Published : 22 Jul 2025, 10:36 PM
“ওরাও তো আমার সন্তান। ওদের একা রেখে আমি কী করে চলে আসি? আমি আমার সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি ওদের বাঁচাতে।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর আগ মুহূর্তে স্বামীর হাত বুকে নিয়ে এই কথাগুলো বলেছিলেন উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী।
সোমবার দুপুরে দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর মাহেরিন চৌধুরীকে নিয়ে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেলে; সেখানেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে তার মরদেহ পৌঁছে বাবার বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বগুলাগাড়ি চৌধুরীপাড়া গ্রামে। এরপর বিকাল ৪টার দিকে বাড়ির সামনে থাকা বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে জানাযা হয়। শেষে পারিবারিক করস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে শায়িত করা হয় মাহেরিন চৌধুরীকে।

দাফন শেষে মাহেরিনের স্বামী মনসুর হেলাল সাংবাদিকদের বলেন, “মাহেরিন অনেক ভালো মানুষ ছিল। ওর ভেতরে একটা মায়া ছিল সবাইকে ঘিরে। আগুন লাগার পর যখন অন্যরা দৌড়াচ্ছিল, ও তখন বাচ্চাদের বের করে আনছিল। কয়েকজনকে বের করার পর আবার ফিরে গিয়েছিল বাকি বাচ্চাদের জন্য। সেই ফেরাটা আর শেষ হয়নি। সেখানেই আটকে পড়ে, সেখানেই পুড়ে যায় আমার মাহেরিন।”
“শেষ রাতে হাসপাতালে ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আইসিইউতে শুয়ে শুয়ে ও আমার হাত নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরেছিল। বলেছিল, আমার সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমি ওর হাত ধরতে গিয়েছিলাম, কিন্তু শরীরটা এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে ঠিকভাবে ধরতেও পারিনি।”
মনসুর হেলাল বলেন, “তবে সে মৃত্যুর আগে আমার বুকের কাছে মাথা যখন রেখেছিল; তখন ওকে (মাহেরিনকে) আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি তোমার নিজের দুই সন্তানের কথা একবারও ভাবলে না?’ সে বলেছিল, ‘ওরাও তো আমার সন্তান। ওদের একা রেখে আমি কী করে চলে আসি? আমি আমার সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি।’”
তিনি বলেন, “ওকে বাঁচাতে কিন্তু পারিনি। আমার দুইটা ছোট ছোট বাচ্চা এতিম হয়ে গেল।”
পরিবার জানায়, সোমবার দুপুরে প্রতিদিনের মত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছিলেন মাহেরিন চৌধুরী। হঠাৎ করেই প্রশিক্ষণ বিমানটি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাথমিক শাখা ভবনে আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

এ সময় দগ্ধ শরীর নিয়েও তিনি অন্তত ২০ শিক্ষার্থীকে নিরাপদে বের করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে নেওয়া হলে রাতে মৃত্যু হয়।
বাবার বাড়ি নীলফামারী জলঢাকা উপজেলা বগুলাগাড়ী চৌধুরীপাড়া হলেও জন্মের আগে থেকেই পুরো পরিবার ঢাকায় বসবাস করতেন। তার বেড়ে উঠা ও পড়ালেখা ঢাকায়। মাহেরিন ও তার আরো এক বোন, দুই ভাই রাজধানী ঢাকার উত্তরায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মহিতুর রহমান চৌধুরী ও সাবেরা খাতুন দম্পতির বড় মেয়ে।
১৯৭৯ সালের ৬ জুন রাজধানী ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন মাহেরিন চৌধুরী। তিনি ১৯৯৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৯৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিতুমীর কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স শেষ করে মানারাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে মাস্টার্স পাস করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ২০০২-০৩ সালের দিকে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত হন মাহেরিন চৌধুরী। মৃত্যুর আগ পযন্ত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা মিডিয়াম শাখার তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির সমন্বয়ক ছিলেন।
২০০৮ সালে বিয়ে করেন মাহেরিন চৌধুরী। তার শ্বশুরবাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চরআত্রাই গ্রামে। স্বামী মনসুর হেলাল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার। আয়ান রশীদ ও আদেল রশীদ নামে দুই ছেলে সন্তান রয়েছে তাদের।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মাহেরিন ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আত্মীয়। জিয়াউর রহমানের মা জাহানারা বেগম এবং মাহেরিন চৌধুরীর দাদী রওশনারা বেগম ছিলেন আপন বোন। জিয়া পরিবারের সদস্য হলেও কখনো নিজেকে সেভাবে রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় করেননি মাহেরিন ও তার পরিবার। একজন সাধারণ মানুষের মতই ছিল তার এলাকাবাসীর সঙ্গে সম্পর্ক।
মাহেরিনের ভাই মারুফ মজিব চৌধুরী জানান, সম্প্রতি জলঢাকার বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মাহেরিন।
বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মহুবার রহমান বলেন, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মাহেরিন চৌধুরী কলেজের এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ২২ জুন তিনি প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন। প্রতিদিনই তিনি একবার করে হলেও ফোনে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন।
“সোমবার দুপুর ১২টার দিকে প্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সমাবেশ আহ্বান করা নিয়ে ম্যাডামের সঙ্গে সবশেষ কথা হয়। এরপরই খবর পাই তিনি বিমান দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়েছেন এবং রাতে মারা গেছেন।”
তিনি আরো বলেন, “একজন শিক্ষক, একজন মা হিসেবে মাহেরিন ম্যাম নিজের জীবন বাজি রেখে অনেক শিক্ষার্থীর প্রাণ বাঁচিয়ে তিনি আজ না ফেরার দেশে। তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা পুরো জাতি মনে রাখবে।”