কুষ্টিয়ার জিকে পাম্প হাউজ বন্ধ, হুমকিতে বোরো আবাদ

সেচ সরবরাহ বন্ধ থাকায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি জেলার ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ ব্যাহত হচ্ছে বলে কৃষকরা অভিযোগ করেছেন।

হাসান আলীকুষ্টিয়া প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 April 2024, 03:43 AM
Updated : 2 April 2024, 03:43 AM

দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প কুষ্টিয়ার গঙ্গা-কপোতাক্ষ পাম্প হাউজের সবকটি অকেজো অবস্থায় রয়েছে। সেচ সরবরাহ বন্ধ থাকায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি জেলার কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। হুমকির মুখে পড়েছে বোরো আবাদ।

গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পে তিনটি পাম্পের সাহায্যে পানি দেওয়া হত। দীর্ঘদিন ধরে দুটি পাম্প বন্ধ রয়েছে; সবশেষ ১৯ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হয় তৃতীয় পাম্পটিও। দ্রুত এসব পাম্প মেরামত করে সেচ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন চাষিরা।

তারা জানান, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরার ১৩টি উপজেলার কৃষকরা এ সেচ প্রকল্পের আওতায় চাষাবাদ করে থাকেন। চলতি মৌসুমে এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে সেচ বন্ধ থাকায় লক্ষ্য অর্জন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সেইসঙ্গে প্রায় দেড় লাখ টন ধান উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রথমদিকে কিছু জমিতে চারা রোপণ করা হলেও বর্তমানে পানি না থাকায় মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।

সেচ প্রকল্প মেরামত ও বিকল্প ব্যবস্থাপনায় সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে শস্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ।

সত্তরোর্ধ্ব মিরপুর উপজেলার কবরবাড়ি গ্রামের খালেক মণ্ডল বলেন, “এই দ্যাকেন মাটে ধান জর্মাতে পারতিসনি, ধানের জমি সব পইরি পইরি আচে, চারা আতালিই (বীজতলা) রচে, একন আমরা পানি চাচ্চি, পানি আমার দিক, আল্লা দেচ্চে না, এই বান্দার হাতে যেটুক আচে, সিডা দিলিও তো আমরা বাঁচি।”

সদর উপজেলার জগতি গ্রামের চাষি বাসের আলীর অভিযোগ, “আপনেরাই দ্যাকেন, এই যে মাঠের পর মাঠ পইরি আচে, পানি নাই, বোরিংয়ে পানি উটতেচে না, যে দুই-একটায় উঠচে সিডাও হাফ পরিমান।”

আরেক চাষি রাবুল সেখ (৫০) বলেন, “পানি বিহিন মাটে, কোনো ফসলই হচ্চে না, উরা (জিকে কর্তৃপক্ষ) আগে যদি বুইলতি যে, পানি দিতি পারবনানে, তালি আমরা আগেই অন্য বেবেস্থা কইরি নিতানে।”

বাড়ুইপাড়া গ্রামের চাষি হাসিনা বেগম (৫৫) বলেন, “পানির সেমেস্যা কি এট্টু-আট্টিক হয়চ নাকি? এই যে আমরা গরিব মানুষ পাঁচ হাজার ট্যাকা খরচ কইরি চারা দিছিলাম, পানি বিনি সে চারা লাগাতি না পাইরি একন কাইটি আনি গরুক খাওয়াচ্চি, একন আমরা এই ছাওয়াল পাল লিয়ে খায়ে বাঁচপো সেই ধানডাও একন হবি না, কী খাবো তালি?

“পানির আশায় থাকি আমার ফসলও বুনতি দিলি না, আবার ধানও লাগাতি পাল্লাম না, বাড়ির গরু বাচুর মুরগি পাখির খাওয়ার পানিরও সেমেস্যা হয়ে গেচে। বোরিংয়েও পানি ওটতেচ না টিউকলেও পানি ফেল করেচে, আমারে বাঁচাই দায় হয়ে গেচে।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ি কুষ্টিয়ার উপ-পরিচালক সুফি মো. রফিকুজ্জামান বলেন, “চলতি বোরো মৌসুমে এ জেলায় ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ বছর জিকে সেচ প্রকল্পের সেচ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন ব্যাহত হবে।

“এতে প্রায় ৭৭ হাজার টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঘাটতির শঙ্কা থাকবে।”

তবে আগামী আমন মৌসুমে এই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

জিকে সেচ প্রকল্পের আওতায় চার জেলার ১৩টি উপজেলার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করতে চাইলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার সেচ সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তা আব্দুল মতিন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রশিদুর রহামান বলেন, বৃহৎ এ সেচ প্রকল্পটি মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করে চালু করতে প্রকল্প গ্রহণ করে প্লানিং কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এই উন্নয়ন প্রকল্পটির যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন পেলে কাজ শুরু হবে।

সেইসঙ্গে সরকার বিদ্যমান সেচ সংকট থেকে কৃষকদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার কথাও ভাবছে বলে জানান তিনি।