Published : 18 Aug 2025, 01:36 AM
তেইশ বছর বয়সী জান্নাতুল নাঈম দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন মেরুদণ্ডের সমস্যায়; দেশে কাঠখড় পুড়িয়ে খুব বেশি উপকার মেলেনি।
বাধ্য হয়েই প্রতিবেশী ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নাঈম। তবে পটপরিবর্তনের বাস্তবতায় সীমিত আকারে যে চিকিৎসা ভিসা দেওয়া হচ্ছিল তা তিনি পাননি। এরপরই চিকিৎসার জন্য চীনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নাঈম। ভাইকে নিয়ে উড়াল দেন দক্ষিণ চীনের ইয়ুননান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংয়ে।
নাঈম ভর্তি হন কুনমিংয়ের তংরেন হাসপাতালে। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার অস্ত্রোপচার হয়। ইতোমধ্যে নাঈমের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলে জানান তার ভাই রাশেদিন।
তিনি বলেন, “চিকিৎসা ব্যয় ছিল প্রায় ৬০ হাজার ইউয়ান বা ১০ লাখ টাকা (১ ইউয়ান সমান ১৬.৯৫ টাকা), যা বাংলাদেশের শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতালের খরচের সমান হলেও সেবার মান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
“ডাক্তার নিজেই বিছানা পরিষ্কার করেছেন ও ড্রেসিং করেছেন। নার্সরা রাতে প্রায় ১০ বার রোগীর খোঁজ নিয়েছেন। এখানে ডাক্তার-নার্সদের আন্তরিকতা সত্যিই অসাধারণ।”
চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে চীনা সরকারের আমন্ত্রণে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ৬ থেকে ৯ অগাস্ট কুনমিং সফর করে। প্রতিনিধি দলটি সেখানকার বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করে।

ঢাকা থেকে কুনমিং মাত্র ঘণ্টা আড়াইয়ের পথ, তবে দিনে ফ্লাইট রয়েছে মাত্র একটি। সেখানে বেশ কিছু অত্যাধুনিক হাসপাতাল রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটিকে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য বিশেষভাবে উন্মুক্ত করেছে চীন সরকার।
মার্চ থেকে অগাস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ছয় শতাধিক বাংলাদেশি চিকিৎসা ভিসা পেয়েছেন।
কানের চিকিৎসার জন্য আসা এক রোগী বললেন, “এখানে রোবটিক প্রযুক্তিতে দক্ষ চিকিৎসকরা কাজ করছেন। সকাল থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে এবং সবকিছুই সন্তোষজনক।”
ভিসা ও যাতায়াত
ঢাকায় চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, এখন থেকে এক কর্মদিবসেই চিকিৎসা ভিসা দেওয়া হবে।
কুনমিংয়ে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. খালিদ বলেন, চিকিৎসা ভিসার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চীন সরকার দ্রুত ভিসা দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে।

“জরুরি প্রয়োজনে একদিনের মধ্যেও ভিসা দেওয়া হচ্ছে এবং গ্রিন চ্যানেলের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। শিগগিরই হাসপাতালের সুবিধা ও সেবার বিস্তারিত তথ্য নিয়ে একটি ফেইসবুক পেজ চালু হবে।”
ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, চীনে চিকিৎসা সহজ করতে ‘গ্রিন চ্যানেল সার্ভিস’ চালু হয়েছে। সাক্ষাৎকারের সময়সীমা বাতিল করা হয়েছে এবং আবেদনকারীরা যেকোনো কর্মদিবসে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিতে পারছেন।
তিনি বলেন, “যেকোনো বাংলাদেশি রোগী চীনের কোনো হাসপাতাল থেকে চিকিৎসার আমন্ত্রণপত্র পেলেই এক কর্মদিবসের মধ্যে ভিসা পাবেন। এখন বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা কোনো সমস্যা নয়।”
বর্তমানে ঢাকা-কুনমিং রুটে সরাসরি ফ্লাইট একটি হওয়ায় ভাড়া কিছুটা বেশি। চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের সরাসরি ফ্লাইটের টিকেট আগেভাগে কাটলেও রাউন্ড ট্রিপের জন্য গুনতে হয় ৭০-৮০ হাজার টাকা। এবছর নাগাদ চট্টগ্রাম-কুনমিং রুটে নতুন ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার ফলে খরচ কিছুটা কমতে পারে।
খাবার, থাকা আর চিকিৎসা খরচ
রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের তুলনায় চীনের চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা কম। হৃদ্রোগ, চক্ষুরোগ, ক্যান্সারসহ জটিল রোগেও উন্নত সেবা পাওয়া যায়।
এক রোগীর স্বজন জানালেন, বাংলাদেশে সাধারণ সিট বা কেবিন ভাড়ার সঙ্গে তুলনা করলে এখানকার খরচ প্রায় একই রকম।

চীনে পড়াশোনা করতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন।
তাদের একজন সজিব বললেন, ভারতের তুলনায় চীনের চিকিৎসা অনেক গুণ ভালো। বাংলাদেশি রোগীদের থাকার জন্য এমন হোটেল রয়েছে, যেখানে বাঙালি খাবার সরবরাহ করা হয়। খাবার, থাকা ও অন্যান্য খরচ মিলে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ ইউয়ান (১০ হাজার টাকা) লাগে।
রোগীরা বলছেন, ঢাকায় থেকে কুনমিংয়ের ফ্লাইট সময় মাত্র আড়াই ঘণ্টা হওয়ায় বাংলাদেশি রোগীরা সহজেই চিকিৎসার জন্য যেতে পারেন। চিকিৎসা খরচ তুলনামূলক কম হলেও ভাষা, খাবার ও যোগাযোগ সমস্যা রয়েই গেছে। এসবের সমাধান জরুরি।

ইয়ুননান প্রদেশের হাসপাতালে রোবটিক সার্জারি ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আন্তরিক সেবাদানের মাধ্যমে বাংলাদেশি রোগীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে চীন সরকার।
কুনমিং মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতালের পিএইচডি শিক্ষার্থী আরিফিন ইসলাম জানান, সব হাসপাতালের খরচ প্রায় সমান, কোথাও সার্জারির জন্য বেশি বা কম নেওয়া হয় না। ইংরেজি না জানা রোগীদের জন্য দোভাষী রয়েছে, যারা বাংলা থেকে ইংরেজি বা চাইনিজে অনুবাদ করে চিকিৎসায় সহায়তা করে। এছাড়া চীন সরকার রোগীদের জন্য ‘হালাল ক্যান্টিন’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইয়ুননান স্বাস্থ্য কমিশনের উপপরিচালক ওয়াং জিয়ানকুন জানান, প্রদেশে ২৯ হাজার ৬৭৮টি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৩১৯টি হাসপাতাল, ১২২টি টারশিয়ারি স্তরের হাসপাতাল এবং ৪৭২টি সেকেন্ডারি লেভেলের হাসপাতাল। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মোট ৩ লাখ ৭০ হাজার শয্যা রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশিদের জন্য এমন হাসপাতাল ঠিক করা হয়েছে, যারা সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
কুনমিং আই হাসপাতালের সিইও ঝ্যাং মিন বলেন, “বাংলাদেশি রোগীরা এখানে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য চিকিৎসা পাবেন।
“আমরা প্রতিবছর ভারত ও রাশিয়ার মতো দেশ থেকে শত শত রোগী পাই; বাংলাদেশি রোগীদেরও স্বাগত জানাই।”
রোগী, হাসপাতাল ও মেডিকেল ট্যুরিজম অপারেটররা বলছেন, কুনমিংয়ে চিকিৎসা খরচ থাইল্যান্ডের তুলনায় কম, আর দিল্লির অত্যাধুনিক হাসপাতালের তুলনায় ১০ শতাংশের মতো বেশি।
ফুয়ায়ি হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট লু জিয়াং বলেন, চীনের চিকিৎসা সেবা থাইল্যান্ডের সমমানের হলেও খরচ থাইল্যান্ডের এক-চতুর্থাংশের মতো এবং মালয়েশিয়ার তুলনায়ও কম।
তবে উচ্চ বিমান ভাড়া আর বাংলাদেশি খাবারের মতো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দোভাষীর জন্য শুরুতেই ৫০০ ইউয়ান গুনতে হতে পারে, যা পরবর্তী দিনে সাধারণত ২০০–৩০০ ইউয়ানে নেমে আসে। তাছাড়া বাংলাদেশি স্বাদের খাবারের সুযোগ সীমিত।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য কমিশনের প্রাদেশিক উপপরিচালক ওয়াং জিয়ানকুন বলেন, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের হাসপাতালগুলোতে দোভাষীর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। খাবারের ক্ষেত্রে কুনমিং মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতাল এবং তংরেন হাসপাতালে মুসলিম রেস্তোরাঁ রয়েছে।
বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রোগের চিকিৎসা
চীনের বিভিন্ন হাসপাতালে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি কুনমিং তংরেন হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেন লিং জানান, সম্প্রতি এক বাংলাদেশি পরিবার তাদের কিশোর সন্তানের চিকিৎসা করিয়েছেন এ হাসপাতালে। সেই রোগীর পরিবারের একটি ভিডিও বার্তা দেখালেন তিনি।
ভিডিওতে রোগীর বাবা বলেন, ভারতের মতো কিছু দেশে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি, আর কিছু দেশে চিকিৎসা ব্যয় ছিল অত্যন্ত বেশি। পরে চীনে এসে সাশ্রয়ী খরচে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেয়েছেন।
শেন লিং জানান, চিকিৎসা শুরুর আগে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা পুরো প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেন। এরপর পরিবার সম্মতি দিলে চিকিৎসা শুরু করা হয়।
তিনি বলেন, “বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও মেডিকেল বিশেষজ্ঞ আছে এবং ভাষাগত বাধা দূর করতে দোভাষীর ব্যবস্থাও রয়েছে।”
বিল পরিশোধ ও ভাষা নিয়ে বিড়ম্বনা
বেসরকারি কুনমিং তংরেন হাসপাতালের শেন লিং জানান, আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য দক্ষ ও কঠোর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে নিরাপত্তা ও সেবার গুণমান নিশ্চিত করা হয়।

কুনমিং মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সুশৃঙ্খল সেবার জন্য সুপরিচিত। সরকারি হাসপাতালটি রোগীর সুস্থতায় পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা হয়।
আর কুনমিং আই হাসপাতালে রয়েছে লেজার সার্জারি, উন্নত ডায়াগনস্টিক ইমেজিং এবং সমন্বিত চক্ষু সেবা।
ঘুরতে এসে যারা চিকিৎসা নেন, তারা চীনা ভাষার চিকিৎসা প্রতিবেদন ও বিল নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন। তবে যারা মেডিকেল ভিসায় আসেন, তাদেরকে নির্দিষ্ট বুথ থেকে সেসবের ইংরেজি সংস্করণ সরবরাহ করা হয়। অনেক হাসপাতাল ক্রেডিট কার্ড নেয় না বলেও জানান পর্যটক ভিসায় আসা বাংলাদেশিরা।
তবে ফুয়ায়ি হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট লু জিয়াং বলেন, আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য আলাদা বুথ রয়েছে। সেখান থেকে ইংরেজি নথি সরবরাহ করা হয়।
ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট গুয়ো ওয়েইওয়েই বলেন, তারা ভিসা ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ করেন।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য কমিশনের প্রাদেশিক উপপরিচালক ওয়াং জিয়ানকুন বলেন, অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়া সহজ করতে তারা কিছু ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করছেন।
আরও ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ
প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার স্বল্প সময়ে যুক্তিসংগত খরচে বাংলাদেশিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য একাধিক বিকল্প গন্তব্য অনুসন্ধান শুরু করেছে। এর ধারাবাহিকতায় গত জানুয়ারিতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার চীন সফরের সময় বাংলাদেশিদের জন্য চিকিৎসাসেবা উন্মুক্ত করার প্রস্তাব চীন সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এরপর সেদেশের সরকার বাংলাদেশিদের জন্য নানা সুবিধা দেওয়া শুরু করেছে।
আজাদ মজুমদার বলেন, চট্টগ্রাম-কুনমিং সরাসরি ফ্লাইট চালুর পাশাপাশি ঢাকা-কুনমিং রুটে একাধিক ফ্লাইট চালুর প্রচেষ্টা চলছে।
“আমরা আশা করি, এ বছরের শেষ নাগাদ চট্টগ্রাম-কুনমিং ফ্লাইট চালু হবে, যা রোগী ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সহজ করবে।”