`ভীতি কাটিয়ে’ দুর্গাপূজায় উৎসবের আমেজে চাঁদপুর

কঠোর নিরাপত্তার অংশ হিসেবে প্রতি মণ্ডপে দুজন পুলিশ ও ছয়জন আনসার থাকবে।

আল ইমরান শোভনচাঁদপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Sept 2022, 12:19 PM
Updated : 30 Sept 2022, 12:19 PM

`ভয়-ভীতি’ নয়, এবার বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় দুর্গোৎসবে মাতবেন চাঁদপুরের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। জেলায় এবার ২১৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে।

এর মধ্যে হাজীগঞ্জ উপজেলায় গতবছরের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার স্মৃতি এড়িয়ে এবার নতুন আরও আরেকটি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।

হাজীগঞ্জ উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্যব্রত ভদ্র মিঠুন বলেন, গতবছর ২৮টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার আরও একটি মণ্ডপ যুক্ত হয়েছে।

মন্দিরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি মণ্ডপে দুই জন পুলিশ ও ছয় জন আনসার সদস্য নিযুক্ত থাকবেন বলে জানান তিনি।

গতবছর দুর্গোৎসব চলাকালে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি মন্দিরে ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা।

এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ শ্রীশ্রী রাজা লক্ষ্মী নারায়ণ জিউর আখড়ার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা মিঠুন ভদ্র বলেন, “গতবছর এই মন্দিরে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। এই হামলাকে আমরা ভয় নয়, ঘৃণার চোখে দেখি। এবার আমরা বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় পূজার প্রস্তুতি নিয়েছি।”

গতবছর হামলার শিকার শ্রী রামকৃষ্ণ সেবা আশ্রমের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অনিল চন্দ্র সাহা বলেন, “ওই সময় মণ্ডপে এমন হামলা হবে, তা আমরা কখনও কল্পনা করিনি। এবার আমরা স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী বাহিনীর ব্যাপক সহযোগিতা পেয়েছি। আশা করি, উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা অনুষ্ঠিত হবে।”

মন্দিরে আসা লিটন পাল ও গোপাল সাহা বলেন, এবার দুর্গোৎসবকে ঘিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। তারা চান, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপিত হোক।

সীমা মিশ্র ও আরতি রানী নামের দুই নারী বলেন, গতবছরের ঘটনাটি নিন্দনীয়। দুর্বৃত্তরা এভাবে পূজা চলাকালীন হামলা করবে, তা তারা ভাবতে পারেননি। এবার সুন্দর পরিবেশে পূজা হবে বলে আশা করছেন তারা।

হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, মন্দিরে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, এজন্য উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

“এরই মধ্যে আমরা হাজীগঞ্জ পশ্চিম বাজারে ‘সম্প্রীতি সমাবেশ’ করেছি।”

হাজীগঞ্জে পূজা মণ্ডপে হামলার ঘটনায় ১০টি মামলা হয়েছে। আসামিদের অধিকাংশই জামিনে রয়েছেন।

এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রনজিত রায় চৌধুরী জানান, হাজীগঞ্জে ১০টি মামলায় ১১৮ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন জেল খাটার পর উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালত থেকে ১১৫ জন জামিনে বের হয়েছেন। এখনও তিন আসামি কারাগারে আছেন।

এসব মামলায় সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা ছয়টি মামলার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন আদালতে। এখনও চারটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত রায় বলেন, “এসব মামলার মধ্যে পুলিশ দুটি, ডিবি দুটি, সিআইডি একটি ও পিবিআই একটি মামলার অভিযোগপত্র এরই মধ্যে জমা দিয়েছে।

“তদন্তাধীন চারটির মধ্যে সিআইডি পুলিশের কাছে দুটি ও পিবিআইয়ের কাছে দুটি। শিগগির এগুলোর অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে।”

পুলিশের ভাষ্য, গত বছরের ১৩ অক্টোবর প্রথম প্রহরে ইকবাল নামের এক যুবক কুমিল্লার নানুয়ার দিঘীর পাড়ের পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রেখে আসেন।

সকালে ওই ঘটনাটি প্রকাশ পেলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে উত্তেজনা ছড়ায়, হামলা হয় ওই পূজামণ্ডপে, সেদিনই কুমিল্লা শহরের আটটি মন্দিরে হামলা হয়।

ওইদিন সন্ধ্যায় একে কেন্দ্র করে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বাজারে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। এ সময় হাজীগঞ্জ পৌর এলাকাসহ উপজেলার আশেপাশে প্রায় একই সময়ে কয়েকটি মন্দির ও মণ্ডপে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

হাজীগঞ্জ বাজারে পুলিশের সঙ্গে মিছিলকারীদের সংঘর্ষ বাঁধলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি চালায় পুলিশ। এ সময় ঘটনাস্থলে তিন জন, পরে হাসপাতালে দুই জনের মৃত্যু হয়।

চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ বলেন, এবার চাঁদপুর জেলায় ২১৯টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে। এর মধ্যে চাঁদপুর সদরে ৩৬টি, হাজীগঞ্জে ২৯টি, কচুয়ায় ৪১টি, হাইমচরে ছয়টি, শাহরাস্তি ১৮টি, ফরিদগঞ্জে ২০টি, মতলব দক্ষিণে ৩৮টি ও মতলব উত্তরে ৩৮টি পূজা মণ্ডপ আছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক