Published : 16 Jul 2026, 12:10 PM
জুলাই অভ্যুত্থান দমনে আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টার কয়েকটি মামলার তদন্তে অসঙ্গতি পাওয়ার তথ্য এসেছে পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।
কোনো মামলার বাদীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, কোথাও ‘নিহত’ ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় বিদেশে রয়েছেন। কোনো মামলায় গুলিতে নিহত বা আহত হওয়ার দাবি করা হলেও তদন্তে সেই দাবির সমর্থনে প্রমাণ মেলেনি।

কোনো মামলায় ঘটনার সময় ঘটনাস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে অবস্থান করা ব্যক্তিদেরও আসামি করার প্রমাণ উঠে এসেছে পুলিশের প্রতিবেদনে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে হামলা ও হত্যার জের ধরে বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকার প্রবেশমুখ যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মোহাম্মদপুরের বছিলা, রামপুরায় চলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড।
দমন-পীড়ন সত্ত্বেও এই আন্দোলন পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানে। ৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।
জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানে জুলাই অভ্যুত্থানে ১৪০০ লোক নিহত হওয়ার ধারণা দেওয়া হয়েছে। সরকারি গেজেট অনুযায়ী নিহত হয়েছে সাড়ে আটশ’র মতো।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের গত বছরের অগাস্ট পর্যন্ত তথ্যে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ঘটনায় রাজধানীর ৫০টি থানায় ৭০৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯।
এর মধ্যে সর্বাধিক মামলা হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানায়, ১৯টি। পল্টন মডেল থানায় ১৬টি, হাতিরঝিল ও ভাটারা থানায় সাতটি, রামপুরা থানায় পাঁচটি এবং উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিম থানাসহ বিমানবন্দর, দক্ষিণখান থানায় মামলা হয়েছে ১৩টি।
এর মধ্যে ১২৬টি মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন এসব মামলায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও তার সরকারের মন্ত্রী-এমপি এবং আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা আসামি।
তদন্ত শেষে ইতোমধ্যে ১৯টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে আদালতে।
এর মধ্যে তিনটি মামলাকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ হিসেবে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
বাকি ১৬টি মামলায় পাওয়া গেছে তথ্যগত অসঙ্গতি, ভুল পরিচয়, ভুয়া কাগজপত্র এবং ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতার অমিল।
আদালতে জমা দেওয়া এসব প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে নিরীহ মানুষকে আসামি করার হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় ঢালাও মামলা এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ আগেই উঠেছে, যা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

হত্যা ও গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বেশ কয়েকটি মামলায় পলাতক অবস্থায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধান শেখ হাসিনা ও তার সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, সাবেক এমপি, আওয়ামী লীগ নেতা, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক-আইজির বিচার চলছে।
ইতোমধ্যে একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। কয়েকটি মামলায় পুলিশের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তারও মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে।
আন্দোলনে সহিংসতার অভিযোগে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির কার্যক্রমেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
‘আমি মরলে সৌদি আরব এলাম কীভাবে’
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর হাতিরঝিলের উলন সড়ক এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ৪৬ বছর বয়সি মো. বাবু নিহত হয়েছেন, এমন অভিযোগে আদালতে মামলা হয়, যার তদন্তের ভার পড়ে হাতিরঝিল থানা পুলিশের ওপর।
এ মামলার এজাহারে বাদী হিসেবে স্বাক্ষর রয়েছে ‘নিহত’ বাবুর খালাতো ভাই পরিচয় দেওয়া ইসমাঈল নামে এক ব্যক্তির। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা, বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাসহ পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর আদালতে জমা দেওয়া এই মামলার চুড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজাহারে দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা অনুসারে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বরুরকান্দি গ্রামে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, বাবু নামে যার ‘নিহত’ হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তিনি জীবিত। তার প্রকৃত নাম মো. শাকিল এবং তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে শাকিল একটি ‘ভয়েস মেসেজ’ পাঠান। তিনি বলেছেন, “আমি তো মারা যাইনি ভাই। আমি মরলে সৌদি আরব আসলাম কীভাবে? এ বিষয়ে পুলিশ আগেই আমার সঙ্গে কথা বলেছে। এখন আমি সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করি।”

বাদীর দাবি, মামলা করেছে অন্য কেউ
এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার বাদীর পরিচয় যাচাই করেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এজাহারে দেওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করলে মিলন পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, তিনি ইসমাঈল নন। পরে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ধরে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রামপুর এলাকায় ইসমাঈলের খোঁজ পায় পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তিনি দাবি করেন, এ ধরনের কোনো মামলা করেননি তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতে উপস্থিত হয়েও ইসমাঈল একই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কেউ মামলাটি করেছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমও ইসমাঈলের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এজাহারে দেওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করলে একজন নারী ফোন ধরে বলেন, “ইসমাঈল নামে কাউকে চিনি না। আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।”
জাল মৃত্যুসনদের কথাও বলছে তদন্ত
হাতিরঝিল থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল ইসলামের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজাহারে অভিযোগ করা ‘বাবু’ নামে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তে ঘটনাস্থল, সাক্ষ্য-প্রমাণ, চিকিৎসকের মতামত, জুলাই শহীদদের সরকারি তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে ওই নামে কোনো ব্যক্তি নিহত হওয়ার তথ্য মেলেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার সঙ্গে সংযুক্ত মৃত্যুসনদ পরীক্ষা করে সেটি জাল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রকৃত ভুক্তভোগী কিংবা বাদীর অস্তিত্বও তদন্তে পাওয়া যায়নি। এসব কারণে তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটিকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে তুলে ধরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন এবং এজাহারে নাম থাকা আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাসেল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্তে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। মামলায় উল্লেখ করা নিহত ব্যক্তি ও বাদী—দুজনের দাবিরই সত্যতা পাওয়া যায়নি। তদন্তে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে একটি চক্র অসৎ উদ্দেশ্যে মামলাটি করেছে।”
মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন বর্তমানে আদালতের বিবেচনায় রয়েছে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৩ অগাস্ট এ বিষয়ে শুনানির দিন রেখেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এ মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী লুৎফর রহমানের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

কাটাছেঁড়ার দাগকে গুলিবিদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালে রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ২৪ বছর বয়সি পারভেজ আলীর মৃত্যু হয়েছে, এমন অভিযোগ করে ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় একটি হত্যা মামলা করেন ইয়াসিন আরাফাত।
মামলায় তিনি নিজেও ওই দিন গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে দাবি করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ঘটনাস্থলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ অস্ত্র হাতে গুলি চালান। এ সময় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী ও পুলিশ সদস্যরা তাদের সঙ্গে ছিলেন।
এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাপস, পরশসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়। এছাড়া পুলিশের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তাও এ মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন।
মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইকে।
তদন্তে নেমে পিবিআই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা পারভেজ আলীর কোনো অস্তিত্ব পায়নি।
এছাড়া মামলার বাদী ইয়াসিন আরাফাত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন—এ দাবিও সঠিক নয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তদন্ত শেষে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর পিবিআই আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়, সেখানে বলা হয়েছে, কথিত নিহত ব্যক্তির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ কারণে পুরো ঘটনাকে ভিত্তিহীন হিসেবে তুলে ধরে মামলাটি মিথ্যা বলে অভিহিত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম মামলা নিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে বাদী হওয়ার বিষয়টিই অস্বীকার করেন ইয়াসিন আরাফাত। পরে তিনি বলেন, “আমি একটু ব্যস্ত আছি, আপনার সঙ্গে এই বিষয়ে পরে কথা হবে।”
এরপর বুধবার তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তার বাবা বিল্লাল হোসেন গাজীর সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।
এরপর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ইয়াসিন আরাফাতের গ্রামের বাড়িতে খোঁজ নিয়েছে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা বাজারে ইয়াসিন আরাফাত ও তার বাবা পরিচিত মুখ বলে জানান স্থানীয় লোকজন।

বাজারের একাধিক ব্যক্তি বলেন, একসময় আরাফাত স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেন। পরে ঢাকা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর প্রথমে ছাত্রলীগ এবং পরে ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা দেখা যায়।
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকায় ইয়াসিন আরাফাত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন—এমন কোনো তথ্য স্থানীয়দের কেউ দিতে পারেননি।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলম বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গুলিবিদ্ধ হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। এগুলো সব ভুয়া। তদন্তে পুলিশ এসেছিল, তারাও কোনো প্রমাণ পায়নি।”
তিনি বলেন, “ছেলেটা চতুর, চালু আছে। ওর কোনো কিছুই বিশ্বাসযোগ্য নয়। শুনেছি, এখন ঢাকায় সাংবাদিকতা করেন।”
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই মো. মাসুদ রানা বলেন, “কোনো একসময় তার পায়ে আঁচড় লেগে বা পড়ে গিয়ে কাটা-ছেঁড়ার যে দাগ হয়েছিল, সেটিকেই গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন হিসেবে দেখিয়ে মামলাটি করা হয়েছিল। তার দাবি অনুযায়ী পায়ে গুলি লেগেছিল, অথচ বিষয়টি তার বাবাও জানতেন না।”
তিনি বলেন, “গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবির পক্ষে ইয়াসিন আরাফাত কোনো মেডিকেল সনদও দেখাতে পারেননি।”

পারিবারিক শত্রুরা আসামি
ইয়াসিন আরাফাত বাদী হয়ে পল্টন থানায় করা এই মামলায় আসামি করা হয়েছে পাবনার আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা; দুজনই পেশায় ট্রাকচালক।
তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ তাদের গ্রামের বাড়িতে গেলে প্রথমবারের মতো মামলার বিষয়ে জানতে পারেন তারা।
তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে অভিযোগের বিষয়টি শুনে তারা বিস্মিত হওয়ার কথা বলেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে।
মামলার বাদী বা কথিত ভুক্তভোগী—কাউকেই তারা চেনেন না বলে তারা দাবি করেছেন।
আব্দুল মতিন বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের অস্থির পরিস্থিতির কারণে পরিবহন চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় তারা কাজহীন ছিলেন। সে সময় রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে তাদের থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার বাবার জন্মেও এই বাদী বা যে মারা গেছে বলে বলা হচ্ছে, তাদের নাম শুনিনি ভাই।”
ঢাকার একটি ঘটনায়, যেখানে বাদীর বাড়ি সাতক্ষীরায় এবং আপনাদের বাড়ি পাবনায়—কোনো পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে আসামি হলেন?
জবাবে মতিন বলেন, “পাশের বাড়ির কাশেম মুন্সির সঙ্গে আমাদের জমিজমা নিয়ে বিরোধ আছে। তার ভাতিজা রনি ঢাকায় ক্যামেরাম্যানের চাকরি করে। শুনেছি, বাদী আর রনি দুজনে বন্ধু। তারাই মিলে হয়রানি করার জন্য আমাদের এই মামলায় আসামি করেছে।”
এ অভিযোগের বিষয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম রনির বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ফোন ধরেননি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক মো. মাসুদ রানা বলেন, “আসামিদের ওই দিনের ফোন কলের বিস্তারিত তথ্য (সিডিআর) পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি, তারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না।”

বাদী ‘লাপাত্তা’
মিথ্যা হিসেবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া আরেকটি হত্যা মামলার তদন্ত করেছে আদাবর থানা পুলিশ। গত বছরের ৩০ নভেম্বর আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মামলাটিকে মিথ্যা বলে তুলে ধরা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ, আসামির তালিকা এবং এজাহারের ভাষার ক্ষেত্রে হাতিরঝিল ও পল্টন থানার ওই দুটি মামলার মিল আছে।
এ মামলায়ও বাদীর যে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে, তা সঠিক নয়। নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা ব্যক্তির নাম-পরিচয় ও ঠিকানা অসম্পূর্ণ এবং পরিচয়গত অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তদন্তে বাদীরও কোনো খোঁজ মেলেনি।
এজাহারে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আদাবর থানা এলাকায় পুলিশ, আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আলী মিয়া নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।
এ ঘটনায় মো. তোহা খান বাদী হয়ে মামলা করেন। তদন্তে নেমে ঘটনার সত্যতা পায়নি পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার এসআই তরুণ কুমার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তদন্ত শেষে আমরা ঘটনা সত্য নয় বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছি।”
বাদী তোহা খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এজাহারে মোবাইল নম্বরটি সচল পায়নি।
এছাড়া আদাবরের যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, সেখানে গিয়েও তার কোনো খোঁজ মেলেনি।
বুধবার সকালে ঠিকানা অনুযায়ী ওই বাড়িতে গেলে বাসিন্দারা বলেন, তোহা নামে সেখানে কেউ থাকেন না। তবে সেই বাড়ির বাসিন্দারা বরং জানতে চান- সে (তোহা) এখানে থাকে কিনা, এটা জেনে কী হবে।

ভুয়া অভিযোগ, বাদীর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা?
সাধারণভাবে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়েরের ঘটনায় বাদীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব বেশি নেই।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হত্যা বা হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের হওয়া যেসব মামলা তদন্তে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে, সেসব মামলার বাদীদের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির পাওয়া মেলেনি। তারা আদৌ আইনের আওতায় আসবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যদি প্রমাণিত হয় যে মামলা ভুয়া, তাহলে দণ্ডবিধির ২১১ ধারার অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। সে ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।”
তিনি বলেন, “এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব বেশি না হলেও একেবারে যে নেই, তা নয়। জুলাইয়ের মামলাগুলোর শুরুতেই আমরা আশঙ্কা করেছিলাম, এ ধরনের ঘটনাই ঘটবে। এখন তদন্তে ঠিক সেটাই সামনে আসছে।”
মিথ্যা অভিযোগে করা এসব মামলার কারণে প্রকৃত মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব পড়বে? জবাবে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “ফৌজদারি আইনে প্রতিটি মামলা স্বতন্ত্র। অন্য মামলায় কী হয়েছে, সেটি কোনো মামলার বিচার নির্ধারণ করে না।
“তবে একই ধরনের একাধিক মিথ্যা মামলা সামনে এলে বিচারকদের মানসিকতায় একটি সামগ্রিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। তখন এমন একটি ধারণা জন্মাতে পারে যে, সব অভিযোগই হয়তো সত্য নয়।”
ভুয়া মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো উদ্যোগ আছে?
জবাবে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলার ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রেও সেটাই হবে। তবে জুলাইকে কেন্দ্র করে হওয়া ভুয়া হত্যা মামলাগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকার যদি বিশেষ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি ভিন্ন বিষয়।”