০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রথম কোচের চোখে মেসি যেমন

গর্বের সঙ্গে ফুটবলের মহাতারকার বিদায়বেলায় পুরো যাত্রাপথের দিকে ফিরে তাকালেন তার প্রথম কোচ হুগো তোকালি।

প্রথম কোচের চোখে মেসি যেমন

আর্জেন্টিনা যুব দলে নিজের প্রথম কোচ হুগো তোকালির সঙ্গে লিওনেল মেসি। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Oct 2026, 09:10 PM

Updated : 06 Oct 2026, 09:10 PM

প্রথম পর্বটি লেখা হয়েছিল দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনা স্টেডিয়ামে (তৎকালীন স্তাদিও সান পাওলো)। ২০০৪ সালের ২৯ জুন আর্জেন্টিনা ও বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হয়ে আছে: সেদিন লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার কোনো দলের হয়ে তার প্রথম ম্যাচটি খেলেন, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে অনূর্ধ্ব-২০ দলের একটি প্রীতি ম্যাচ।

স্পেনের হাত থেকে তাকে নিজেদের দলে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) তড়িঘড়ি করে আয়োজন করে ম্যাচটি। আর সেটিই হয়ে যায় দেশের হয়ে মেসির অবিশ্বাস্য যাত্রার সূচনা। তার প্রথম কোচ হুগো তোকালি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি গর্বের সঙ্গে ফুটবলের মহাতারকার বিদায়বেলায় পুরো যাত্রাপথের দিকে ফিরে তাকালেন।

বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে বর্ণাঢ্য ও গৌরবময় যাত্রার ইতি টানবেন মেসি। বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর পাঁচটায় শুরু হবে ম্যাচটি।

আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসির বিদায়বেলা নিয়ে মিশ্র অনুভূতির কথা জানালেন তোকালি।

“একদিকে আমি খুশি, কারণ বলা যায় ফুটবল মেসিকে ছেড়ে যায়নি; বরং মেসিই ফুটবলকে ছাড়ছে। আর তার মতো একজন গ্রেট খেলোয়াড়ের জন্য, যে বিশ্বের সেরা... আমার মনে হয় আর্জেন্টাইনদের তার জন্য গর্ববোধ করা উচিত। জাতীয় দলের হয়ে সে আমাদের এত কিছু দিয়েছে, তাই আশা করি তার জন্য সবকিছু চমৎকার হবে।”

বর্তমানে ইন্দিপেন্দিয়েন্তের যুব একাডেমির সমন্বয়কারী হিসেবে কর্মরত তোকালির মতে, একেবারে শুরুর দিকের অনুশীলন সেশন থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মেসি ‘অন্য ধাঁচের’ এক খেলোয়াড়। যদিও স্বীকার করে নেন যে, মেসির এমন স্বপ্নময় ক্যারিয়ারের কথা কখনও তিনি কল্পনাও করেননি।

প্যারাগুয়ে অনূর্ধ্ব-২০ দলের বিপক্ষে সেই ম্যাচটির কথাও তোকালির স্পষ্টভাবে মনে আছে। প্রায় দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে, বার্সেলোনা থেকে সদ্য আসা ১৭ বছর বয়সি এক কিশোর-যাকে তখন কেউ চিনত না এবং দলের তালিকায় যার নাম লেখা ছিল ‘মেচি’ (Mecci)। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে দ্রুতই তার জাদুকরি সামর্থ্যের পরিচয় দেন। ড্রিবল করে প্রতিপক্ষের দুজন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে, গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে বাঁ পায়ের শটে দলের সপ্তম গোলটি (৮-০ ব্যবধানের জয়ে) করেন মেসি। এভাবেই ‘আলবিসেলেস্তেদের’ সঙ্গে তার ভালোবাসার সম্পর্কের সূচনা।

তোকালি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সে মাঠের আক্রমণভাগের অংশে বল পায় এবং শেষ পর্যন্ত বলটি জালে জড়িয়ে দেয়।”

স্পেনও মেসিকে নিজেদের দলে নিতে চেয়েছিল; তাদের আগেই তাকে দলে পাওয়ার লক্ষ্যে তড়িঘড়ি করে সেই ম্যাচটির আয়োজন করা হয়। তোকালি জানান, তৎকালীন এএফএ সভাপতি হুলিও গ্রন্দোনা তাকে ‘দ্রুত’ ম্যাচটি আয়োজন করতে বলেছিলেন।

২২ বছর পরেও পেছনে ফিরে তাকিয়ে বিষয়টি নিয়ে ভাবেন ও বিশ্লেষণ করেন তোকালি।

“পুরো বিষয়টি আমরা খুব দ্রুততার সঙ্গে করেছিলাম। এসব নিয়ে সবসময়ই ভাবি এবং এমনটা করতে পেরে আনন্দও পাই। তবে এও বলি, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে ঘটনাটি সেভাবেই ঘটেছিল; কারণ দেখুন... স্প্যানিশ জাতীয় দল তাকে দলে নিতে চেয়েছিল। যদি সে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে না খেলত, তাহলে কী হতো? তখন আমি যুব দলের দায়িত্বে ছিলাম। আমি যদি সেই পদক্ষেপ না নিতাম, তবে সব দায়ভার আমার ওপরই পড়ত।”

আর্জেন্টিনার যুব দলে মেসির প্রথম কোচের সঙ্গে তার সবশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০২৩ সালের জুনে, রোসারিওর মার্সেলো বিয়েলসা স্টেডিয়ামে মাক্সি রদ্রিগেসের বিদায়ী ম্যাচে। সে সময়ের কথা স্মরণ করলেন তোকালি।

“আমরা বেশ কিছুক্ষণ কথা বলি এবং তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। আমাদের মতো কোচদের জন্য-যারা সবসময় তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করে- সে এক অসাধারণ আদর্শ। সে কেবল তার খেলার দক্ষতার জন্যই যে আদর্শ, তা নয়; মাঠ ও মাঠের বাইরে সবসময়ই তার আচরণ অনুকরণীয়। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়কে যখন উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরার প্রয়োজন হয়, তখন নিঃসন্দেহে তার নাম নেওয়া যায়।

“আমরা তার সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি, কারণ আমার মতে, আর্জেন্টিনার যুব ফুটবলের উন্নয়নে সে বিশাল অবদান রেখেছে।”

রোসারিওতে জন্ম নেওয়া এই ফুটবল জাদুকর জাতীয় দলের হয়ে তার ঐতিহাসিক অধ্যায়ের ইতি টানার দুয়ারে। ২১ বছর ধরে আলবিসেলেস্তেদের জার্সি গায়ে জড়িয়ে তিনি অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে গেছেন-কখনও ভুগেছেন, একের পর এক ফাইনালে হেরেছেন, আবার কখনও রেকর্ড ভেঙেছেন ও শিরোপা জিতেছেন; অবশেষে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে পৌঁছেছেন সাফল্যের চূড়ায়।

২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল তার শেষ বড় আসর। সেখানেও আটটি গোল করে তিনি ছিলেন লিওনেল স্কালোনির দলের মূল কাণ্ডারি। ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।

৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপে মেসির এমন পারফরম্যান্সে মোটেও অবাক হননি তোকালি, “আমি বরং এমনটাই আশা করেছিলাম।”

এবারের ব্যালন দ’রও মেসিরই পাওয়া উচিত বলে মনে করেন এই কোচ, “বিশ্বকাপ জয় এবং সবকিছুর পর সে যেভাবে এই অধ্যায় শেষ করছে... নিঃসন্দেহে এই পুরস্কার তার প্রাপ্য।”