০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

মেসির পর আর্জেন্টিনার নতুন নম্বর টেন কে

মেসি-পরবর্তী সময়ের জন্য ইতোমধ্যে নতুন অধিনায়ক বেছে নিয়েছেন লিওনেল স্কালোনি, কিন্তু ১০ নম্বর জার্সির নতুন মালিক নিয়ে রেখে দিয়েছেন রহস্য।

মেসির পর আর্জেন্টিনার নতুন নম্বর টেন কে

আর্জেন্টিনার এই জার্সিতে আর একটি ম্যাচ খেলবেন লিওনেল মেসি। ছবি: ফিফা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Oct 2026, 08:31 AM

Updated : 05 Oct 2026, 08:46 AM

লিওনেল মেসি- ফুটবলের আকাশে যে নক্ষত্রের আলোয় দীর্ঘদিন জ্বলজ্বল করে জ্বলছে আর্জেন্টাইন ফুটবল। যার চওড়া কাঁধে সওয়ার হয়ে তারা বিশ্ব জয় করেছে। গড়েছে কোপা আমেরিকা-বিশ্বকাপ-কোপা আমেরিকা জয়ের অনন্য কীর্তি। এত এত অর্জনের পর, দীর্ঘ এক যাত্রা শেষে এবার তার থামার পালা। পায়ের জাদু তার আছে অনেকটা আগের মতোই; কিন্তু একটা সময় থামতে হয়, সবকিছুরই শেষ আছে। সেই নিয়মকে আলিঙ্গন করেই থামছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর।

আর তাতে, বড় একটা ঝাঁকুনি খেয়ে যেন নতুন এক সময়কালে পা রাখতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। যেখানে থাকবেন না মেসি, তবে থাকবে তার লেগ্যাসি। তাই সাম্প্রতিক সময়ের অতি চর্চিত প্রশ্নটাও উঠছে জোরেশোরে- আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরবেন কে?

দেশের মাটিতে বেনিনের বিপক্ষে আসছে ম্যাচে শেষবারের মতো বিখ্যাত আকাশী-সাদা জার্সিতে দেখা যাবে মেসিকে। যে ম্যাচটি মূলত তাকে বিদায় জানাতেই আয়োজন করা হচ্ছে।

Image

কোচ লিওনেল স্কালোনির সঙ্গে মেসি। ছবি: ফিফা

আগামী মাসের আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিরতির আগেই তাদের ওই প্রশ্নের উত্তর মেলাতে হবে, যে পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা হয়নি গত ১৭ বছরে। ২০০৯ সাল থেকে আর্জেন্টিনার ‘নাম্বার টেন’ যে হয়ে আছেন মেসি।

সত্যিই তাই বড় এক পালাবদলের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের।

এবারের আন্তর্জাতিক বিরতিতে ইতোমধ্যে বলিভিয়া ও বুর্কিনা ফাসোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলেছে আর্জেন্টিনা। বলিভিয়া ম্যাচের আগেই ওই প্রশ্ন শুনে লিওনেল স্কালোনি সরাসরি জানিয়ে দেন আপাতত কেউ নয়।

“এই ম্যাচগুলোয় কেউ ১০ নম্বর জার্সি পরবে না। এখনই কাউকে এটা দেওয়া হবে না। আমরা লিওর ম্যাচের জন্য অপেক্ষা করব এবং এরপর দেখব কী হয়।”

আর্জেন্টিনার ফুটবলে ১০ নম্বর জার্সির মাহাত্ম্য আকাশচুম্বি। এর পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে বটে। দেশটির তিন বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক যে পরেছেন এই জার্সি: ১৯৭৮ বিশ্বকাপে মারিও কেম্পেস, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনা ও ২০২২ বিশ্বকাপে মেসি।

Image

মেসির ১০ নম্বর জার্সি পাওয়ার লড়াইয়ে এগিয়ে আছেন নিকো পাহ। ছবি: ফিফা

এই জার্সি মেসির কাছেও যে খুব স্পেশাল, তা একবার তার কথায় ফুটে ওঠে।

“আমরা সবাই ভাবতাম যে আমরা খেলোয়াড় হিসেবে একটু ভিন্ন। যদিও আমরা তা ছিলাম না, আমরা সবাই তরুণ বয়সেই ১০ নম্বর জার্সি পরতে চেয়েছি। অবশ্যই, সবসময়ই এটা স্পেশাল জার্সি।”

এদিকে, ২০১৮ সাল থেকে আর্জেন্টিনার ডাগআউটে আছেন লিওনেল স্কালোনি। তার চুক্তির মেয়াদও ফুরিয়ে আসছে। ডিসেম্বরের পর তিনি আর থাকবেন কিনা, এখনও এই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রেখে দিলেও, আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়ক নির্বাচনে অবশ্য দেরি করেননি বিশ্বকাপ জয়ী কোচ। বেছে নিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোকে। তার পরেই আছেন বিশ্বকাপ জয়ী গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস। কিন্তু ১০ নম্বর জার্সির নতুন মালিক নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। মারাদোনা যুগের পর, আরিয়েল ওর্তেগার গায়ে উঠেছিল এই জার্সি। কিন্তু ২০০৯ সালে মেসি প্রথমবার জার্সিটি পরার পর, দলে তার উপস্থিতিতে এই চিত্র কখনও পাল্টায়নি।

কেম্পেস, মারাদোনা ও মেসি মিলে এই জার্সিকে আরও স্পেশাল করে তুলেছেন। তারা তিন জনই বাঁ পায়ের মাস্টার। চমৎকার ড্রিবলিং, বল নিয়ন্ত্রণে রাখার অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা, কল্পনাশক্তি এবং অসাধারণ চতুরতায় প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার ক্ষমতায় তারা আর্জেন্টাইন ফুটবলের চিত্রকর্মে যে তুলির আঁচড় দিয়েছেন, তেমনটা আর খুব কম জনই পেরেছেন।

তাদের লেগ্যাসিই ১০ নম্বরকে মহিমান্বিত করেছে, করেছে আকর্ষণীয়। আর্জেন্টিনার ফুটবলে ১০ নম্বর জার্সির প্রতি মানুষের আবেগ সত্যিই দেখার মতো; তা সে রাস্তায় খেলা হোক, সাধারণ কোনো মাঠে হোক, কোনো আয়োজিত টুর্নামেন্টে হোক কিংবা শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবল-সবখানেই এই সংখ্যা সবার দৃষ্টি কাড়ে।

তাইতো, আর্জেন্টিনা দলে তারকাখচিত এই ১০ নম্বর জার্সিতে মেসির উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে এত আলোচনা।

যে নামগুলো আলোচনার টেবিলে ঘুরেফিরে আসছে, তাদের মধ্যে একজন নিকো পাহ। ২২ বছর বয়সি এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারও বাঁ পায়ে দারুণ কার্যকর। সৃজনশীলতা, প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড়ের মাঝে দারুণ বুদ্ধিমত্তায় বল বের করে নেওয়ার ক্ষমতা এবং দক্ষতা আর স্থিরতার দুর্দান্ত এক মিশেল তাকে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে বা এর আশেপাশে করে তোলে ভয়ঙ্কর।

Image

নতুন নাম্বার টেন হওয়ার সম্ভাবনায় আছেন ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোও। ছবি: ফিফা

এটা ঠিক যে, এবারের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে তিনি খুব বেশি খেলার সুযোগ পাননি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আসরে যাত্রা শুরুর ম্যাচে শেষ দিকে মাঠে নামেন, পরে গ্রুপ পর্বে শেষ ম্যাচে জর্ডানের বিপক্ষে সুযোগ পান শুরুর একাদশে।

দলের ফাইনালে ওঠার পথে আর খেলার সুযোগ পাননি পাহ; তবে তার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। তার মেধা নজর কেড়েছে মেসিরও।

“সে দারুণ মেধাবী এক ফুটবলার এবং আমি আশা করি, সে উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখবে। মূল দলে যখন আমার অভিষেক হয়, তখন তার জন্মও হয়নি। (এই বয়সেই) তার ফুটবলের জ্ঞান অবিশ্বাস্য এবং খুব দ্রুত সে খেলাটিকে পড়তে পারে।

“আশা করি, সে এভাবেই উন্নতি করে যাবে। (জাতীয় দলে) সে খেলেছে এবং খেলাটি উপভোগ করেছে এবং আমার মনে হয়, সে এই দলে স্বচ্ছন্দ বোধ করবে, কারণ আমরা অধিকাংশ সময় পজেশন রেখে খেলি। এভাবে খেলেই সে বেড়ে উঠেছে এবং সফল হতে যা যা দরকার, সবকিছুই তার মধ্যে আছে।”

আরেক সম্ভাবনাময় ফুটবলার ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো এখনও তার মূল ক্লাব রেয়াল মাদ্রিদে জায়গা পাকা করতে পারেননি ঠিকই; কিন্তু ধারে ফিওরেন্তিনায় গিয়ে অল্প সময়েই নিজের সামর্থ্য দেখাতে শুরু করেছেন, রিবার প্লেইতের জার্সিতে ঠিক যেমন পারফরম্যান্সে পাদ্রপ্রদীপের আলোয় উঠে আসেন তিনি।

বয়স তার কেবল ১৯। তবে এই বয়সেই বাঁ পায়ের জাদু, দূর থেকে বুলেট গতির শট নিয়ে প্রতিপক্ষকে চমকে দেওয়া এবং বল পায়ে প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাকে স্পেশাল করে তুলেছে।

পাহ ও মাস্তানতুয়োনোর জুটি হয়ে ওঠা সম্ভব কি না, প্রশ্নে স্কালোনির উত্তর, “তারা একসঙ্গে খেলতে পারে।”

“সাধারণত, এই দুজনের মধ্যে একজন শুরুর একাদশে খেলবে। তবে তারা একত্রেও খেলতে পারে। তাদের মধ্যে সেই আকাঙ্ক্ষা আছে।”

অবশ্য কেবল এই দুজনই নয়, আর্জেন্টিনার ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ী এবং সবশেষ বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা দলের আরও কয়েকজনেরও সম্ভাবনা আছে ১০ নম্বর জার্সি নিজের করে নেওয়ার।

Image

আলেক্সিস মাক আলিস্তের ১০ নম্বর জার্সি পেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ছবি: ফিফা

গত কয়েক বছরে মেসি বেশ কয়েকবার আর্জেন্টিনা দলের মাঝমাঠের দারুণ সব খেলোয়াড়ের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তাদের বিশেষ একটা দিক তিনি উল্লেখ করেছেন, এদের অনেকেই প্লেমেকার হিসেবে খেলে বেড়ে উঠেছেন। আর দেশটির ফুটবলে ঐতিহ্যগতভাবেই এই খেলোয়াড়দের দেওয়া হয় ১০ নম্বর জার্সি।

“আমরা চমৎকার কয়েকজন মিডফিল্ডার পেয়েছি, তাদের অধিকাংশই ক্যারিয়ারে একটা সময় প্লেমেকার হিসেবে খেলেছে এবং সেটা তাদের খেলা দেখলেই বুঝবেন।

“যখন কোনো দল পজেশন রাখায় আধিপত্য করে, তখন একজন প্লেমেকার ভিন্ন কিছু যোগ করতে পারে- এইসব খেলোয়াড় খুব কমই বল হারায়। (তাদের পেয়ে) আমরা এখন মাঝমাঠে কম বল হারাই এবং বেশিরভাগ সময় পজেশন রাখতে পারায় আমরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছি।

আর এই বিষয়টা বিবেচনায় রাখলে, লিভারপুলের ১০ নম্বর আলেক্সিস মাক আলিস্তের, বর্তমানে রিবার প্লেইতে খেলা আলমাদা কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির এন্সো ফের্নান্দেস আর্জেন্টিনার নাম্বার টেন হয়ে উঠলে অবাক হওয়ার মতো কিছু হবে না।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসি-অধ্যায় হয়তো শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছে গেছে, কিন্তু এর ১০ নম্বর জার্সির গল্প ফুরানোর নয়। এই বইয়ের সাদা পাতাগুলো এখন দারুণ সম্ভাবনাময়, স্বপ্নবাজ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ তারকাদের পথচলায় পূর্ণ হবে: তাদের অনেকে ইতোমধ্যে জাতীয় দলের অংশ হয়ে উঠেছেন, দৌড়ে আছে আর্জেন্টিনার পথে-প্রান্তরে বল পায়ে ছুটে বেড়ানো আজকের শিশুরা, সবার স্বপ্ন একদিন আলবিসেলেস্তের ১০ নম্বর জার্সি গায়ে তোলার; কেম্পেস, মারাদোনা কিংবা মেসি হয়ে ওঠার।

যে রঙ স্বপ্ন দেখায়, যে জার্সি স্বপ্নের পথে চলার প্রেরণা জোগায় এবং ঐতিহ্য, দায়িত্ব আর গর্বের মিশেলে যে সংখ্যা সেই স্বপ্নযাত্রায় নেতৃত্ব দেয়- স্কালোনি ও তার কোচিং স্টাফদের এখন সেই নাম্বার টেন খুঁজে নেওয়ার পালা।