Published : 05 Mar 2026, 09:12 PM
বিমান দুর্ঘটনায় রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিজের প্রাণ বিপন্ন করে শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচানো শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরীকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পুরস্কার দিতে যাচ্ছে সরকার।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সরকার জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সেখানে মাহেরীন চৌধুরীকে সমাজসেবা ও জনসেবায় স্বাধীনতা পদক দেওয়া হচ্ছে।
মাহেরীন চৌধুরী নীলফামারীর জলঢাকা পৌর এলাকার বগুলাগাড়ি গ্রামের মেয়ে এবং মো. মনসুর হেলালের স্ত্রী। মাহেরীন নিহত হওয়ার আগে জলঢাকার বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্বাহী কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষিকা ছিলেন।
পারিবারিক পরিচয়েও মাহেরীন চৌধুরী ছিলেন পরিচিত মুখ। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাতিজি। মাহেরীনের বাবা মহিতুর রহমান জিয়াউর রহমানের আপন খালাতো ভাই।

২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্লাস চলাকালে একটি ভবনে প্রশিক্ষণ বিমান আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই আগুন ধরে যায় ভবনে। ধোঁয়া আর আতঙ্কে চারপাশ যখন হাহাকার, তখন শিশু-শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত ছিলেন মাহেরীন।
তিনি ২০ জন শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে নিজেই আগুনে আটকে পড়েন। শরীরের অধিকাংশ দগ্ধ হয় তার। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় নেওয়া হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
সেদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি তার স্বামী মনসুর হেলালের সঙ্গে শেষবারের মত কথা বলেছিলেন। তখন তার স্বামী তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সুযোগ থাকার পরও কেন তিনি বের হয়ে আসলেন না? অন্তত নিজের দুই সন্তানের কথা ভেবেও তো আসতে পারতেন।
'ওরাও তো আমার সন্তান, ওদের রেখে কী করে আসি', স্বামীকে বলেছিলেন মাহেরিন
জবাবে মাহেরীন চৌধুরী তার স্বামীকে বলেছিলেন, “ওরাও (শিক্ষার্থীরা) তো আমার সন্তান। ওদের একা রেখে আমি কী করে চলে আসি? আমি আমার সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি ওদের বাঁচাতে।”
মাহেরীনের কারণে সেদিন অন্তত ২০ শিশু শিক্ষার্থী তাদের মায়ের কোলে ফিরে আসতে পেরেছিল।

সেদিন রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পরে তাকে জলঢাকার বগুলাগাড়ীর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
নিজের জীবন বিপন্ন করে মাহেরীনের শিক্ষার্থীদের প্রতি এই মমতা, আত্মত্যাগের ঘটনা তখন সারাদেশে আলোচিত হয়। মানুষ তার সাহসিতার প্রশংসা করেন।
মাহেরীনকে সরকারের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করার খবর শুনে আপ্লুত হয়েছেন তার স্বামী মনসুর হেলাল। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার স্ত্রীর স্মৃতি রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। সরকার তাকে মরণোত্তর পদক দিয়ে যে সম্মান দিয়েছে, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। এই স্বীকৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তার আত্মত্যাগ দেশের মানুষের কাছে মূল্যবান হয়ে থাকবে।”
তিনি বলেন, “আমার স্ত্রী নিজের জীবন উৎসর্গ করে কোমলমতি শিশুদের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। এটি যেমন আমাদের পরিবারের জন্য গভীর গর্বের বিষয়, তেমনি তাকে হারানোর বেদনাও আমাদের জন্য অসীম।
“প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শূন্যতা কোনো সম্মানেই পূরণ হওয়ার নয়; তবু তার আদর্শ ও আত্মত্যাগ আমাকে ও আমাদের দুই সন্তানকে সাহস ও শক্তি দেয়। তার রেখে যাওয়া আদর্শে আমি আমাদের দুই ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করছি।”
আরও পড়ুন:
মাহেরীন চৌধুরীর সমাধিতে নীলফামারীর ডিসি-এসপির শ্রদ্ধা
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: জীবন দিয়ে শেখানো শিক্ষকতা
মাইলস্টোনের ৩ শিক্ষক 'চিরস্মরণীয়' হয়ে থাকবেন: প্রধান উপদেষ্টা