বৃষ্টি নেই, আমনের চারা নিয়ে দুশ্চিন্তায় জয়পুরহাটের কৃষকরা

“এবার প্রকৃতির আচরণ ভিন্ন, মাঠ জুড়ে খাঁ খাঁ অবস্থা”

জয়পুরহাট প্রতিনিধিমোমেন মুনিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 July 2022, 08:11 AM
Updated : 24 July 2022, 08:36 AM

বর্ষার মাঝামাঝিতেও বৃষ্টি নেই; জমি শুকিয়ে কাঠ। এ অবস্থায় আমনের চারা রোপন করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার চানপাড়া এলাকার কৃষক শাহাদত হোসেন।

“এ্যনা কষ্ট করে আবাদ করি, সারা বছর ছলপল লিয়া খাই। এ বারে যে দেওয়ার (বৃষ্টি) কি হলো, হচে না। আবাদ না হলে কি খামো।” কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে শাহাদতের।

একই অবস্থা জয়পুরহাটের অন্য কৃষকদেরও। প্রচণ্ড রোদে জমি শুকিয়ে যাওয়ায় আমন ধানের চারা আর পাট নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।

সদর উপজেলা, কালাই, আক্কেলপুর, পাঁচবিবি উপজেলার কৃষকরা জানান, আষাঢ়ের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আমনের চারা রোপনের সময়। কিন্তু বৃষ্টি না হওয়ায় জমি শুকিয়ে কাঠ অবস্থা। এ অবস্থায় আমনের চারা রোপন করতে না পেরে সেগুলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম। ‘বেশি দামে কেনা’ ডিজেলে শ্যালো মেশিন দিয়ে ‘কোনোমতে’ সেচ দিয়ে সেগুলো টিকিয়ে রাখছেন; আর অপেক্ষা করছেন বৃষ্টির জন্য।

তাছাড়া চারাগুলো বাঁচাতে তারা বীজতলা থেকে তুলে সেগুলো রোপনের মতো করে নির্দিষ্ট জমিতে রেখেছেন। এরপর সেখানে অল্প সেচ দিয়ে সতেজ রাখার চেষ্টা করছেন। বৃষ্টি হলে চারাগুলো তুলে জমিতে লাগাবেন। এতে কিছুটা হলেও সুফল পাবেন বলে মনে করেন কৃষকরা।

জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ পরিচালক শহিদুল ইসলাম জানান, দুই ধরনের আমনের মধ্যে রোপা আমনের বীজ সাধারণত আষাঢ় মাসে বপন করা হয়। এলাকাভেদে রোপা আমন ধান কার্তিক-অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কাটা হয়ে থাকে।

তবে আষাঢ়ের শুরুতেই বপন করা বীজ থেকে পরিপক্ক চারা হলেও শুকনো জমিতে পানি না পেয়ে তা রোপন করতে পারছে না কৃষকেরা। ডিজেল চালিত শ্যালো মেশিন দিয়ে সেচের বিকল্প রয়েছে। কিন্তু তাতে খরচ বেড়ে গেলে উৎপাদিত ধান থেকে খুব বেশি লাভ হবে না।

জেলার কালাই উপজেলার ধাপ-দামধর গ্রামের ফজলুর রহমান বলেন, মাসখানেক ধরে বৃষ্টি নেই। আগের বছরগুলোতে এই সময়ে চারদিকে থৈ-থৈ পানি ছিল। খাল-বিল ও নিচু নালায় পাট জাগ দেওয়ার সুযোগ ছিল। আমন ধানের চারা সময়মতো তারা জমিতে লাগাতে পেরেছিলেন।

“কিন্তু এ বারের প্রকৃতির আচরণ ভিন্ন, মাঠ জুড়ে খাঁ খাঁ অবস্থা।” বলেন, আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর গ্রামের আমন ধান চাষি আবু হাসান।

অন্যদিকে পাটের ভালো ফলন হলেও তীব্র তাপদাহ ও পানির অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। প্রখর রোদে জমিতেই শুকিয়ে যাচ্ছে পাটের আঁশ। শুকিয়ে থাকা জলাশয় সময়মতো বৃষ্টিতে ভরাট না হওয়ায় পাট জাগ দেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

সদর উপজেলার কোমর গ্রামের পাট চাষি সুজাউল বলেন, “পানির অভাবে পাট জাগ দিতে সমস্যা হওয়ায় মাঠ থেকে দূরে যেখানে পানি আছে সেখানে পাট নিয়ে জাগ দিতে হচ্ছে। এতে তাদের শ্রমিক ও পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ গুণতে হচ্ছে।”

পাঁচবিবির ফিচকাঘাট এলাকার পাট চাষি আহসান হাবিব বলেন, “অনেকেই বৃষ্টির আশায় পাট কেটে জমির পাশে, কেউবা রাস্তার পাশে, খাল-বিল বা ডোবার পাশে স্তুপ করে রেখে দিয়েছেন। রোদে পাটের আঁশ যাতে শুকিয়ে না যায় সেজন্য স্তুপ করে রাখা পাটের উপর খড় ও আর্বজনা দিয়ে ঢেকে রেখেছেন।

“জলাশয়গুলোর সামান্য পানিতে কাদা ও মাটি দিয়ে পাট ঢেকে রেখেছেন কেউ কেউ। তবে সেই সুযোগও কম।”

পাঁচবিবি উপজেলার কড়িয়া গ্রামের আবু কালাম ও ক্ষেতলাল উপজেলার বটতলী বাজারের মোকাররম হোসেন জানান, একবিঘা জমিতে পাট চাষে খরচ প্রায় ১৬ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় গড় ফলন ১০ মণ। আর প্রতি মণ পাটের বর্তমান বাজার দর আড়াই হাজার থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা।

এই অবস্থায় অনাবৃষ্টির ধকলে পাটের উৎপাদন কমে গেলে লাভের অঙ্কটা অনেক কমে যাবে বলে মনে করছেন তারা।

জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শহিদুল বলেন, “জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এছাড়া দেশী ও তোষা পাটের জন্য ৩ হাজার ১৫০ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৭৬ মেট্রিকটন।

“বর্তমানে পাট জমিতে ১০/১২ ফুট লম্বা হয়েছে। পাট কাটার পর চাষিদের কম ব্যয়ে ‘রিবন রেটিং’ (পুরো পাট গাছ না পঁচিয়ে কাঁচা গাছ থেকে ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে সেগুলো পঁচাতে হয়) পদ্ধতিতে পাট পঁচানোর পরামর্শ দিচ্ছি।”

তিনি বলেন, এ পদ্ধতিতে পাট পঁচালে পাটের আঁশের মানও ভালো হয়; পানিও কম লাগে। তাছাড়া জায়গা, সময় ও পরিবহন খরচও কম লাগে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক