Published : 24 Jul 2025, 02:27 PM
একলব্য নিজের ডানহাতের বুড়ো আঙুল কেটে গুরু দ্রোণাচার্যকে দক্ষিণা দিয়েছিলেন। এই আঙুলটি না থাকলে তীর ছোড়ার উপায় থাকবে না জেনেও গুরুর চাওয়া প্রত্যাখান করেননি। মহাভারতের এই গল্পটি যাদের জানা আছে, তারা জানেন দ্রোণাচার্য আদতে নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্যকে কখনোই শিক্ষা দেননি। বরং শিক্ষা নিতে গেলে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরে একলব্য নিজের উদ্যোগে দ্রোণাচার্যর মূর্তি বানিয়ে তার সামনে অনুশীলন করে সেরা তীরন্দাজে পরিণত হন। দ্রোণাচার্য তার প্রিয় শিষ্য অর্জুনের শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করার জন্যই একলব্যের কাছে এমন নিষ্ঠুর গুরুদক্ষিণা চেয়েছিলেন।
মাইলস্টোন ট্রাজেডিতে বাস্তব জীবনে আমরা দেখেছি এর বিপরীত কিছু শিক্ষককে, যারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদীক্ষা তো দিয়েছেন, শেষমেষ প্রাণ দিয়ে তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করে গেছেন। একলব্য গুরুর চরণে মাথা রেখেছিলেন, আর এখানে গুরুরা শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন আগুনে, মৃত্যুর মুখে।
মহাভারতের একলব্যের প্রতারিত হওয়ার বিপরীত উদাহরণ অবশ্য মেলে আরও অনেক ঘটনায়। জাপানে ১৯২৩ সালের কান্টো ভূমিকম্পে অনেক শিক্ষক নিজের প্রাণ দিয়ে ছাত্রদের রক্ষা করেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ‘ও হোসাই’—এমনটাই জনশ্রুতি, যার গল্প আজও জাপানি স্কুলঘরগুলোতে উদাহরণ হিসেবে শেখানো হয়।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলি থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে ছুটে গিয়েছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। রসায়নের শিক্ষক শামসুজ্জোহা নিজে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বাংলাদেশের ইতিহাস এই শহীদ শিক্ষককে এখনও মনে রেখেছে। রাখবে যতদিন থাকবে এই দেশ।
শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক কেবল পাঠদান আর পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি কখনো কখনো হয়ে ওঠে নিজের জীবনের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের বাঁচাবার গল্প। মাহেরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগম নিপু ঠিক সেই গল্পেরই বর্তমান চরিত্র।

লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগে মাহেরিন চৌধুরী তার স্বামী মনসুর হেলালকে ডান হাতটা শক্ত করে ধরতে বলেছিলেন। মনসুর নিজেই বলছিলেন সেই কথা। হাত ধরবেন কী করে—আগুনে শতভাগ দগ্ধ স্ত্রীর হাতই তো খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। মনসুরের ভাষায়, “ও (মাহেরিন) বলল, তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।”
তখন তাদের আরও অনেক কথা হয়। তবে সেই শেষ কথা। এরপর জীবিত মাহেরিনরে সঙ্গে আর দেখা হয়নি মনসুরের। মাহেরিনের দাফনের সময় মনসুর বলছিলেন, “তবে সে মৃত্যুর আগে আমার বুকের কাছে মাথা যখন রেখেছিল, তখন ওকে (মাহেরিনকে) আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি তোমার নিজের দুই সন্তানের কথা একবারও ভাবলে না?’ সে বলেছিল, ‘ওরাও (ছাত্ররা) তো আমার সন্তান। ওদের রেখে আমি কী করে চলে আসি? আমি আমার সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি।’’
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মাহেরিন চৌধুরীকে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি প্রায় সবারই জানা আছে। অনেকেই এই ঘটনার অনেক পুঙ্খানুপুঙ্খ জানেন।
একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ, মমত্ববোধের প্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনি—নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে। বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান স্কুলে পড়ে গিয়ে যখন বিধ্বস্ত হয়, তখন শিশুশিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে নিজের প্রাণের মায়া করেননি মাহেরিন।
দুপুরে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পর রাতে মারা যান মাহেরিন চৌধুরী। তার শরীরের শতভাগ দগ্ধ হয়ে গিয়েছিল, বলেছেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডাক্তার শাওন বিন রহমান। মাহেরিন চৌধুরী যদি নিজের জীবনের দিকে তাকাতেন, তাহলে হয়তো বেঁচে যেতে পারতেন, কিন্তু তার কাছে অগ্রাধিকার ছিল তার শিশুশিক্ষার্থীদের জীবন।

আরেক শিক্ষক মাসুকা বেগম নিপু মারা যেতে পারেন জেনেও আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে। মাহেরিনের শেষ সময়গুলোর কথা জানা যায় তার স্বামীর কাছ থেকে। মাসুকা বিয়ে করেননি। শেষ সময়গুলো আপনজনদের কাউকে কাছে পাননি। ফলে তার কথা খুব বেশি জানা গেল না।
অভিভাবকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানদের রেখে আসেন এই মাহেরিন চৌধুরীদের ওপর ভরসা করে। মাহেরিনরা অভিভাবকদের এই ভরসাকে জীবন দিয়ে প্রতিপালনের চেষ্টা করে গেছেন। জীবন দিয়ে শিক্ষার্থীদের আগলে রাখার যে প্রত্যয় শিক্ষকদের থাকা দরকার, সেটা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করেছেন মাহেরিন। যদি নিজের জীবনকে রক্ষা করতে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতেন, এর মাঝেও ছিল না আপত্তির কিছু; ‘জীবন বাঁচানো ফরজ’ বলে যে আপ্তবাক্য—সেটা মাহেরিন চৌধুরীর কাছে নিজের জীবন অর্থে ফরজ ছিল না; ছিল শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচানো ফরজের বিষয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তত বিশজন শিক্ষার্থীকে বের করে এনেছেন তিনি।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত অপর শিক্ষক মাসুকা বেগম নিপু বাংলা মিডিয়ামের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিলেন। পরে তিনি গুরুতর আহত হওয়ার পর তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলে রাতে মারা যান।
শিশুশিক্ষার্থীদের বাঁচাতে নিজের দুই শিশুকে ‘এতিম’ করে দিয়ে মাহেরিন চৌধুরীর যে বীরত্ব দেখিয়ে গেছেন, তার স্বীকৃতি মেলেনি। মৃত্যুকালে তাকে দেওয়া হয়নি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যথোপযুক্ত সম্মান। আর দশজনের মতো সমাহিত হয়েছেন তিনি—পরিবারপরিজন ও সামাজিক শোকে। অথচ স্বীকৃতি জরুরি ছিল; খুব জরুরি।
যে যুদ্ধবিমানটি মাইলস্টোন ট্রাজেডির জন্ম দিয়েছে, সেটির পাইলট তৌকির ইসলাম কিন্তু পেয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মান। রাজধানীর কুর্মিটোলায় হয়েছে ‘ফিউনারেল প্যারেড’ বা সামরিক বিদায় সংবর্ধনা, যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, বিমানবাহিনী প্রধানসহ সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা।
সামরিক কর্মকর্তাদের পেশাগত পদবির কারণেই ‘বীর’ ভাবা হয়। উত্তরার এই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় প্রশিক্ষণ শেষে অনুশীলনের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে অগণন প্রাণ চলে যাওয়ার পরেও পাইলট তৌকির পেয়েছেন বাহিনী কর্তৃক ফিউনারেল প্যারেড। তার জানাজায় তাই উপস্থিত রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদবিধারীরা। এটা সামরিক ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যকার রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত বৈষম্য কিনা, সেটা ভেবে দেখাও জরুরি। জুলাই-আন্দোলনের মূল ‘চেতনা’ যেখানে ছিল ‘বৈষম্যের বিলোপ’, সেখানে সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বৈষম্য নিয়ে আলোচনার দাবি রাখে।
অনেকেই এখানে বলতে পারেন, অন্য অনেক নিহতের ভিড়ে মাহেরিন চৌধুরীদের আলাদাভাবে সম্মাননার সুযোগ ছিল না। হয়তো ছিল না। তবে যখন শিক্ষক মাহেরিনের বীরত্ব বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছিল, তখন নিশ্চয়ই আগের পরিচয়ে তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি; মুহূর্তেই হয়ে পড়েছিলেন দেশব্যাপী চর্চিত ও আলোচিত এক নাম।
যুক্তি-বাস্তবতার নিরিখে ধরে নিচ্ছি, এখনই সুযোগ থাকলেও সীমাবদ্ধতা ছিল বিবিধ; তবে সময় শেষ হয়ে যায়নি। মাহেরিন ও মাসুকাদের বীরত্বের স্বীকৃতি নিয়ে ভাবা দরকার বলে মনে করছি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সারাদেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কর্তৃক অনেক শিক্ষক নিগৃহীত হয়েছেন। অভ্যুত্থানের আগেও শিক্ষকদের নির্যাতন করার ঘটনা নেহায়েত কম নয়। নারায়ণগঞ্জের ওসমান ভাইদের আরও অনেক নির্যাতনের মতো একজন শিক্ষককে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখার ঘটনা ভুলবার নয়। আমাদের জাতীয় জীবনের কালো অধ্যায় হয়ে আছে সেই সব ঘটনা। তবু শিক্ষকরা শিক্ষকের দায়িত্ববোধ বিস্মৃত হননি, তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন এখনো শিক্ষার্থীদের জন্যে।
শিক্ষক লাঞ্ছনা যখন আমাদের এখানে প্রায় নিত্যকার ঘটনায় পরিণত হয়েছিল, তখন মাহেরিন চৌধুরীদের মতো শিক্ষকদের সম্মান জানিয়ে আমাদের সকলকে অনুশোচনার সুযোগ দেওয়া উচিত। তার বীরত্বকে সামনে আনা উচিত। হ্যাঁ, স্বার্থ ও স্বার্থের সংঘাতজনিত বিবিধ সমস্যা আছে আমাদের শিক্ষকদের অনেকের মধ্যে; কিন্তু শিক্ষক আজীবন শিক্ষকই। কেউ কেউ ভিন্নপথের হলেও মাহেরিন চৌধুরীদের মতো এখনো বেশিরভাগ শিক্ষকই আদি ও অকৃত্রিম পথেই হাঁটছেন।
মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজ ট্র্যাজেডিতে নারী-শিশুসহ যত লোকের প্রাণ গেছে, তারা মূলত বেসামরিক নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রের ‘এলিট’ শ্রেণির চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্যের শিকার। আমাদের প্রাণ যায়, কিন্তু সে প্রাণগুলো কেবলই সংখ্যা রূপে চিত্রিত হয়। এবার সংখ্যা কত, সংখ্যা কত—এমন আওয়াজও শোনা যাচ্ছে। এই আওয়াজ বৈষম্যসৃষ্ট অনাস্থা থেকে কি নয়? উত্থাপিত প্রশ্ন ছোট্ট হলেও আবেদন বিশাল। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ছোট প্রশ্নকে ‘ছোট্ট’ করে না দেখে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। তা না হলে বৈষম্যের বিলোপ কেবল সাদাকালো অক্ষর রূপেই চিত্রিত হতেই থাকবে!