০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

‘এখন আর দশটা মানুষের মত বাঁচতে চাই’

মঙ্গলবার সকাল থেকে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও বিকালে অস্থিরতা তৈরি হয়।

সৌরভ হোসেন সিয়াম

Published : 03 Nov 2026, 10:24 PM

Updated : 03 Nov 2026, 10:23 PM

“আমরা ৩০ হাজার টাকাই চাই। সরকারি লোকজনের বেতন লাখ লাখ টাকা বাড়ে। আমাদের বেতন এতটুকু বাড়ালেই সমস্যা হবে কেন? আমাদের বাঁচার মতো মজুরি দিলে হবে না। বাঁচার মতো অনেক বাঁচছি। এখন আর দশটা মানুষের মতো বাঁচতে চাই।”

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আবির ফ্যাশনের শ্রমিক তাছলিমা এভাবেই তার মজুরির দাবিতে কথা বলছিলেন। তিনি মঙ্গলবার দুপুরে খাবারের বিরতির পর অন্যান্য শ্রমিকদের সঙ্গে বেরিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন।

বিকাল ৪টার দিকে শিবু মার্কেট এলাকায় দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন, “সবাই আন্দোলনে নামছে ন্যায্য দাবিতে। আমরা দাবি পুরা মানা ছাড়া সরবো না। আর ১০ জনের যেই গতি, আমারও সেই গতি হইবো।”

তখন সেখানে আরও অনেক শ্রমিক ছিলেন। তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কটিতে অবরোধ তৈরি করায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও শ্রমিকরা জানান, ৩০ হাজার ন্যূনতম মজুরিসহ অন্যান্য দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা প্রথম দুদিন সড়কে নামেনি। সোমবার তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধ করেন। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে বিকাল ৫টার দিকে তারা অবরোধ তুলে নেন।

মঙ্গলবার সকাল থেকে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও বিকালে অস্থিরতা তৈরি হয়।

দুপুরের খাবারের বিরতি দেওয়া হলে পৌনে ৩টার দিকে ফতুল্লার কয়েকটি কারখানার শ্রমিক ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কটিতে অবরোধ শুরু করেন। তাদের পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা সেই ব্যারিকেড উপেক্ষা করে সড়কে জড়ো হন।

সড়কের কয়েকটি জায়গায় তারা বাঁশ ও কাপড়ে আগুন ধরিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। কয়েকটি স্থানে পুলিশের চেকপোস্টের ব্যারিকেডও ফেলে রাখা হয়। সোয়া ৪টার দিকে এ সড়কের জালকুড়ি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান শ্রমিকরা।

সংঘর্ষের সময় পুলিশের দিকে আন্দোলনকারীরা ইট-পাটকেল ছুড়লে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদুনে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ার কথা জানান শিল্প পুলিশের নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। তিনি তাদের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন বলেও জানান।

এ সময় ৪-৫ জনকে আটক করার কথা জানিয়ে শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার বলেন, “দুপুর পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। কারখানার শ্রমিকরাও সহিংস আন্দোলনে নামবেন না বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দুপুরের পর কিছু উসকানিদাতা শ্রমিকদের রাস্তায় নামায়। তারা ১০ হাজার শ্রমিককে রাস্তায় জড়ো করে। যারা ইন্ধনদাতা তাদের কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে, পুলিশের লাঠিপেটায় কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন শ্রমিকরা।

বিকাল ৪টার দিকে শিবু মার্কেট এলাকায় কথা হয় আন্দোলনরত ফতুল্লার মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং মিলস লিমিটেড কারখানার শ্রমিক রেজাউল করিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগের দিনের আন্দোলনেও তিনি ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে কারখানায় কাজে ঢুকলেও দুপুরের খাবারের বিরতি দেওয়ার পর তারা পাশের আরেকটি কারখানার শ্রমিকদের আহ্বানে আন্দোলনে জড়ো হন। এতে মালিকপক্ষ কোনো বাধা দেননি বলেও জানান এ শ্রমিক।

এক প্রশ্নের জবাবে রেজাউল করিম বলেন, “মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে, আলোচনা চলছে শুনছি। কিন্তু এ আলোচনায় তো আমাদের লাভ হইবো না। সরকার ১৫-১৬ হাজার টাকা বেতন করবো সর্বোচ্চ। কিন্তু বাজারের যে অবস্থা তাতে এ বেতনেও কিছু হইবো না। আমরা ৩০ হাজার টাকাই বেতন চাই। নাহলে সবকিছু মানে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম কমিয়ে দিক।”

রেজাউলের এ বক্তব্যের সঙ্গে তখন আন্দোলনে থাকা অন্যান্য শ্রমিকরাও একমত পোষণ করেন। একইসঙ্গে আন্দোলনে থাকা শ্রমিকদের উপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিপেটাও প্রতিবাদ জানিয়ে তারা সড়কে নেমেছেন বলে জানান।

ওসমান গ্রুপের নিটিং কারখানার শ্রমিক আলেয়া বলেন, “প্রত্যেক মাসে বেতন যা পাই তাতে বাসভাড়া দিয়ে আর ঠিতমত বাজার করতেও পারি না। প্রতিমাসে ধার-দেনা কইরা চলতে হয়। মালিক-পুলিশ সবাই কয়, আমাগো দিয়াই নাকি দেশ চলে, কিন্তু আমি কই? আমাগোরে মাইরা দেশ চলে।

“আজকেও গার্মেন্টস থেকে বের হইতে দিতে চায় নাই। জোর কইরা সবাই বের হইছি। ৩০ হাজার টাকা বেতন আমাগো দিতে হইবোই।”

একই কারখানার নিটিং ম্যানেজার শামীম হোসেনও শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে একমত পোষণ করে সড়কে ছিলেন।

তিনি বলেন, “বেতন বাড়ানো উচিত। শ্রমিকদের আমরাও কেউ বাধা দিচ্ছি না তাই। আর পাশের কারখানা থেকে বের হলে আমরা আর ধরে রাখতে পারি না।”