২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 08 Apr 2026, 08:32 AM
আক্রমণের সুর বেঁধে দেওয়া, নিখুঁত এক রক্ষণচেরা পাসে চোখের পলকে প্রতিপক্ষের রক্ষণের আগল খুলে দেওয়া, একক নৈপুণ্যের দারুণ সব গোলে ব্যবধান গড়ে দেওয়া- কেভিন ডে ব্রুইনের নামটি চোখে পড়লেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে ফুটবলের এমন সব জাদুকরি মুহূর্ত।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন বেলজিয়ান প্লেমেকার কেভিন ডে ব্রুইনে।
অনেক আগে থেকেই ক্লাব ও জাতীয় দলের নিউক্লিয়াস এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি বাইরে থাকার পর, মাঠে ফিরেছেন আবার। লক্ষ্য এবার তার স্বরূপে ফেরার। ২০২৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়াম কতটা এগোতে পারবে, তার অনেকটাই হয়তো নির্ভর করবে ডে ব্রুইনের দুই পায়ে।
ফুটবলের আঙিনায় ডে ব্রুইনের পথচলা ও অর্জন
স্বদেশের ক্লাব হেঙ্কে নিজেকে শাণিত করে, ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজর কাড়তে সময় নেননি ডে ব্রুইনে। ২১ বছর বয়সে যোগ দেন চেলসিতে। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে যদিও তেমন খেলার সুযো্গই পাননি তিনি, সেখান থেকে প্রথমে তাকে ধারে পাঠানো হয় ভার্ডার ব্রেমেনে, এরপর বিক্রি করে দেওয়া হয় ভলফসবুর্কে।
মূলত এই জার্মান ক্লাবেই তারকা হয়ে ওঠার পথে যাত্রা শুরু করেন ডে ব্রুইনে। তাকে নিয়ে সংশয়ের যে ছোটখাট জায়গাগুলো ছিল, ক্লাবটিতে একমাত্র মৌসুমে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে সব যেন উড়িয়ে দেন তিনি। ২০১৪-১৫ মৌসুমে তার পায়ে যেন সৃষ্টিশীল ফুটবলের নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়। দলটির হয়ে ৫১ ম্যাচ খেলে ১৬টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের ২৮টি গোলে অবদান রাখেন তিনি।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ওই মৌসুমে লিওনেল মেসি ও সেস ফাব্রেগাস ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড গড়েন ডে ব্রুইনে। ভলফসবুর্কের হয়ে সেবারের জার্মান কাপ ও জার্মান সুপার কাপও জয় করেন তিনি।

অমন আধিপত্য বিস্তারী পারফরম্যান্সের পর, তাকে পেতে উঠেপড়ে লাগে ম্যানচেস্টার সিটি এবং ২০১৫ সালের অগাস্টে তাকে বড় অঙ্কের ট্রান্সফার ফিতে চুক্তিভুক্ত করে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবটি। ইতিহাদ স্টেডিয়ামের আঙিনাতেই শ্রেষ্টত্বে চূড়ায় উঠে বসেন এই বেলজিয়ান তারকা।
সিটি শিবিরে তিনি আসার পরের মৌসুমে এর ডাগআউটে যোগ দেন পেপ গুয়ার্দিওলা এবং সাফল্যে ভরপুর এক অধ্যায়ের যাত্রা শুরু তাদের। এই কিংবদন্তিতুল্য কোচের কৌশলের মূল অস্ত্র হয়ে ওঠেন ডে ব্রুইনে, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে রেখে আক্রমণের সুর বেঁধে দেওয়ায় যার জুড়ি মেলা ভার।
সিটির জার্সিতে ছয়টি প্রিমিয়ার লিগ ও একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ অসংখ্য শিরোপা জয় করেন তিনি এবং এই সময়ে দলটির প্রতিটি সাফল্যেই উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন ডে ব্রুইনে। ২০২২-২৩ মৌসুমে সিটির ট্রেবল (চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ ও এফএ কাপ) জয়ের অভিযানে নায়কদের একজন ছিলেন তিনি; মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৯ ম্যাচে ১০টি গোল ও ৩১টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি।
১০ বছরের সিটি অধ্যায়ে ক্লাবটির সমর্থকদের প্রিয় তারকা হয়ে উঠেছিলেন ডে ব্রুইনে। তবে সবকিছুরই যে শেষ আছে, প্রকৃতির এই নিয়ম মেনেই যেন গত বছরের জুলাইয়ে নাপোলিতে যোগ দেন তিনি এবং অল্প সময়েই নতুন এই সমর্থকগোষ্ঠির হৃদয়ে জায়গা করে নেন ৩৪ বছর্ বয়সী এই ফুটবল জিনিয়াস।
গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে চোট পাওয়ায় যাত্রায় ঘটে কিছুটা ছন্দপতন। তিন মাসের কঠিন সময় শেষে, মাঠে ফিরে নিজেকে পুনরায় মেলে ধরতে শুরু করেছেন ডে ব্রুইনে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার অভিষেক ২০১০ সালে, ফিনল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ গোলে হারের ম্যাচে। জাতীয় দলে জায়গা পাকা করতে তার বছর দুয়েক লেগে যায়। তবে একবার শুরুর একাদশে নিয়মিত হওয়ার পর, আর কখনও পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
‘রেড ডেভিলস’ নামে পরিচিত বেলজিয়ামের সোনালী যুগের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন ডে ব্রুইনে। ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি ম্যাচে মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচ দিয়ে জাতীয় দলের হযে শততম ম্যাচ খেলার কীর্তি গড়েন এবং একটি গোল করে স্মরণীয় উপলক্ষ্যটাও রাঙান তিনি।

গ্রেটদের্ চোখে ডে ব্রুইনে
“স্পষ্টতই, কেভিন ডে ব্রুইনের ফুটবল মস্তিষ্ক আমার দেখা সবচেয়ে সেরা। আমার মনে হয়, তার মতো স্মার্ট খেলোয়াড় আমি আর দেখিনি। বেলজিয়ামের জার্সিতে তাকে ছয় বছর দেখেছি আমি। সে অনুশীলনে এমন সব কিছু করে, যা তাকে ম্যাচেও করতে দেখেছি। বল পায়ে তার কর্মকাণ্ড কখনও কখনও আপনাকে হতবাক করে দেবে, কারণ সে সত্যিই একজন । সে অবিশ্বাস্য।”
- বেলজিয়ামের সাবেক সহকারী কোচ থিয়েরি অঁরি
“কেভিন আমার জীবনে দেখা সেরা খেলোয়াড়দের একজন। সে যে যেকোনো কিছু করতে পারে, সত্যিকার অর্থেই সবকিছু করতে পারে।”
- ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গুয়ার্দিওলা
“পেপের দল মূলত দল হিসেবে জিতে, কিন্তু অসাধারণ কোনো দলেরও কখনও এমন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হয়, যখন বিশেষ কিছুর দরকার পড়ে। বার্সেলোনায়, আমাদের এই কাজটা করত মেসি আর এই ম্যানচেস্টার সিটি দলে সেই ফুটবলার হলো ডে ব্রুইনে।”
- ডে ব্রুইনে সিটিতে থাকা্র সময়ে মন্তব্য করেছিলেন বার্সেলোনা ও স্পেন গ্রেট শাভি
“কেভিন ডে ব্রুইনে সবার চেয়ে এগিয়ে। তাকে খেলতে দেখাটা আনন্দের। তাই আশা করি, সে ক্লাব ও জাতীয় দলে এই পর্যায়ে আরও অনেক দিন থাকবে।”
- ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইয়ে কাজাখস্তানকে ৬-০ গোলে বিধ্বস্ত করার পর বেলজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া।

পরিসংখ্যানের আলোয় ডে ব্রুইনে
• মাঝমাঠের এই জাদুকর অনেকটাই এগিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির অ্যাসিস্টের রাজা; সাবেক সতীর্থ দাভিদ সিলভার ১৩৬ অ্যাসিস্টের রেকর্ড ভেঙে সতীর্থদের ১৭৭টি গোলে অবদান রাখেন ডে ব্রুইনে।
• বেলজিয়াম জাতীয় দলের হয়ে ইতিহাসের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড ডে ব্রুইনের, ১১৫টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। তালিকায় তার ওপরে আছেন ইয়ান ভার্টোনেন (১৫৭টি ম্যাচ খেলে রেকর্ডটি সাবেক এই ডিফেন্ডারের দখলে), আক্সেল উইটসেল, টবি আল্ডারভেইরেল্ড, এদেন আজার ও রোমেলু লুকাকু।
• বেলজিয়াম জাতীয় দলের হয়ে ৩৬টি গোল করেছেন, এর এক-তৃতীয়াংশ এসেছে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে।
• প্রিমিয়ার লিগে দুইবার করে মৌসুম সেরা হওয়া খেলোয়াড়ের একজন হলেন ডে ব্রুইনে; এই তালিকার অন্যরা হলেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, থিয়েরি অঁরি, নেমানিয়া ভিদিচ ও মোহামেদ সালাহ।

বিশ্বকাপে ডে ব্রুইনে এবং ২০২৬ ঘিরে প্রত্যাশা
বিশ্বকাপে অভিষেক আসরে (২০১৪) দলের প্রথম জয়ে আলজেরিয়ার বিপক্ষে একটি অ্যাসিস্ট করেন ডে ব্রুইনে। পরে শেষ ষোলোয় যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানের জয়ে একটি করে গোল ও অ্যাসিস্ট করেন তিনি। তবে কোয়ার্টার-ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা।
২০১৮ বিশ্বকাপেও তার গল্পটা অনেকটা একইরকম। প্রথম ম্যাচে (পানামার বিপক্ষে ৩-০ গোলে জয়) একটি অ্যাস্টিস্ট করেন তিনি। পরে কোয়ার্টার-ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ২-১ গোলের স্মরণীয় জয়ে দলের দ্বিতীয় গোলটি (প্রতিপক্ষের আত্মঘাতী গোলে শুরুতে এগিয়ে যায় বেলজিয়াম) করেন এই তারকা। সেমি-ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ১-০ হেরে শেষ হয় তাদের শিরোপা স্বপ্ন। পরে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২-০ গোলে জয়ের দিনেও একটি অ্যাসিস্ট করেন তিনি।
চার বছর আগে কাতারে সবশেষ বিশ্বকাপটা তার ও তার দলের ভীষণ বাজে কাটে। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় বেলজিয়াম এবং আসরে কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি তিনি।
বয়স মধ্য তিরিশে পৌঁছে গেলেও, সর্বোচ্চ পর্যায়ে এখনও দ্যুতি ছড়ানোর এবং প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরানোর সামর্থ্য আছে ডে ব্রুইনের। তার চারপাশেও আছে প্রতিভাবান ও অভিজ্ঞ ফুটবলারের উপস্থিতি, যারা দলগত ফুটবলে পরাস্ত করতে পারেন যেকোনো দলকে।
বাছাইয়ে তাদের শক্তিশালী আক্রমণভাগ ও জমাট রক্ষণেরও প্রমাণ মিলেছে; সেখানে অপরাজেয় যাত্রায় আট ম্যাচের পাঁচটি জিতে ও তিনটি ড্র করে সরাসরি মূল পর্বে ওঠে তারা এবং এই ম্যাচগুলোয় ২৯টি গোল করে দলটি, হজম করে সাতটি।
তাই সোনালী যুগ পেছনে ফেলে এলেও, এই বেলজিয়াম দলকে নিয়ে আশায় বুক বাঁধতে পারে সমর্থকরা।
এবারের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে আগামী ১৫ জুন মিশরের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু করবে বেলজিয়াম। ‘জি’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ ইরান ও নিউ জিল্যান্ড।