দুয়ারে দুর্গা, মুখ ভার শিল্পীদের

নেত্রকোণা জেলায় এবার পূজা বেড়েছে।

লাভলু পাল চৌধুরীনেত্রকোণা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 Sept 2022, 10:00 AM
Updated : 17 Sept 2022, 10:00 AM

শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে নেত্রকোণা জেলায় এখন মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে দিনরাত কাজ। পূজোও এবার বেশি; তবু মুখ ভার প্রতিমা শিল্পীদের। কারণ, এক দশকের মধ্যে প্রতিমা তৈরির উপকরণের দাম পৌঁছেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। শিল্পীদের আক্ষেপ, পরিশ্রম করে প্রতিমা গড়িয়েও লাভের মুখ দেখতে পারছেন না।     

বংশ-পরম্পরায় প্রতিমা গড়ার কাজ করেন অধিকাংশ শিল্পীই। তাই লাভের চেয়ে বছরের এই সময়টা ‘দেবীর সঙ্গে থাকেন’, ‘দেবীকে মর্তে ফুটিয়ে তোলেন’- এই আনন্দও থাকে শিল্পীদের। তার তৈরি ‘দেবীমুখ’ লাখ লাখ মানুষ দর্শন করবে এটা ভেবেও শান্তি পান শিল্পীরা।

জেলা শহরে পূজার বাদ্যি না বাজলেও শারদ উৎসবের আমেজ এসে গেছে। মণ্ডপের সাজসজ্জা, কেনাকাটায় ব্যস্ততা বেড়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের। শহর ও আশপাশের কয়েকটি মন্দির ঘুরে দেখা গেছে, কারিগরদের দম ফেলার ফুরসত নেই। অনেক মণ্ডপেই প্রতিমায় রং লাগতে শুরু করেছে।

ভীড় জমেছে, প্রতিমা তৈরির উপকরণ বিক্রেতাদের দোকানেও। তারা জানান, এখন পর্যন্ত পূজোর আমেজ ভাল। তবে উপকরণের দাম চড়া। গত ১০ বছরেও একসঙ্গে এতো দাম বাড়েনি।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ নেত্রকোণা জেলার সাধারণ সম্পাদক লিটন পণ্ডিত বলেন, “পারিবারিক ও সার্বজনীন মিলিয়ে গত বছর নেত্রকোণায় পূজা হয়েছে ৫২০টি। এবার ১১টি বেড়ে হয়েছে ৫৩১টি। জেলায় অর্ধশতাধিক প্রতিমা শিল্পী আছেন। তারাই সহশিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে অধিকাংশ প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। তবে জেলার বাইরেও থেকেও অনেকে এসে কাজ করছেন।”

মোহনগঞ্জ উপজেলার কলুংকা গ্রামের শিল্পী সুভাষ পাল। তিনি এক দশক ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। ছোট ভাই পলাশ পালও তার সঙ্গে কাজ করেন। এবার তিনি নেত্রকোণা পৌর শহরের নরসিংহ জিউড় আখড়ায় প্রতিমা গড়ছেন। প্রায় একমাস ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন।

এই প্রতিমা শিল্পী বলেন, “এইবার নয়টি পূজা মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ নিছি। ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় প্রতিমা করতাছি। গড়ে প্রায় চার লাখ টাকার কাজ। তবে লাভ বেশি পাইতাম না। গত বছর যে লাভ পাইছি এইবার অনেক কম অইবো।”

“দেহেন খের, বাঁশ, মাটি, সুতলি, তার, লোহার দাম বাড়ছে। কোনডার দাম বাড়ছে না। রংয়ের দাম বাড়ছে। শ্রমিকের দাম বাড়ছে। একেকজন শ্রমিকের রোজ ৮০০ থেকে এক হাজার ট্যাহা দেওন লাগে। প্রতিমার সাজসজ্জার যা যা লাগে সবতার দাম বাড়ছে। পূজার আয়োজকদের কাছ থেইক্যা তো আর এইবায় বাড়ায় দাম নেওন যায় নাই।”

আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী গ্রামের সন্তোষ পাল এবার চারটি প্রতিমা গড়ার কাজ নিয়েছেন। এর মধ্যে একটি গড়ছেন শহরের বড়বাজার এলাকার সর্ববণিকের বাসায় পারিবারিক পূজামণ্ডপে। প্রায় শতবর্ষ ধরে এখানে পূজা হয়ে আসছে। অষ্টমী তিথিতে কুমারী পূজাও হয় এই মণ্ডপে।

শুক্রবার সন্তোষ পাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিমা তৈরিতে এখন আর দম ফালানির সময় নাই। রাইত-দিন কাম করতাছি। ৩০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৭০ হাজার টাকায় প্রতিমা করছি।”

তিনি আরও বলেন, “প্রতিমা বানানির জিনিপত্রের দাম খুব বাড়ছে; এক-দেড় গুণ বাইড়া গেছে। এইবায় বাড়তে কোনোদিনও দেহি নাই। আমি ২০ বছর ধইর‌্যা প্রতিমা বানাইতাছি। আয়োজকেরা তো অতো ট্যাহা দেয় না। কী করবাম, বইয়া থাকবাম। পাইরা না পাইরা কাম নিছি। বাপ-দাদার পেশা।”

“তাছাড়া মনের আনন্দও আছে। অতো মানুষে আমার হাতের মা দুর্গার মুখ দর্শন করবো। এইডাও একটা আনন্দ। এইসব কারণেই এই পেশাডা ছাড়তাম পারি না। লাভের বিষয় আর নাই।”

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি গ্রামের ভজন পালও বললেন, “থাকা-খাওয়া, জিনিসপত্রের দাম এইতা খরচ বাদ এইবার প্রতিমা বানাইয়া পোষায় না। বাপ-দাদার পেশা; করতাছি আরকি।”

শিল্পী ও আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরে লাখ টাকায়ও প্রতিমা গড়া হয়। সুন্দর আর নান্দনিক প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে পূজায় পূজায় এক ধরনের ‘নীরব প্রতিযোগিতায়ও’ থাকে। শুধু প্রতিমা গড়াই শেষ কথা নয়। প্রতিমা প্রদর্শনের মঞ্চ তৈরি ও আলোকসজ্জায়ও খরচ করতে কার্পণ্য করেন না আয়োজকরা।   

শহরের কয়েকটি মণ্ডপে বড়দের পাশাপাশি ছোটদেরও প্রতিমা তৈরির কাজ করতে দেখা গেছে। মোহনগঞ্জের বড়পাইকুড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিপ্লব চন্দ্র পাল তার ভগ্নিপতির সঙ্গে কাজ করছেন প্রায় একমাস ধরে।

বিপ্লব বলে, “আমরা গরিব মানুষ। সংসার চলে না। বোনের জামাইয়ের সঙ্গেই কাজ করি। কাজ করলে রোজ ৮০০ টাকা পাই। টাকা সংসারের কাজেও লাগাইতাছি। আর লেখাপড়ার খরচের টাকাও রাখতাছি।”

নেত্রকোণা শহরের বড়বাজার এলাকার প্রতিমা তৈরির সাজসজ্জার উপকরণ বিক্রি করেন রাজীব বণিক। এটি তাদের পারিবারিক ব্যবসা। প্রতিমা তৈরির ও পূজার প্রায় সব জিনিসই মেলে এই দোকানে।    

তিনি বলেন, “গত বছরের চেয়ে এইবার উপকরণের দাম অনেকটা বাড়ছে। গত বছর মায়ের যে অস্ত্র ১৫০ টাকায় কিনছি এইবার তা ২৫০ টাকা। যে পাখা ৩০ টাকা কিনছি এখন তা ৪৫ টাকা। এইবায় সবই বাড়ছে।”

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নেত্রকোণা জেলার সভাপতি জ্ঞানেশ চন্দ্র সরকার বলেন, “পূজার আয়োজন এখন পর্যন্ত ভাল। উৎসব যেন নির্বিঘ্ন ও আনন্দঘন পরিবেশে হয়; তার জন্যে সব পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করছি।”

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট সীতাংশু বিকাশ আচার্য বলেন, “পূজার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সবার সহযোগিতা কামনা করছি।”   

নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনে নিরাপত্তাসহ নানা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে জেলা পুলিশ সুপার ফয়েজ আহমেদ বলেন, “সম্প্রীতির জেলা নেত্রকোণায় আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত করতে সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরই মাঝে জেলার সব পূজা মণ্ডপের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।

“তাদেরকে সিসি ক্যামেরা লাগানোসহ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এখন থেকেই সব মণ্ডপ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সাদা পোশাকে টহল দল কাজ করছে। পূজার দিনগুলোতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক