মেঘনার ভাঙন: আতঙ্ক সঙ্গী করেই চলছেন চাঁদপুরের নীলকমলের বাসিন্দারা
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, মোট ৩ হাজার ২৫০ মিটার নদী তীর স্থায়ীভাবে রক্ষায় ২৩৭ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।
১৫ বছর আগে যখন চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার নীলকমলে বিয়ে হয় রাহিমা বেগমের, তখন মেঘনা নদী ছিল অনেক দূরে। স্বামীর বাড়ির চারপাশে ছিল বাড়ি, গাছপালা, দোকানপাট ও মানুষের কোলাহল।
নদীকে তখন দূরের কোনো জলরাশি হিসেবেই দেখতেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই নদী এগিয়ে এসেছে, এখন বাড়ির কাছেই মেঘনা। নদীর দিকে তাকালেই চোখে জাগে ভাঙনের আতঙ্ক।
রাহিমা বেগম বলেন, “মেঘনা এখন অনেক কাছে। সবসময় ভাঙন আতঙ্কে থাকতে হয়। কেউ মারা গেলে তাঁর কবর কোথায় হবে, সেটাও চিন্তার বিষয়। অনেক কবরও এর মধ্যে মেঘনার পেটে বিলীন হয়ে গেছে।”
রাহিমার মতো এমন উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে নীলকমল ইউনিয়নের ঈশানবালা এলাকার মানুষের। মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে বহু পরিবারকে একাধিকবার বসতভিটা বদলাতে হয়েছে। কারও কারও দোকান নদীতে বিলীন হয়েছে কয়েকবার।
এখন স্থানীয় সবচেয়ে বড় ভয়— ভাঙন যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে শুধু ঘরবাড়ি নয়, একসময় নীলকমল ইউনিয়নই হয়তো মেঘনার গর্ভে চলে যাবে।
ঈশানবালা এলাকার বাসিন্দা মো. টুটুল শিকদার দীর্ঘদিন ধরে দেখছেন মেঘনার ভাঙন। তাঁর চোখের সামনে বদলে গেছে এলাকার চিত্র। নদী ধীরে ধীরে তীরের দিকে এগিয়ে এসেছে। হারিয়েছে মানুষের বসতভিটা ও জায়গাজমি।
টুটুল শিকদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের কারণে নীলকমল এখন বিলীনের পথে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে এলাকাসহ পুরো ইউনিয়ন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
তার কথায়, নদী ভাঙনের সঙ্গে এখানকার মানুষের জীবন যেন এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে। কখন কোন বাড়ি বা দোকান নদীর পেটে চলে যায়, সেই ভয় নিয়েই থাকতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মেঘনার ভাঙন এখানে নতুন কোনো ঘটনা নয়। বর্ষা কিংবা নদীর পানি বাড়ার সময় ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। নদীর স্রোত যখন তীরের মাটি কেটে নেয়, তখন মুহূর্তের মধ্যে বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
সাত–আটবার নদীতে গেছে দোকান-বাড়ি
নীলকমলের মানুষ নদীর সঙ্গে লড়াই করছেন দীর্ঘদিন ধরে। কেউ ঘর হারিয়েছেন, কেউ দোকান হারিয়েছেন, কেউ জমি হারিয়েছেন। আবার কারও স্বজনের কবরও হারিয়েছে নদীর গর্ভে।
মেঘনার ভাঙনের গল্প যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ঈশানবালার ব্যবসায়ী সালাউদ্দিনের জীবনের সঙ্গে। একাধিকবার নতুন জায়গায় দোকান তুলেছেন, আবার সেই দোকানও নদীর ভাঙনে হারিয়েছেন।
সালাউদ্দিন বলেন, ভাঙনের কারণে অন্তত সাত থেকে আটবার তার দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শুধু দোকান নয়, তার পরিবারকেও বারবার বসতভিটা হারাতে হয়েছে।
তিনি বলেন, তার পরিবার অন্তত ১০ বার নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়েছে।
একটি পরিবারের জন্য একবার বসতভিটা হারানোই যেখানে বড় বিপর্যয়, সেখানে একই পরিবারের বারবার আয়ের সংস্থান ও ঘর হারানোর অভিজ্ঞতা কেমন— সালাউদ্দিনের কথায় তারই প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।
ভাঙনে শুধু বাড়িঘর বা দোকান হারায় না। হারিয়ে যায় মানুষের পরিচিত পরিবেশ। যে উঠানে সন্তান বড় হয়েছে, যে জায়গায় গাছ লাগানো হয়েছে, যে দোকানে বছরের পর বছর ব্যবসা হয়েছে—সবকিছুই একসময় নদীর স্রোতের অংশ হয়ে যায়।
তেমনি ঈশানবালার মানুষের ভাঙন আতঙ্কের সবচেয়ে কষ্টের জায়গাগুলোর একটি হলো কবরস্থান।
জীবিত মানুষের ঘর সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও স্বজনের কবর সরিয়ে নেওয়া সহজ নয়। নদী যখন কবরস্থানের দিকে এগিয়ে আসে, তখন প্রিয়জনের শেষ ঠিকানাটুকুও হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
রাহিমা বেগমের কথায়, এই ভয় প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ভাঙন তাই শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়; মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও পারিবারিক ইতিহাসের ওপরও আঘাত করছে। তারপরও নদীপারের মানুষ নতুন করে ঘর তোলেন, দোকান বসান, সংসার গড়েন। কিন্তু নদী যখন আবার এগিয়ে আসে, তখন সেই স্বপ্নও ভেঙে যায়।
বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা
স্থানীয় মানুষের উদ্বেগের মধ্যে ঈশানবালা এলাকায় নদীতীর রক্ষায় জরুরি কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোছান্না গালিব জানান, ঈশানবালা এলাকায় দুটি প্যাকেজে মোট ১৩ হাজার বালুভর্তি বস্তা ফেলা হবে। বর্তমানে প্রায় ৯০ মিটার এলাকায় কাজ চলমান রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই জরুরি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে তাঁদের মূল দাবি, জরুরি কাজের পাশাপাশি দ্রুত স্থায়ী নদীতীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণ করতে হবে।
স্থানীয় জানান, নদীর তীরে বস্তা ফেলার কাজ শুরু হলে কিছুটা স্বস্তি আসে। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয় না।
তারা বলেন, জরুরি ভিত্তিতে বস্তা ফেলার প্রয়োজন আছে, কিন্তু এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে ভাঙনের মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
ঈশানবালা এলাকার বাসিন্দা মো. ইয়াসিন হাওলাদার বলেন, “যখনই ভাঙন দেখা দেয়, তখন তড়িঘড়ি করে কিছু বালুভর্তি বস্তা ফেলা হয়। এসব বস্তা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। একমাত্র স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া গেলে নীলকমল ইউনিয়নের অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব।”
নীলকমল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মনির শিকদারও বলছেন, মেঘনার ভাঙনে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ বসতভিটা হারিয়েছেন। বর্তমানে এলাকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে বালুভর্তি বস্তা ফেলা হচ্ছে। তবে এসব বস্তা কত সময় নদীর স্রোত মোকাবিলা করতে পারবে, তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে সংশয় রয়েছে।
তাই অস্থায়ী নয়, বরং মেঘনার ভাঙন রোধে এলাকাবাসী স্থায়ী ব্যবস্থা চায় বলে জানান এ জনপ্রতিনিধি।
২৩৭ কোটি টাকার স্থায়ী প্রকল্পের প্রস্তাব
ঈশানবালার মানুষের জন্য আশার খবর হলো, স্থায়ী নদীতীর রক্ষার একটি প্রস্তাব পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে পাঠানো হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মোছান্না গালিব বলেন, নীলকমল ইউনিয়নের ঈশানবালা এলাকায় ২ হাজার ১০০ মিটার নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং চাঁদপুর সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের আলুর বাজার ফেরিঘাট এলাকায় ১ হাজার ১৫০ মিটার নদীতীর স্থায়ীভাবে রক্ষার লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।
অর্থাৎ দুই এলাকায় মোট ৩ হাজার ২৫০ মিটার নদীতীর স্থায়ীভাবে রক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত প্রকল্পে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্লক নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ডিপিপি মূল্য ২৩৭ কোটি টাকা।
তবে প্রকল্পটি এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে কবে নাগাদ স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এই সময়ের মধ্যে ভাঙন অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় মানুষ।
