শ্রেষ্ঠত্বের আসনে না বসেও যারা সেরা: ব্রাজিল

ফিরে দেখার প্রথম পর্বে থাকছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি ১৯৮২ বিশ্বকাপের ব্রাজিলের কথা।

আব্দুল মোমিনআব্দুল মোমিনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Nov 2022, 04:32 AM
Updated : 18 Nov 2022, 04:32 AM

সিংহাসনে বসতে হলে জিততে হবে বিশ্বকাপ। পরতে হবে মুকুট। সমর্থকদের মন জয় করতেও উঁচিয়ে ধরতে হবে ট্রফি। অন্যথায়? লেখা হবে ব্যর্থতার গল্প, জীবনভর বয়ে বেড়াতে হবে না পাওয়ার হাহাকার। ফুটবলে এসবই চিরাচরিত নিয়ম। তবে আছে কিছু ভিন্নতাও। সমর্থক থেকে শুরু করে বোদ্ধাদের মুখে মুখে শোনা যায় তেমনই কয়েকটি ‘বিশ্বজয়ী’ দলের গল্প। যাদের মাথায় নেই কোনো মুকুট। তবে সুন্দর, দাপুটে আর নজরকাড়া ফুটবলে তারা জয় করে নিয়েছিল সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের মন। 

বিশ্বসেরার মঞ্চে সেই দলগুলো আবির্ভুত হয়েছিল সম্ভাব্য সেরা হিসেবে, ফেভারিটের তকমা গায়ে মেখে। রক্ষণ, মাঝমাঠ কিংবা আক্রমণভাগ-কোনোখানেই কোনো ঘাটতি ছিল না তাদের। তাদের একমাত্র ক্ষুধা ছিল সাফল্য, জয়টাকে অভ্যাসে পরিণত করেছিল তারা। প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ঙ্কর, আর সমর্থকদের চোখে শিল্পী। কিন্তু শেষটা তাদের হয়েছিল অবিশ্বাস্য; বিশ্ব সেরা হওয়ার হাতছানিতে এসে ফিরতে হয়েছিল একরাশ হতাশা নিয়ে।

জয়ীদের নামই মনে রাখে সবাই। দ্বিতীয় কে হয়েছিল মনে রাখে না কেউ। উজ্জ্বল তিন ব্যতিক্রম আছে ফুটবলে- ১৯৫৪ বিশ্বকাপের হাঙ্গেরি, ১৯৭৪ বিশ্বকাপের নেদারল্যান্ডস এবং ১৯৮২ বিশ্বকাপের ব্রাজিল দল।

কাতার আসরকে সামনে রেখে ফিরে দেখার দ্বিতীয় পর্বে থাকছে ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করা, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনের একটির শিকার ব্রাজিলের কথা 

সুন্দর ফুটবলের ব্রাজিল

‘জোগো বোনিতো’র সুরে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিল যদি মোহনীয় ফুটবলের চারাগাছ বুনে থাকে, এক যুগ বাদে কোচ তেলে সানতানার দল যেন ছিল তার ফসল। মাঠে বল পায়ে তাদের বিচরণ ছিল যেন ক্যানভাসে শিল্পীর তুলির ছোঁয়া। ফুটবলপ্রেমী মাত্রই সেই শৈল্পিক সৌন্দর্য্যের প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছিল। 

খেলোয়াড়দের সঙ্গে বলের সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছিন্ন। সক্রেতিস-জিকোদের প্রতিটি পাসে থাকতো যত্নের ছাপ, পাসগুলো হতো নিখুঁত, সুচারু। চোখের পলকে ছোট্ট একটা ফ্লিকে, ব্যাকহিলেই তারা পাল্টে দিতে পারতেন খেলার গতিপথ।

মাঠের দখল রেখে, ফুটবলের সৌন্দর্য্যে দর্শকদের আচ্ছন্ন করে হামলে পড়ত প্রতিপক্ষের সীমানায়। তাদের ছন্দে, শরীরী ভাষায় ফুটে উঠত আত্মবিশ্বাসের ছাপ। হার এড়ানো নয়, যেকোনো মূল্যে জয় পাওয়াও নয়, দলকে সালতানা উদ্বুদ্ধ করেছিলেন ‘সুন্দর ফুটবল খেলেই জিততে হবে’ এই মন্ত্রে। জিকো, সক্রেতিসরা এই মন্ত্র মনের গহীনে গেঁথেও নিয়েছিলেন। 

স্পেনের ওই বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলটি অনেকের চোখে দেশটির ইতিহাসের সেরা। তারা শিরোপা জিততে পারেনি, উঠতে পারেনি সেমি-ফাইনালেও, কিন্তু আদায় করে নিয়েছিল সবার ষোলআনা শ্রদ্ধা। 

ফুটবল আঙিনায় তাদের দাপটের শুরু হয়েছিল বছর কয়েক আগে। টানা ১৯ ম্যাচ অপরাজিত থেকে, ওই ম্যাচগুলোয় প্রতিপক্ষের জালে ৪৬ বার বল পাঠিয়ে এবং কেবল ১০ গোল হজম করে বিশ্বকাপে পা রেখেছিল ব্রাজিল। এর মধ্যে তারা জিতেছিল টানা ১০ ম্যাচে; সাত দিনের মধ্যে লন্ডনে ইংল্যান্ডকে, প্যারিসে ফ্রান্সকে এবং স্টুটগার্টে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়েছিল সানতানার শিষ্যরা। 

বিশ্বকাপেও তাদের শুরুটা হয়েছিল প্রত্যাশিত, দুর্দান্তর কিছুর বার্তা দিয়ে। সেই আসরে ছিল দুই ধাপের গ্রুপ পর্ব। প্রথম পর্বে চার দলের গ্রুপে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ ছিল জায়ান্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে। ৩৩তম মিনিটে পিছিয়ে পড়ার পর হারের শঙ্কায় পড়েছিল দলটি। ২৫ মিনিট বাকি থাকতে একজনকে কাটিয়ে আরেক জনের চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে অনেক দূর থেকে বুলেট গতির শটে সমতা টানেন সক্রেতিস।

নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট বাকি থাকতে আরেকটি দূলপাল্লার শটে ২-১ গোলে জয় নিশ্চিত করেন এদের। তার গোলটির সময় গোলরক্ষক জায়গা থেকে নড়ার সুযোগ পাননি। পরের দুই ম্যাচে তারা জয় তুলে নেয় অনায়াসে; স্কটল্যান্ডকে ৪-১ ও নিউ জিল্যান্ডকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে পা রাখে পরের ধাপে। 

‘সি’ গ্রুপে জিকোদের প্রতিপক্ষ ছিল আর্জেন্টিনা ও ইতালি। প্রথম পর্বের তিন ম্যাচে ১০ গোল করা ব্রাজিল দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বের শুরুতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের ৩-১ গোলে গুঁড়িয়ে শেষ চারে ওঠার সম্ভাবনা জোরাল করে। 

একদিকে ব্রাজিল ছুটছিল দুর্দান্ত গতিতে, অন্যদিকে ইতালি ধুঁকতে ধুঁকতে পা রাখে দ্বিতীয় ধাপে। প্রাথমিক ধাপের গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের একটিও জিততে পারেনি তারা, তিন ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে উঠে আসে। এই তিন ম্যাচে তারা গোল করেছিল মোটে দুটি। 

দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে পা রাখে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে। গোল ব্যবধানের হিসেবে এগিয়ে থাকায় ব্রাজিল ওই ম্যাচে ড্র করলেই উঠে যেত সেমি-ফাইনালে। কিন্তু, সেই ব্রাজিল তো যেকোনোভাবে লক্ষ্য পূরণে নামা দল নয়। তাদের ডিএনএ-তেই তা ছিল না। এবং কাল হলো সেটাই।

বার্সেলোনার সাররিয়া স্টেডিয়ামে সেদিন শুরু থেকেই সবকিছু অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটতে থাকে। প্রথম চার ম্যাচে একটিও গোলের দেখা না পাওয়া পাওলো রস্সি পঞ্চম মিনিটেই ব্রাজিলের বুকে হানেন প্রথম আঘাত। দ্রুত পাল্টা জবাবও দেয় ফেভারিটরা; দ্বাদশ মিনিটে সমতা টানেন সক্রেতিস। 

তবে রস্সি ছিলেন খুনে চেহারায়। ২৫তম মিনিটে আবারও দলকে এগিয়ে নেন তিনি। পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু করা ব্রাজিল ৬৮তম মিনিটে আবারও সমতায় ফেরে রবের্তো ফালকাওয়ের গোলে। 

সেলেসাওদের স্বস্তির স্থায়ীত্ব যদিও ছিল পাঁচ মিনিট। ছয় গজ বক্সের মুখ থেকে ডান পায়ের জোরাল শটে হ্যাটট্রিক পূরণ করেন স্ট্রাইকার রস্সি। 

শেষ হয়ে যায় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান, সেমি-ফাইনালে পা রাখে ইতালি। পরে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ইতালিয়ানরা।

ওই হারের প্রসঙ্গে ‘সাদা পেলে’ নামে পরিচিত জিকো পরবর্তীতে একবার বলেছিলেন, সেদিন ফুটবলের মৃত্যু হয়েছিল। সানতানার ব্রাজিলের ফুটবলে মোহিত হয়েছিলেন আজকের সেরা কোচদের একজন পেপ গুয়ার্দিওলাও। সেই সময় তিনি ছিলেন ১১ বছরের বালক। অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞের মতো তিনিও একবাক্যে মেনে নেন, কখনও বিশ্বকাপ জিততে না পারা সবচেয়ে পরিশীলিত ৮২’র ব্রাজিল। বিশ্বসেরা দলের প্রসঙ্গ উঠতে এখনও জিকো-সক্রেটিস-এদেরদের কথাই বলেন গুয়ার্দিওলা, যেমনটা ২০১৯ সালে ইএসপিএন’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও বলেছিলেন বর্তমানে ম্যানচেস্টার সিটির এই স্প্যানিশ কোচ। 

“অনেক অনেক বছর পরও মানুষ যদি এই দলকে স্মরণ করে, তার কারণ হলো দলটা সত্যিকার অর্থেই খুব ভালো ছিল। আমি জানি না, কিছু চ্যাম্পিয়ন দলও তাদের মতো এতটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে কিনা।” 

“একটা দল অতটা ভালো হলেই কেবল ২০-৩০ কিংবা ৪০ বছর পর তাদের নিয়ে আলোচনা হয়। আর এ বিষয়ে এখনও কথা হওয়ার কারণ, দলটি মানুষকে এখনও আবেগতাড়িত করে।” 

সে আবেগে না পাওয়ার বিষাদের সুরও নিশ্চয়ই বাজে। তাই নয় কি?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক