২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 16 May 2026, 09:12 AM
বছরের পর বছর উন্নতির পথ ধরে ছুটছেন সাদিও মানে। বিশ্বের বিভিন্ন লিগে পেয়েছেন সাফল্য। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, তুমুল গতি আর গোল করার সামর্থ্যে তিনি হয়ে উঠেছেন সময়ের সেরাদের একজন। কয়েক বছর আগে সেনেগালকে জিতিয়েছেন আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স, সবশেষ আসরেও খেলেছেন ফাইনালে। এবার বিশ্বকাপে নিজের ছাপ ফেলার হাতছানি মানের সামনে।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন সেনেগালের উইঙ্গার সাদিও মানে।

ফুটবলের আঙিনায় মানের অর্জন
পেশাদার ফুটবলে মানের যাত্রা শুরু ২০১১ সালে, ফ্রান্সের ক্লাব মেস দিয়ে। সেখান থেকে সালসবুর্কে গিয়ে আরও পরিণত হন সেনেগালের এই ফরোয়ার্ড। সাউথ্যাম্পটনের হয়ে আলো ছড়ান ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ।
তার তারকা হয়ে ওঠা মূলত লিভারপুলে। ২০১৬ সালে প্রিমিয়ার লিগের এই দলে যোগ দেওয়ার পর নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি। ইয়ুর্গেন ক্লপের দলে আক্রমণভাগে তিনি ছিলেন নিয়মিত এবং এখানেই তিনি নিজেকে সময়ের সেরা ফরোয়ার্ডদের তালিকায় নিয়ে যান।
মোহামেদ সালাহ ও রবের্তো ফিরমিনোর সঙ্গে গড়েন ভয়ঙ্কর এক ত্রিফলা আক্রমণভাগ। বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় লিভারপুলের ফেরায় তাদের ছিল অনেক বড় অবদান।
লিভারপুলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, উয়েফা সুপার কাপ, প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতেন মানে। ২০২২ সালে জেতেন এফএ কাপ ও লিগ কাপ। এখন যে শিরোপা ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ নামে পরিচিত, সেটিও জিতেন ২০১৯ সালে।
লিভারপুলের হয়ে ২৬৯ ম্যাচে ১২০ গোল করেন মানে, আরও অবদান রাখেন ৪৬ গোলে।
২০২২-২৩ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখে খেলে বুন্ডেসলিগা ও সুপার কাপ জয়ের স্বাদ পান মানে। ২০২৩ সালে খুঁজে নেন নতুন চ্যালেঞ্জ। যোগ দেন মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর দল আল নাসরে। সেখানেও নিজের শীর্ষ মান ধরে রেখেছেন তিনি।
সেনেগাল জাতীয় দলে মানের প্রভাব বিশাল। ২০২১ সালে আফ্রিকা কাপ নেশন্স জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। মহাদেশীয় প্রতিযোগিতায় সেটা সেনেগালের প্রথম শিরোপা। তুমুল বিতর্কিতভাবে শেষ হওয়া সবশেষ আসরে দলকে তিনি নিয়ে যান ফাইনালে। এবার তাদের সামনে ২০২৬ বিশ্বকাপ।

কোচ ও কিংবদন্তিদের চোখে মানে
“সে অসাধারণ একজন খেলোয়াড়। যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন সে কি স্ট্রাইকার- হ্যাঁ, কখনও কখনও। সে কি মিডফিল্ডার? হ্যাঁ, কখনও কখনও। সে সম্ভবত আরেকটু গভীরেও খেলতে পারে। সে শারীরিকভাবে শক্তিশালী, টেকনিক্যালি দৃঢ়, অবিশ্বাস্যরকমের ক্ষিপ্র, চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রেও সে গতিময় এবং সে দুই পায়েই ভালো শট নিতে পারে। সে অসাধারণ একজন মানুষ।”
ইয়ুর্গেন ক্লপ
“সে অসাধারণ, তার খেলা দেখাটাই দারুণ ব্যাপার। সেই ওই ধরনের খেলোয়াড় যার খেলা দেখার জন্য আপনি প্রতি সপ্তাহে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করবেন। কারণ, তার খেলা দৃষ্টিনন্দন। সে খুবই গতিময়- সে ফল এনে দেয়। তার মতো গতিময়, বলে তার ছোঁয়া এবং যে চমৎকার কৌশল সে দেখায়… সে বিশ্বমানের।”
স্টিভেন জেরার্ড
“এই (ক্লপ) যুগে লিভারপুলে আমার প্রিয় খেলোয়াড় সাদিও মানে শেষ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। ‘লো মেইটেনেন্স, হাই পারফরম্যান্স’ এবং কখন চোটে না পড়া। প্রচুর ট্রফি ও গোল, সত্যিকারের লিভারপুল কিংবদন্তি। ধন্যবাদ সাদিও।”
জেমি ক্যারাগার
“যদিও ২৫ বছর বয়সে যেমন ছিল, সাদিও এখন ততটা চটপটে নয়, তবুও সে এখনও দলকে খুব সাহায্য করতে পারে। সে মাঠে থাকলে আমাদের জয়ের সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ বেড়ে যায়। কারণ সে মাঠে থাকলে প্রতিপক্ষ উদ্বিগ্ন থাকে। আমরা এখনও সাদিওর শেষ দেখিনি।”
এল হাজি দিয়ুফ
পরিসংখ্যানের আলোয় মানে
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের রেকর্ড বইয়ে মানে জায়গা করে নেন ২০১৫ সালের ১৬ মে। সেদিন অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে সাউথ্যাম্পটনের হয়ে কেবল ২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের মধ্যে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। প্রিমিয়ার লিগে যা এখনও দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড।
সেনেগালের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২৪ ম্যাচ খেলেছেন মানে। তার চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন কেবল এভারটন মিডফিল্ডার ইদ্রিসা গেয়ি (১২৯)।
৩৪ বছর বয়সী মানে আন্তর্জাতিক ফুটবলে করেছেন ৫২ গোল। সেনেগালের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় তার ধারে কাছে নেই কেউ। ২০২২ সালের ৪ জুন বেনিনের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের জয়ে হ্যাটট্রিক করে হেনরি কামারার ২৯ গোল ছাড়িয়ে রেকর্ড নিজের করে নেন তিনি।
লিভারপুল ও সাউথ্যাম্পটনের হয়ে ইংল্যান্ডে নিজের আট মৌসুমে মানে সবসময়ই গোলের ক্ষেত্রে দুই অঙ্ক স্পর্শ করেন। ২০১৮-১৯ মৌসুমে লিভারপুল সতীর্থ সালাহ ও আর্সেনালের পিয়ের-এমেরিক অবামেয়াংয়ের সঙ্গে যৌথভাবে জেতেন প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট। সেবার তারা করেন ২২টি করে গোল।

বিশ্বকাপে মানে
কেবল একটি আসরে খেলেছেন মানে, ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে। সেবার দলের প্রতিটি মিনিট খেলেন মানে।
পোল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানের জয়ে আসর শুরু করে সেনেগাল। জাপানের সঙ্গে ড্র করে ২-২ ব্যবধানে। পরে কলম্বিয়ার বিপক্ষে হারে ১-০ গোলে।
জাপানের বিপক্ষে জালের দেখা পান মানে। তিন ম্যাচেই তিনি ভীতি ছড়ান প্রতিপক্ষের রক্ষণে। তবে গ্রুপ পর্বেই শেষ হয় সেনেগালের বিশ্বকাপ।
২০২২ বিশ্বকাপে চোটের জন্য খেলা হয়নি মানের। বিশ্বকাপ দল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় তাকে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে মানে ও সেনেগালের প্রত্যাশা
বড় প্রতিযোগিতায় ভালো করতে পারদর্শী খেলোয়াড়দের উপস্থিতিতে ২০২৬ বিশ্বকাপে বড় লক্ষ্য নিয়েই খেলবে সেনেগাল। সোনালী প্রজন্মের খেলোয়াড়রা ২০২১ আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সের শিরোপা জিতেছেন (যেটি মাঠে গড়িয়েছিল ২০২২ সালে)।
মহাদেশীয় প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে নিজেদের মেলে ধরছে তারা। এবার বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে ছাপ ফেলার চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে। বিশ্বকাপ অভিষেকে ২০০২ সালে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়ে খেলেছিল কোয়ার্টার-ফাইনালে। এর পুনরাবৃত্তির স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামবেন মানে ও তার সতীর্থরা।
ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে সেনেগালের বিশ্বকাপ। ‘আই’ গ্রুপের অন্য দুই দল ইরাক ও নরওয়ে।