মারামারি আর নয়, তোলা থাকবে টেঁটা

দুই পক্ষের হাজারো লোকজন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও মাইকে ঘোষণা দিয়ে টেঁটা যুদ্ধে জড়ান। এতে অর্ধশত লোকজন আহত হন।

নেত্রকোণা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 Feb 2024, 08:33 AM
Updated : 17 Feb 2024, 08:33 AM

জমি দখল, আধিপত্য বিস্তার ও তুচ্ছ ঘটনা নিয়েও তারা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তেন টেঁটা হাতে। দেশিয় এই অস্ত্রটি সাধারণত মাছ ধরতে ব্যবহার হলেও নেত্রকোণার বিভিন্ন গ্রামে মারামারিতে অনেকটা ‘ঐতিহ্যগতভাবেই’ ব্যবহার হয় টেঁটা।

তবে এবার নিজেদের মধ্যে রক্তারক্তি বন্ধে একাট্টা হয়েছেন নেত্রকোণার সাতটি গ্রামের বাসিন্দা; সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ‘টেঁটাযুদ্ধ’ আর নয়।

শুক্রবার মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ আলম মিয়ার মধ্যস্থতায় তার সম্মেলন কক্ষে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উপজেলার নায়েকপুর ইউনিয়নের সাতটি গ্রামের শতাধিক গণ্যমান্য। 

প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা আলোচনায় উভয় পক্ষ সংঘাত নিরসনে ঐক্যমতে পৌঁছান। পরে শপথ নিয়ে হাসিমুখে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ আলম। 

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানান, জমি দখল, আধিপত্য বিস্তার, মানসিক দ্বন্দ্ব, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নায়েকপুর ইউনিয়নে সাতটি গ্রামের মানুষ বছরখানেক আগে দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েন।

এক পক্ষে ইউনিয়নের নোয়াগাও, পাছআলমশ্রী, বাউশা, তালুককানাই এবং অপর পক্ষে ছিলেন আলমশ্রী, দেওয়ানপাড়া ও মাখনার এ তিন গ্রামের বাসিন্দা।

কিছুদিন পরপর দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিত। দফায় দফায় টেঁটাসহ বিভিন্ন দেশিয় অস্ত্র নিয়ে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বা ‘টেঁটা যুদ্ধ’ চলে। 

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসেও দুই পক্ষের হাজারো লোকজন মাইকে ঘোষণা দিয়ে টেঁটাযুদ্ধে জড়ান। এতে অর্ধশত লোকজন আহত হন। 

এসব নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে একাধিক মামলাও হয়। তবুও প্রায় প্রতি মাসেই তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে আসছিলেন, আহত হচ্ছিলেন। এতে করে ওই সাত গ্রামের সাধারণ মানুষরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিলেন। 

মদন থানার ওসি উজ্জ্বল কান্তি সরকার জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় তিন মাস আগে স্থানীয় পুলিশ রাতে সাতটি গ্রামে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ দেশিয় অস্ত্র জব্দ করে।

তাছাড়া উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দু’পক্ষের বিভেদ নিষ্পত্তি করা জন্য কয়েক দফা চেষ্টা চালান। কিন্তু কিছুতেই এই দ্বন্দ্বের অবসান হচ্ছিল না। 

অবশেষে শুক্রবার সাত গ্রামের দুই পক্ষের শতাধিক গণ্যমান্য ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনায় বসেন ইউএনও। সেই সভায় দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বন্দ্ব ভুলে মীমাংসায় উপনীত হন তারা। 

এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে জানিয়ে নোয়াগাও গ্রামের আমির উদ্দিন বলেন, “আমাদের এলাকায় মারামারি লেগেই আছিল। সব সময়েই উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় আছিলাম। ইউএনও স্যারের উদ্যোগে ঝগড়ার শেষ হইছে । আমরা খুশি। অহন এলাকায় শান্তি ফিরব।” 

আলমশ্রী গ্রামের শাহ আলম বলেন, “কদিন পরপরই মারামারিতে এলাকায় শান্তি আছিল না। কি যে সমস্যায় আছিলাম কইয়া বুঝানি যাইত না। আমরার বিরাট উপকার করছেন এ ইউএনও স্যার। তিনি যদি না শেষ করতেন, কে কখন মরত, আহত হইত ঠিক আছিল না।”

ওসি উজ্জ্বল কান্তি সরকার জানান, “নায়েকপুর ইউনিয়নের সাত গ্রামবাসীর সংঘর্ষ নিয়ে উপজেলা প্রশাসন, আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও এলাকার গণ্যমান্য লোকজন আলোচনা করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। দুই পক্ষের লোকজন আর সংঘর্ষে জড়াবেন না বলে কথা দিয়েছেন। এটি একটি ভালো উদ্যোগ।” 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সম্মেলন কক্ষের সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়াও মদন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান, পৌর মেয়র সাইফুল ইসলাম সাইফ, মদন থানার ওসি উজ্জ্বল কান্তি সরকার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আ. কদ্দুছ, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান তালুকদার শামীম, সহ-সভাপতি ইফতেকারুল আলম চৌধুরী আজাদ, ভাইস চেয়ারম্যান মুফতি আনোয়ার হোসেন ও এলাকার গণ্যমান্যসহ দুই পক্ষের শতাধিক লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

ইউএনও মো. শাহ আলম মিয়া বলেন, “সাত গ্রামের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ চলমান থাকায় সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার বিঘ্ন ঘটছিল। সেইসাথে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অসুবিধা হচ্ছিল। 

“এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, এলাকার গণ্যমান্য লোকজন নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সাত গ্রামবাসীর চলমান বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।” 

“দুই পক্ষের শতাধিক লোকজনের উপস্থিতিতে নেওয়া এ সিদ্ধান্তে পরবর্তী সময়ে আর সংঘাত হবে না বলে আমরা আশাবাদী,” বলেন ইউএনও।