Published : 11 Sep 2025, 02:58 PM
প্রীতি ম্যাচ খেলতে নেপালে গিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন আর সহিংসতার মধ্যে কাঠমান্ডুতে আটকা পড়া বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল অবশেষে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে।
বিমানবন্দরে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশ সময় বেলা ২টা ৫৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিশেষ একটি ফ্লাইটে যাত্রা শুরু করেছেন হাভিয়ের কাবরেরা, জামাল ভূঁইয়ারা।
বাংলাদেশ দল নেপাল ছাড়ার আগে বিমাবন্দরে গণমাধ্যম কর্মীদের মুখোমুখি হয়ে নেপালের বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিল পলিটিক্যাল মোহাম্মদ শোয়েব আব্দুল্লাহ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন।
“পুরো ব্যাপারটাই ছিল খুব ঝামেলাপূর্ণ। আপনারা সবাই জানেন, নেপালের কী পরিস্থিতি, আপনারাও এখানে ছিলেন। মাত্র দেড় দিনের মাথায় একটা দেশের পরিস্থিতি এত অবনতির দিকে যাবে, এটা আসলে কেউই ধারণা করতে পারেনি।”
“৯ তারিখ আমাদের দ্বিতীয় ম্যাাচ ছিল। আমরা সেই ম্যাচ দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ওই দিনই সকাল থেকে পরিস্থিতি এত খারাপ হয়ে গেল এবং রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সব কিছু বন্ধ হয়ে গেল। চারিদিকে বিভিন্ন ধরনের ঝামেলা হচ্ছিল, গাড়ি পোড়ানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় আগুন দেওয়া, বিভিন্ন ধরনের ঝামেলার জন্য আমরা খুবই চিন্তিত ছিলাম যে, বাংলাদেশ ফুটবল দলের কী হবে।”

এই পরিস্থিতিতে সবার আগে চাওয়া ছিল, বাংলাদেশ দলকে নিরাপদে বের করে দেশে নিয়ে যাওয়া। দ্রুততম সময়ে এই পরিকল্পনা সফল করায় যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন নেপাল দূতাবাসের এই কর্মকর্তা।
“উনারা যে হোটেলে ছিলেন, সেখানে আক্রমণেরও শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। আমরা খুবই চিন্তিত ছিলাম। সে সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো ছিল না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ছিল না। সেক্ষেত্রে আমরা কার ওপর নির্ভর করব বিদেশে বসে? আল্লাহর রহমতে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেনি। এর মধ্যে আমরা ঢাকা থেকে নির্দেশনা পেলাম বিশেষ ফ্লাইটের অনুমতি নিয়ে, বিশেষ ফ্লাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ দলকে ঢাকা পাঠাতে হবে। এখানে সকল সরকারী অফিসগুলো বন্ধ ছিল, সেগুলো হামলার শিকার হচ্ছিল, যে কারণে ব্যাপরটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল, কীভাবে আমরা রাতারাতি এই অনুমতি পাব।”
“নেপালের কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই, তারা স্বশরীরে অফিস না করলেও আমাদের এক দিনের মাথায় জরুরি অবতরণের অনুমতি দিয়েছেন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি স্পেশাল ফ্লাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ দল কিছুক্ষণের মধ্যে কাঠমান্ডু ত্যাগ করবেন এবং ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন।”
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাস এবং বাংলাদেশ সরকারের সম্মিলিত চেষ্টায় ফুটবল দলকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শফিকুর রহমান ও দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তারাও বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বার্তায় আশা প্রকাশ করা হয়, বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে ওই বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফিরে আসবেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা।
বাংলাদেশ-নেপাল ম্যাচের সংবাদ সংগ্রহের জন্য নেপালে যাওয়া সাংবাদিকরাও একই ফ্লাইটে রয়েছেন।
নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা আটকা পড়া সাংবাদিকদের থামেল থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন।
বাংলাদেশ ফুটবল দল ৩ সেপ্টেম্বর নেপালে গিয়েছিল দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে। ৬ সেপ্টেম্বর প্রথম ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হয়। দ্বিতীয় ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল ৯ সেপ্টেম্বর।
কিন্তু সোশাল মিডিয়ার ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি আর দুর্নীতির প্রতিবাদে জেন-জি আন্দোলনে সহিংসত শুরু হলে দ্বিতীয় ম্যাচ বাতিল হয়ে যায়।

মঙ্গলবার পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে ২২ জনের মৃত্যুর পর নেপালের প্রধানমন্ত্রীসহ কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। দেশটির পার্লামেন্ট ভবন ও মন্ত্রীদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়।
নেপালের বিভিন্ন অংশে সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে কারফিউ জারি করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বিমানবন্দর। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ফুটবল দল কাঠমান্ডুর হোটেলে আটকা পড়ে।
তাদের ফিরিয়ে আনতে বিমানের একটি ফ্লাইট মঙ্গলবার কাঠমান্ডু গেলেও ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনুকূল পরিস্থিতি না থাকায় নামার অনুমতি পায়নি। পরে সেটি ঢাকায় ফিরে আসে।
বুধবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “নেপালে অবস্থানরত বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।
“দলের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
“প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দলের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।”
বাংলাদেশ দলের মিডফিল্ডার সোহেল রানা বুধবার এক ভিডিও বার্তায় নিজেদের অবস্থা জানিয়ে সবাইকে আশ্বস্ত করেন।
তিনি বলেন, “গতকালকের থেকে আমাদের আজকের অবস্থা খুবই ভালো। গতকাল নেপালে যে একটা পরিস্থিতি ছিল…কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত। যেহেতু সেনাবাহিনী সব কিছুর দায়িত্ব নিয়েছে, তো আমাদের বর্তমান অবস্থা ভালো।”
“পরিবারের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। যেহেতু এখন নিরাপত্তার বিষয়গুলো সেনাবাহিনীর হাতে, তো এমন পরিস্থিতিতে দেশে পরিবারের সবাই এখন আর চিন্তা করছে না। হোটেলে আমরা খুব ভালো অবস্থায় রয়েছি। সব মিলিয়ে পরিবার এখন চিন্তা মুক্ত রয়েছে।”