনের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ে।
তবে মূল সংকটটি ভিন্ন জায়গায়। সারের অপচয় রোধের এসব সফল প্রযুক্তিকে এখনো আমরা বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর বিশেষ ঝুঁকির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারিনি। হাওর ও চরাঞ্চলে কেবল গুটি ইউরিয়া প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বন্যার নির্ভুল আগাম সংকেত এবং মাটির ক্ষয় প্রতিরোধের বিশেষ ব্যবস্থা। এই দুইয়ের সংমিশ্রণে যদি কৃষককে সঠিক নির্দেশিকা দেওয়া যায়, তবে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভর্তুকি দেওয়া শত শত কোটি টাকার রাসায়নিক সারের অপচয় ঠেকানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রক্ষা পাবে দেশের নদী ও জলাশয়ের বাস্তুসংস্থান, যা সার মিশ্রিত পানির কারণে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো সক্রিয় ব-দ্বীপে মাটির ক্ষয়, বন্যা আর সারের পুষ্টি উপাদানের অপচয়কে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এগুলোর একটি অপরটিকে ত্বরান্বিত করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যখন টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং মৃত্তিকা ক্ষয় রোধে শত কোটি ডলারের তহবিল ও গবেষণা পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে, তখন আমাদের স্থানীয় বাস্তবতাগুলো সেখানে যথাযথভাবে উপস্থাপিত না হওয়া এক বিরাট সুযোগ হাতছাড়া করার শামিল। বৈশ্বিক বিজ্ঞানীদের নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় ব-দ্বীপ কৃষির এসব প্রায়োগিক সংকট ও সমাধান তুলে ধরতে পারলে বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার সহায়তা পাওয়া অনেক সহজ হতো।
চীনের সম্মেলনে বৈশ্বিক বিজ্ঞানীদের এই সমাবেশ আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে যে, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কতটা তৎপর সারা বিশ্ব। আমাদের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই), কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ এবং স্থানীয় এনজিওগুলো এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে নিজেদের কতটা সম্পৃক্ত করবে? স্থানীয় মাঠের সংকট সমাধানে বৈশ্বিক বিজ্ঞানকে কাজে লাগানোর এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে।
নয়তো প্রতি বর্ষায় উর্বর মাটির মতো আমাদের জাতীয় খাদ্যভিত্তিও ক্রমাগত ক্ষয়ে যেতে থাকবে। আর জাতীয় খাদ্যভিত্তির এই ক্ষয় কেবল ফসলের উৎপাদন কমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; চরম পুষ্টিহীনতা, লাগামহীন খাদ্যমূল্যস্ফীতি এবং পরাশ্রয়ী খাদ্য আমদানির দীর্ঘস্থায়ী ফাঁদে ফেলবে পুরো দেশকে। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ যেমন বাড়বে, তেমনি জলবায়ু অভিঘাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহুরে বস্তির স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যাবে।
মো. হাসনাইন: মৃত্তিকা বিজ্ঞানী; প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল কনসালট্যান্ট, ইকোসিন্থ সলিউশনস।
