রামুতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ১৪ বছর: পোড়া মন্দির গড়া গেছে, বিশ্বাস ফেরেনি
২০১২ সালের এ ঘটনার পর এখনও নিরাপত্তা নিয়ে ভয়, বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ এবং রাষ্ট্রের ওপর ‘হারানো আস্থার’ কথা বলছেন ঘটনার ভুক্তভোগীরা।
রাতের বেলায় মিছিলের শব্দ শুনলেই এখনও আঁতকে ওঠেন ৭০ বছরের মুকিম বালা। ১৪ বছর আগে এমনই এক রাতে নিজের চোখের সামনে পুড়তে দেখেছিলেন নিজের ঘর।
কোনো অপরাধ না করেও নিজের ভিটায় আগুন দেখার সেই রাত তার কাছে এখনও অতীত নয়। সেই রাতে মুকিম বালার সঙ্গে ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়েছিল তার পরিবার।
পাশের মুসলিম প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন তারা। আগুনে পুড়েছিল ঘর, মন্দির, মানুষের বহু বছরের সঞ্চয়।
কিন্তু রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের কথায়, সবচেয়ে বড় ক্ষতটি তৈরি হয়েছিল মানুষের মনে।
মুকিম বালার ছেলে আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট সুমথ বড়ুয়া বলছিলেন, “টাকা দিলে পোড়া মন্দির বা ভাঙা বুদ্ধমূর্তি হয়ত আবার তৈরি করা যায়, কিন্তু মানুষের মন থেকে যে বিশ্বাসটা উঠে গেছে, তা কীভাবে ফিরিয়ে আনবেন?”
২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের সেই রাতের পর ১৪ বছর পেরিয়েছে। পোড়া স্থাপনা পুনর্নির্মাণ হয়েছে, স্বাভাবিক হয়েছে জনজীবন।
কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে ভয়, বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ এবং রাষ্ট্রের ওপর ‘হারানো আস্থার’ কথা এখনও বলছেন ঘটনার ভুক্তভোগী মানুষগুলো।
‘এক কাপড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম’
সুমথ বড়ুয়া মনে করেন, রামুর ঘটনার পর ভয়টি শুধু সেই রাতেই আটকে থাকেনি।
“যেখানে রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারে নাই, সেখানে মানুষ কীভাবে সুরক্ষিত বোধ করবে,” বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, আগে পরিবারের একজন সদস্য অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য বিদেশে যেতেন এবং দেশে অর্থ পাঠাতেন। এখন নিরাপত্তার কারণে অনেক পরিবারই পুরো পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছে।
সেই রাতের স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে সুমথ বলছিলেন, “২৯ সেপ্টেম্বর রাতে হঠাৎ করেই স্লোগান ও মিছিলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিলে আমরা এক কাপড়ে ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে পাশের মুসলিম প্রতিবেশীদের বাড়িতে আশ্রয় নিই।”
সুমথ বড়ুয়া বলেন, “চোখের সামনে আমাদের ঘরবাড়ি এবং মন্দির ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বলতে দেখেছি, কিন্তু কাছে গিয়ে আগুন নেভানোর মত কোনো পরিস্থিতি বা নিরাপত্তা তখন ছিল না।”
সেই রাতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরেকটি নাম উত্তম বড়ুয়া। ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ২০১২ সালের ওই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল তার একটি ফেইসবুক পোস্টকে ঘিরে, এমন অভিযোগই তখন সামনে এসেছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উত্তম বড়ুয়া বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাস করছেন। তার বাবা ও মা এখনও রামুতেই থাকেন।
তার বাবা সদত্ত বড়ুয়া বলেন, ঘটনার দিন তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন। পরে রামুর পরিস্থিতি ও পরিবারের ওপর হামলার খবর পেয়ে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সেই ঘটনার পর থেকেই তাদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তারা এখনও ভয় নিয়ে দিন কাটান।
তবে অসুস্থ সদত্ত বড়ুয়া এসব নিয়ে বেশি কথা বলতে চাননি।
আগুনের পরও মানুষ মানুষকে আগলে রেখেছিল
সেই রাতের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য ও রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদের সংগঠক বিপুল বড়ুয়া।
তার ভাষ্য, কোরআন অবমাননার মিথ্যা অপবাদ ও গুজব ছড়িয়ে মানুষকে উত্তেজিত করা হয়েছিল। রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার দিকে বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল এসে জড়ো হয়। পরে কাঠের মন্দিরে আগুন দেওয়ার মধ্য দিয়ে হামলা ছড়িয়ে পড়ে।
বিপুলের দাবি, রামুর দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে ফাটল ধরানোই ছিল ওই হামলার উদ্দেশ্য।
“যদিও স্থানীয় মুসলিম সমাজের কিছু মানুষ তখন মন্দির ও বিহার রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন। হামলাকারীদের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু স্থাপনা রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন তারা।”
অর্থাৎ সেই রাতের গল্পটি শুধু সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নয়; একই সঙ্গে বিপদের সময়ে এক সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে আরেক সম্প্রদায়ের দাঁড়ানোর গল্পও। কিন্তু বিশ্বাসের ক্ষত পুরোপুরি সারেনি।
বিপুল বড়ুয়ার দেওয়া তথ্যে, রামুর ১৯টি বৌদ্ধ বিহারের মধ্যে অন্তত ১২টিতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। হামলা হয়েছিল সাধারণ মানুষের বসতবাড়িতেও।
‘মনের কোনো জাতপাত হয় না’
কক্সবাজারের বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুর কাছে রামুর ঘটনার সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি স্থাপনার নয়, মানুষের মনের।
তার ভাষায়, “মানুষের মনের কোনো জাতপাত হয় না। মনে যে ট্রমা জন্মে, তা আজীবন থেকে যায়।”
প্রজ্ঞানন্দ বলেন, ২০১২ সালে রামুর মানুষের মনে যে ভয় ও অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, তার দাগ এখনও রয়ে গেছে। এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাজারে হামলার মত ঘটনা ঘটলে সেখানেও মানুষের মনে একই ধরনের ট্রমা তৈরি হচ্ছে।
তার ভাষ্য, একটি ধর্মীয় স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হলেও মানুষের মনে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতা দূর করা অনেক কঠিন।
“একটি জনগোষ্ঠী যখন মনে করে এই দেশ তার, তখন হামলার মাধ্যমে হঠাৎ তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, সে এখানে নিরাপদ নয়।”
১৪ বছরেও শেষ হয়নি বিচার
রামুর ঘটনার ১৪ বছর পরও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। অপরাধীরাও এতে এমন ধারণা পেতে পারে যে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।
“ঘটনার ১২-১৪ বছর কেটে গেল, কিন্তু একটা ঘটনারও সুরাহা বা বিচার হলো না”, আক্ষেপ তার।
রামুর মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কক্সবাজারের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. ইউনূস বলেন, দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে বর্তমান সরকার আমলে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চারটি মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার বা বাতিল করা হয়েছে। আরও ১০টি মামলা বিচারাধীন এবং সেগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
ইউনূসের দাবি, তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাড়াহুড়া করে মামলা করা হয়েছিল এবং প্রকৃত হামলাকারীদের বদলে রাজনৈতিক কর্মীদের আসামি করা হয়েছিল।
অন্যদিকে সুমথ বড়ুয়া ও বিপুল বড়ুয়ার অভিযোগ, তদন্তে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের যথাযথভাবে সাক্ষী করা হয়নি। কারও কারও ভাষ্য, এমন ব্যক্তিদেরও সাক্ষী করা হয়েছিল যারা ঘটনার সময় রামুতে ছিলেন না।
কংক্রিট গড়া গেছে, বিশ্বাস নয়
সুমথ বড়ুয়া বলেন, হামলার নেপথ্যে যারা ছিল, ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে যারা মানুষকে উত্তেজিত করেছিল এবং ঘটনার সময় প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল, এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার ছিল।
তার প্রশ্ন, কোনো ব্যক্তির অপরাধ থাকলে তার বিচার হবে; কিন্তু তার দায়ে কেন সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও মন্দির পুড়বে?
স্বাধীন তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত ও বিচার হলে মানুষের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা ফিরতে পারত বলে মনে করেন তিনি।
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুও মনে করেন, শুধু কোনো ঘটনার পর কয়েকটি সম্প্রীতি সভা করলেই মানুষের ভেতরের ভয় দূর হয় না। গুজব মোকাবিলায় সারা বছর সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং এবং ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা দরকার।
