Published : 14 May 2026, 09:41 AM
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়েছে গরুর ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি)। শত শত গরু ভাইরাসজনিত এ চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ায় কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন খামারি ও গরু ব্যবসায়ীরা।
খামারিদের অভিযোগ, সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন না থাকায় রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করিয়েও অনেক গরুকে বাঁচানো যাচ্ছে না। এতে ঈদকেন্দ্রিক পশু ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শ্যামল চন্দ্র দাস বলেন, “বর্তমানে পুরো উপজেলায় পাঁচ শতাধিক গরু এই রোগে আক্রান্ত রয়েছে। আমাদের রেজিস্টার অনুযায়ী প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি আক্রান্ত গরু চিকিৎসা নিচ্ছে। এছাড়াও বাইরে থেকেও অনেক গরুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ইসলামাবাদ, সুলতানাবাদ, ফরাজিকান্দি, এখলাসপুর, জহিরাবাদ, ষাটনল, সাদুল্ল্যাপুর, বাগানবাড়ি, ফতেহপুর ইউনিয়ন ও ছেংগারচর পৌর এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কমবেশি গরু আক্রান্ত হয়েছে।

আক্রান্ত গরুর দুধ উৎপাদন কমে যাচ্ছে, শরীরজুড়ে ক্ষত তৈরি হচ্ছে এবং চামড়া নষ্ট হয়ে বাজারমূল্য কমে যাচ্ছে। ফলে দুধ, মাংস ও চামড়া শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া বহু খামারি তাদের বহু অর্থ-কষ্টে লালন করা গরু হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন।
সোমবার গজরা ইউনিয়নের খাককান্দা গ্রামে প্রান্তিক খামারি হোসনেয়ারা বেগমের কোরবানির ঈদ উপলক্ষে লালন-পালন করা প্রায় আড়াই লাখ টাকা মূল্যের একটি বিশাল গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস হারিয়ে দিশেহারা ওই নারীর আহাজারিতে হৃদয়বিদারক ঘটনার সৃষ্টি হয়।
এদিকে ছেংগারচর পৌরসভার ওটারচর গ্রামেও একই শোকের চিত্র দেখা গেছে।
সেখানে কয়েকদিন আগে এক খামারি পরিবারের পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গাভী মারা গেছে এই রোগে। একই গ্রামের দরিদ্র অটোচালক কাসেমের একটি বাছুরও ভাইরাসটির আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি।
ইসলামাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা শুভ বলেন, “প্রায় ২০ দিন আগে তাদের নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা গাভী মারা গেছে। গাভীটির ওপরই পরিবারের বড় ধরনের আশা নির্ভর করছিল।

একই ইউনিয়নের খামারি আলম নুরীও একই ধরনের কষ্টের কথা জানান। কয়েকদিন আগে তার শখের গরুটি মারা যাওয়ায় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ছেংগারচর পৌর এলাকার ওটারচর গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি আতাউর রহমান বলেন, “আমার একটি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অনেক টাকা খরচ করে চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গরুটি মারা যায়। ডাক্তাররা বলেছেন, এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই।”
সুজাতপুর গ্রামের খামারি জসিম উদ্দিন বলেন, “আমার খামারে সাত-আটটি গরু রয়েছে। চারদিকে যেভাবে রোগ ছড়াচ্ছে, তাতে প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। ঈদের আগে গরু আক্রান্ত হলে ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামবে। এতে আমরা ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বো।”

আতঙ্কিত খামারিরা বলছেন, বর্তমানে মতলব উত্তরজুড়ে যেভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুরো উপজেলার ডেইরি শিল্প বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শ্যামল চন্দ্র দাস বলেন, “মশা ও মাছির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসে আক্রান্ত গরু প্রথমে তীব্র জ্বরে ভোগে। পরে শরীরজুড়ে গুটি বসন্তের মতো ক্ষত তৈরি হয়ে চামড়া পচে যায়। বর্ষাকাল ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এ রোগের সংক্রমণ আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ও পুঁজ বের হয়। আক্রান্ত গরু খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে চিকিৎসা করিয়েও অনেক গরুকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, লাম্পি স্কিন রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সচেতনতা ও পরিচর্যার মাধ্যমেই রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তিনি জানান, সরকারিভাবে এ রোগের ভ্যাকসিন খুবই সীমিত। চলতি বছরে সরকারিভাবে প্রায় ৮০০ গরুকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। তবে বেসরকারিভাবে কিছু ভ্যাকসিন মতলবে পাওয়া যাচ্ছে।

আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা নিয়ে তিনি বলেন, “রোগের লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে অ্যান্টিপাইরেটিক ও অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহার করা হয়। ক্ষতস্থানে পভিসেপ বা ভায়োডিন দিয়ে ড্রেসিং করে বোরিক বা সালফানিলামাইড পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে। অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। সাধারণত ২১ দিনের মধ্যে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আসে।”
খামারিদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো গরু আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিবন্ধিত প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আক্রান্ত পশুকে অবশ্যই আলাদা রাখতে হবে, মশারির ভেতরে রাখতে হবে; যাতে অন্য গরু আক্রান্ত না হয়।
গরুর ব্যবহৃত জিনিসপত্রও আলাদা রাখতে হবে। আক্রান্ত গাভীর দুধ বাছুরকে না খাইয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। একইসঙ্গে খামারের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন এ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।