মাঠে আঘাতে দে মিগেলের মৃত্যু: গোলকিপারের বিরুদ্ধে কী হত্যা মামলা হতে পারে?
মাঠের সংঘর্ষের পর তেনেরিফের ফরোয়ার্ড হেসুস দে মিগেলের মৃত্যুর ঘটনায় সম্ভাব্য অনিচ্ছাকৃত হত্যার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে স্প্যানিশ পুলিশ।
দ্বিতীয় বিভাগের ম্যাচে প্রতিপক্ষ দলের গোলরক্ষকের সঙ্গে মাঠের সংঘর্ষে এক ফুটবলারের মৃত্যুর ঘটনায় স্প্যানিশ পুলিশ সম্ভাব্য অনিচ্ছাকৃত হত্যার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
মাঠের সংঘর্ষের পর তেনেরিফের ফরোয়ার্ড হেসুস দে মিগেল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে মঙ্গলবার তার ক্লাব জানিয়েছে। তার বয়স হয়েছিল ৩০ বছর।
গত সোমবার মাঠের মাঝখানে বল দখলের লড়াইয়ের সময় এফসি আন্দররার গোলকিপার হেসুস ওউনো বিপরীত দিক থেকে বল ক্লিয়ার করার চেষ্টায় দৌড়ে এসে দে মিগেলের বুকে আঘাত করেন। ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা সময়ের খেলা চলছিল তখন। ওই ফাউলের জন্য ওউনোকে তখনই সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়।
স্পেনের জাতীয় পুলিশ মঙ্গলবার জানিয়েছে যে, এই ঘটনায় তারা তদন্ত শুরু করেছে। স্প্যানিশ আইন অনুযায়ী, দুর্ঘটনাসহ অপ্রাকৃতিক কারণে হওয়া মৃত্যু বিচার বিভাগীয় তদন্তের আওতায় আসে।
দে মিগেলের মৃত্যুর দুঃখজনক ঘটনায় গোলকিপার ওউনোও রাতারাতি রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়ে গেছেন। ওই ফাউলের জন্য বিশ্বজুড়েই তুমুল সমালোচিত হচ্ছেন তিনি।
কে এই জেসুস ওউনো
২৫ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক ইকুয়েটোরিয়াল গিনির বাটা শহরে জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু শৈশবে স্পেনে চলে আসেন।
আট বছর বয়সে সান সেবাস্তিয়ানের যুব ক্লাব আন্তিগুয়োকোতে যোগ দিয়ে তিনি ফুটবলার হওয়ার পথচলা শুরু করেন। ১২ বছর বয়সে পাড়ি জমান রেয়াল সোসিয়েদাদে। ২০১৭ সালে নাম লেখান আলাভেসে। পেশাদার ফুটবলে তার পথচলা শুরু হয় ২০১৯ সালে সান ইগনাসিওর হয়ে। ২০২১ সালে ফিরে আসেন আলাভেসে। লা লিগায় ইকুয়েটোরিয়াল গিনির প্রথম ফুটবলার তিনিই।
গত বছর ধারে খেলেন তিনি আন্দররায়। এবার সেখানে ২০টি লিগ ম্যাচে ছয়টি ক্লিন শিট রাখেন। এরপর গত আগস্টে তিনি এই ক্লাবেই দুই বছরের চুক্তি করেন।
২০১৯ সালের মার্চ মাসে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পরপরই ইকুয়েটোরিয়াল গিনির হয়ে অভিষেক হয় ওউনোর। দেশের জার্সিতে মাঠে নেমেছেন তিনি ৪৬টি ম্যাচে। গত বছর আফ্রিকা অব অব নেশন্সে দলের সব ম্যাচে প্রতিটি মিনিট তিনি খেলেছেন এবং গত সেপ্টেম্বরে ডিআর কঙ্গো ও সিয়েরা লিওনের বিপক্ষে খেলেছেন ২০২৭ আসরের বাছাইপর্বের ম্যাচে।
সংঘর্ষের পর ওউনোর প্রতিক্রিয়া যেমন ছিল
মাঠের মাঝখানে সংঘর্ষের পর মাটিতে পড়ে থাকা ডি মিগেলের র দিকে ফিরে তাকাননি ওউনো। রেফারি দ্রুত লাল কার্ড দেখাতে পারেন, এই শঙ্কা থেকেই হয়তো সঙ্গে সঙ্গে টাচলাইনের দিকে হাঁটতে শুরু করেন তিনি।
তবে লাল কার্ড দেখে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সতীর্থ নাচো কুইন্তানার সঙ্গে করমর্দনের পর, যখন চিকিৎসাকর্মীদের দ্রুত মাঠে ডাকা হচ্ছিল, তখন তিনি ফিরে তাকান এবং দৌড়ে গিয়ে ঘাসের উপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ডি মিগেলকে ঘিরে থাকা ফুটবলারদের সঙ্গে যোগ দেন।
তিনি মাঠেই ছিলেন, যতক্ষণ না ক্লাব কর্মকর্তারা তাকে টানেলের দিকে নিয়ে যান। ঠিক সেই সময়েই স্টেডিয়ামের অপর প্রান্ত থেকে ডি মিগেলকে স্ট্রেচারে করে মাঠ থেকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলঅপেক্ষারত একটি অ্যাম্বুলেন্সে। অনলাইনে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, এই ঘটনায় ওউনোর ভূমিকার জন্য গ্যালারিতে থাকা তেনেরিফের সমর্থকরা তাকে লক্ষ্য করে ‘খুনি’ বলে স্লোগান দিচ্ছে।
ওউনো কেন অনলাইনে আক্রমণের শিকার হচ্ছেন
ডি মিগেলেকে করা ওউনোর সেই চ্যালেঞ্জটিকে বেপরোয়া এবং অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে ব্যাপকভাবে।
নির্ধারিত সময়ের মাত্র সাত মিনিট বাকি থাকতে ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা অ্যান্দররা তখন প্রত্যাবর্তনের আশায় শেষ মুহূর্তে চাপ বাড়াচ্ছিল। গোলরক্ষক ওউনো তখন তার এরিয়ার বেশ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
যখন তেনেরিফে তাদের নিজেদের বক্সের প্রান্ত থেকে বলটি মাঝমাঠের দিকে বাতাসে ক্লিয়ার করে দেয়, তখন ডি মিগেল গোলের দিকে পরিষ্কারভাবে দৌড়ে যাওয়ার জন্য ফেভারিট ছিলেন। এজন্য ওউনো দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বলটি বাউন্স করার আগেই বাতাসে তাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য লাফিয়ে ওঠেন এবং মনে হয় তার হাঁটু ডি মিগেলের বুক ও মাথায় আঘাত করে।
সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই দাবি তুলেছেন, ফুটবল থেকে ওউনো আজীবন নিষিদ্ধ করা হোক এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা হোক। তার প্রোফাইলে বর্ণবাদী গালিগালাজ, অপমান এবং ‘খুনি’ মন্তব্যে ভরিয়ে দিয়েছেন অনেকেই।
ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট, যেটিতে প্রায় ৩০ হাজার ফলোয়ার ছিল, মঙ্গলবার সেটি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। ওউনো নামের আরেকজন ফুটবলার, মিচেল ওউনো, যিনি স্প্যানিশ ষষ্ঠ বিভাগের ক্লাব কান ভিদালেতের হয়ে খেলেন, তাকে হেসুস ওউননো ভেবে গালিগালাজ করেছেন অনেকেই।
স্প্যানিশ ফুটবল কর্তৃপক্ষ কি ওউনোকে শাস্তি দিতে পারে?
হ্যাঁ, পারে এবং তারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই তা করবে।
স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী, খেলার সময় সহিংস আচরণের ফলে গুরুতর আঘাত পাওয়া ফুটবলারদের চার থেকে ১২ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে।
ডি মিগেলের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে একটি তদন্তে শাস্তি নির্ধারণের আগে সেই চ্যালেঞ্জটি এবং এটি যে প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল, তা মূল্যায়ন করা হবে।
কোনো ফুটবলারকে কি অবহেলাজনিত হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা যেতে পারে?
যদিও কঠোর ক্রীড়াসুলভ শাস্তি অনিবার্য বলে মনে হচ্ছে, অনেক ফুটবল অনুসারীর মতে, ওউনোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগও আনা উচিত।
তেনেরিফের স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে মঙ্গলবার বিকেলে বলা হয়েছে, সান্তা ক্রুসের পুলিশের হত্যাকাণ্ড তদন্তকারী দল ইতোমধ্যেই দে মিগেলের মৃত্যুর পরিস্থিতি তদন্ত করছে। সম্ভাব্য অনিচ্ছাকৃত নরহত্যার বিষয়ে তদন্তটি হচ্ছে।
স্প্যানিশ আইন অনুযায়ী, দুর্ঘটনা সহ অপ্রাকৃতিক কারণে হওয়া মৃত্যু বিচার বিভাগীয় তদন্তের আওতায় আসে। সান্তা ক্রুস দে তেনেরিফের প্রধান প্রসিকিউটর হোসে লুইস সানচেজ-হাওরেগি স্প্যানিশ সংবাদ সংস্থা ইএফই-কে বলেছেন যে, ফৌজদারি মামলা হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ সংঘর্ষটি খেলার সময়ই ঘটেছিল।
ম্যাচের মাঝে মাঠের কোনো ঘটনার কারণে একজন ফুটবলারের মৃত্যু খুবই বিরল এবং এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনায় নজির স্থাপন করা হয়নি।
অভিযোগের বিষয়টি সম্ভবত এই বিষয়ের উপর নির্ভর করবে যে, ওওনোর চ্যালেঞ্জটি ফৌজদারি অবহেলার মানদণ্ড পূরণ করে কি না।
স্প্যানিশ দণ্ডবিধির ১৪২ নং ধারায় গুরুতর অবহেলার কারণে নরহত্যা এবং কম গুরুতর অবহেলার কারণে নরহত্যার মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা আছে।
গুরুতর অবহেলা প্রমাণিত হলে, এর জন্য চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে, যেখানে কম গুরুতর অভিযোগের জন্য তিন থেকে ১৮ মাসের মধ্যে জরিমানা ধার্য করা হয়।
ফুটবলে সংঘর্ষ থেকে প্রাণঘাতী আঘাত বিরল
গত বছর স্পেনে পঞ্চম বিভাগের একটি ম্যাচে সংঘর্ষের সময় মাথায় আঘাত পেয়ে ১৯ বছর বয়সী এক গোলরক্ষক মারা যান। দুইবার হৃদযন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় কলিন্দ্রেসের গোলরক্ষক রাউল রামিরেসের, একবার মাঠে এবং তারপর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সে। দুই দিন পর তাকে ‘ব্রেন ডেড’ ঘোষণা করা হয়।
২০০১ সালে সিএসকেএ মস্কোর হয়ে খেলার সময় একটি ম্যাচে ইউক্রেনীয় গোলরক্ষক সেরহি পেরখুন সংঘর্ষে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান।
দ্বিতীয় বিভাগের একটি খেলায় সেল্তা ভিগোর ফরোয়ার্ড বালতাজারের সাথে সংঘর্ষের তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় পর ১৯৮৭ সালের জানুয়ারিতে মালাগার গোলরক্ষক হোসে আন্তনিও গাইয়ার্দো মারা যান।
দে মিগেলের শেষ বিদায়
তেনেরিফে ক্লাবের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার রায়কো গার্সিয়া সাংবাদিকদের জানান যে, পরিবারের অনুরোধে দে মিগেলের মরদেহ তলেদো প্রদেশের নাভাহেরমোসায় নিয়ে যাওয়া হবে। তিনি বলেন, দে মিগেলের সতীর্থ এবং ক্লাব কর্মকর্তারা তাকে ‘শেষ বিদায়’ জানাতে উপস্থিত থাকবেন।
গার্সিয়া বলেন, শনিবার ভক্তরা প্রয়াত ফুটবলারকে সম্মান জানাতে দলের স্টেডিয়ামে জড়ো হবেন, “আমরা সবাই একজোট হয়ে একসঙ্গে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠব।”
ক্লাব সভাপতি ফেলিপে মিনিয়াম্ব্রেস বলেন, দে মিগেলের মৃত্যুতে তার সতীর্থদের এবং তাদের পরিবারের শোক কাটিয়ে উঠতে সম্ভবত সাহায্যের প্রয়োজন হবে।
“আমাদের পেশাদার সাহায্য লাগবে এবং আমাদের সকল ভক্তের সাহায্যের প্রয়োজন হবে। আজ আমাদের যেমন লাগছে, তাদেরও ঠিক তেমনই লাগবে।”
মাদ্রিদে জন্ম নেওয়া দে মিগেল ২০১৫ সালে লেগানেস ‘বি’ দলের হয়ে সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু করেন এবং পরবর্তীতে স্পেনের বেশ কয়েকটি নিচের দিকের ক্লাবের হয়ে খেলেন। গত বছর তিনি তেনেরিফেতে যোগ দেন।
দে মিগেলের আগে থেকে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে কোনো খবর পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
স্প্যানিশ গণমাধ্যম জানিয়েছে, দে মিগেল তার স্ত্রী ও এক কন্যাকে রেখে গেছেন।
ক্লাবের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “সান্ত্বনার কোনো ভাষা নেই। এই গভীর শোক লাঘব করার মতো কিছুই নেই। আমরা তার শোকার্ত পরিবার, প্রিয়জন এবং সমগ্র তেনেরিফে সম্প্রদায়ের পাশে আছি।”
সাবেক বার্সেলোনা তারকা জেরার্দ পিকের মালিকানাধীন আন্দরররা ও অন্যান্য ক্লাব, স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন এবং লা লিগার সঙ্গে শোক প্রকাশ করেছে।
“হেসুস দে মিগেলের পরিবার, তার সকল সহকর্মী ও বন্ধু এবং তেনেরিফের প্রতি গভীরতম সমবেদনা জানাচ্ছি। তিনি শান্তিতে থাকুন”, বিবৃতিতে বলেছে আন্দরররা।
সামাজিক মাধ্যমে পিকে লিখেছেন, “হৃদয়ের গভীর থেকে দুঃখিত আমি। শান্তিতে বিশ্রাম নাও, হেসুস।”
মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অংশগ্রহণকারী দলগুলো দে মিগেলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচ আয়োজনকারী তিনটি স্প্যানিশ দল—বার্সেলোনা, আতলেতিকো মাদ্রিদ এবং ভিয়ারেয়াল—খেলা শুরুর আগে প্রতিযোগিতার প্রথাগত সঙ্গীত না বাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এই স্টেডিয়ামগুলোতে এবং ইউরোপের অন্যান্য স্টেডিয়ামে, যেমন ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে যেখানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড রোমার বিপক্ষে খেলছিল, দে মিগেলের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং মাঠের ভেতরের বড় পর্দায় এই ফরোয়ার্ডের ছবি প্রদর্শন করা হয়।
রেয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়রা অনুশীলনের সময় দে মিগেলের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন করেন, অন্যদিকে শীর্ষ সারির আরেক ক্লাব এস্পানিওল তাদের নতুন কোচের পরিচিতি পর্ব স্থগিত করে।
লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপেসহ বিশ্বজুড়ে অনেক তারকা ও ক্লাব শোকবার্তা দিয়েছে।
