ঘুষের অভিযোগ করায় কাশিয়ানীতে কৃষককে ব্যাংকে আটকে ‘মারধর’

‘উৎকোচ’ না দেওয়ায় ঋণ দেওয়া হয়নি বলে দেনায়েত সরদার বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ সেলে ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ করেছিলেন।

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 Feb 2024, 12:39 PM
Updated : 4 Feb 2024, 12:39 PM

গোপালগঞ্জে ঘুষ ও হয়রানীর অভিযোগ করায় কৃষককে ডেকে নিয়ে ব্যাংকে আটকে বহিরাগতদের দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।

সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কৃষি ব্যাংকের কাশিয়ান উপজেলার রামদিয়া শাখায় এ ঘটনা ঘটে। মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

ভুক্তভোগী ষাটোর্ধ্ব কৃষক দেনায়ের সরদার কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা গ্রামের বাসিন্দা। মারধরের শিকার হয়েছেন তার সঙ্গে থাকা ছেলে তাকবীর সরদার (২৭) ও জামাতা মোতাকাব্বির মুন্সীও (২৫)।

গত ৭ সেপ্টেম্বর দেনায়েত সরদার ‘উৎকোচ’ না দেওয়ায় তাকে ঋণ দেওয়া হয়নি বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ সেলে ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ করেছিলেন।

অভিযোগ তদন্তে সোমবার গোপালগঞ্জ আঞ্চলিক শাখা ব্যবস্থাপক আব্দুল আজিজ ও তার সহযোগী রামদিয়া কৃষি ব্যাংকে যান। সেই তদন্ত চলাকালেই এই মারধরের ঘটনা ঘটে।

কৃষক দেনায়েত সরদার জানান, এক মাস আগে গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের জন্য তিন লাখ টাকা ঋণ নিতে রামদিয়া কৃষি ব্যাংকে যান তিনি। পরে ২০ অগাস্ট ব্যাংকের ইনভেস্টিগেশন অফিসার (আইও) রাফিজুল ইসলাম ওই কৃষকের বাড়িতে সরেজমিনে তদন্তে যান।

দেনায়েত অভিযোগ করেন, ইনভেস্টিগেশন অফিসার ‘মিষ্টি খাওয়ার ’ কথা বলে কিছু ‘উৎকোচ’ দাবি করেন। কিন্তু তিনি তা দিতে রাজি না হওয়ায় ‘দায়দেনার’ কারণ দেখিয়ে ঋণের আবেদন বাতিল করে দেন ওই কর্মকর্তা।

মারধরের শিকার এই কৃষক আরও বলেন, এই বিষয়ে তদন্তের জন্য সোমবার তাদের ব্যাংকে ডেকে নেওয়া হয়। তদন্ত চলাকালে ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ইলিয়াস হোসেনের ‘সাজিয়ে রাখা’ স্থানীয় লোকজন অতর্কিতভাবে ব্যাংকে ঢুকে তার এবং সাথে থাকা ছেলে ও জামাতার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে।

এক পর্যায়ে তারা ‘ব্যাংকের গেট-দরজা লাগিয়ে এবং সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে’ তদন্ত কর্মকর্তার সামনেই তিন জনকে উপর্যপুরি ‘কিলঘুষি, লাথি দেয় ও ফ্লোরে ফেলে পা দিয়ে পিষতে’ থাকে।

পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দেয় এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের কাছ থেকে জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে দিয়েছে বলে জানান বৃদ্ধ এই কৃষক।

এ বিষয়ে কাশিয়ানী থানার রামদিয়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “গোপালগঞ্জ থেকে আসা কৃষি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যাংকে অভিযোগকারীর বক্তব্য শুনছিলেন। এ সময় অভিযোগকারীর জামাতা উত্তেজিত হলে ব্যাংকের গ্রাহকরা প্রতিবাদ করেন এবং তারা বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে।

“খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মো. ইলিয়াস হোসেন ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ঋণ চেয়ে না পেয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ওই কৃষক। অভিযোগের তদন্ত কমিটি ব্যাংকে আসলে বাদীপক্ষের লোকেরা অশোভন আচরণ করেন। পরে গ্রাহকরা এর প্রতিবাদ করে।

“পরিস্থিতি খারাপ দেখে ব্যাংকের গেট-দরজা লাগিয়ে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে তাদেরকে উদ্ধার করে।”

গোপালগঞ্জ কৃষি ব্যাংকের আঞ্চলিক শাখা ব্যবস্থাপক ও অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল আজিজ মারধরের কথা স্বীকার করে বলেন, “কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, ব্যাংকের মধ্যে এত লোকজন ঢুকে পড়বে। এ ধরণের ঘটনা ঘটাবে। আমি বিষয়টি কল্পনাও করিনি। যা সম্পূর্ণ অনাকাঙ্খিত। ঘটনাটি আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ এসেছিল।”

এদিকে, কৃষককে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। ফেইসবুকে শত শত মানুষ এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শাখা ব্যবস্থাপকসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন।

[প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে: ফেইসবুক লিংক]