Published : 07 Oct 2025, 08:06 PM
অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় একদিনেই ১৬টি বসতবাড়ি ও চারটি মসজিদ তিস্তা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
অপরদিকে ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নে চারটি গ্রামে পানি ঢুকে ৭০০ পরিবারের অন্তত তিন হাজার মানুষ বন্দি অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরজমিনে দেখা যায়, তিন দিন ধরে উজানে ভারি ও অতি ভারি বৃষ্টিপাতের প্রভাব এবং তিস্তা ব্যারেজের কপাট খুলে দেওয়ায় তীব্র স্রোতের তোড়ে হু হু করে তিস্তা নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। আকষ্মিকভাবে একসঙ্গে পানি প্রবাহের ফলে ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের খিতাব খাঁ, চর নাখেন্দা, সরিষাবাড়ি ও গতিয়াসামের মাঝেরচরে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

পাশাপাশি গতিয়াসামের মাঝের চর গ্রামে শুরু হয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। গত তিন দিনে এই গ্রামের প্রায় পাঁচ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। হুমকিতে রয়েছে দুই শতাধিক বাড়ি এবং শত শত বিঘা ফসলি জমি।
মাঝের চর গ্রামের খোরশেদ আলী জানান, হঠাৎ করে মাঝরাতে পানি বৃদ্ধির ফলে লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নদী তীরবর্তী বাড়িগুলো রক্ষায় লোকজন বাড়ি থেকে বের হয়ে ভাঙন কবলিতদের উদ্ধারে নেমে পড়েন। তবে চারদিকে পানি প্লাবিত হওয়ায় ভাঙনের মুখে থাকা বাড়িঘর ধরে রাখা খুব কষ্টকর হচ্ছে। ফলে যেখানে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই ঘরবাড়ি রাখছে মানুষ। এ ছাড়া যাদের সামর্থ রয়েছে তারা নৌকা ভাড়া করে গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে চলে যাচ্ছেন।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রান্না চড়িয়েছেন মাঝেরচর গ্রামের আছরুদ্দির স্ত্রী রোজিনা। চাল পরিষ্কার করে হাঁড়িতে বসিয়ে লাউশাক রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলছিলেন, “রাত ৩টা থেকে পানি বাড়ছে। রান্নাবান্না করতে পারিনি। ভর দুপুরে রান্না বসাইছি। এখন আমাদের চতুর্দিকে কষ্ট। পানির কষ্ট। খাবারের কষ্ট। গ্রামে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নাই। ফলে কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই।”
পাশেই চার-পাঁচটি বাড়ির পরেই সাবিনাদের ঘর। তাদের শোবার ঘরে পানি প্রবেশ করেছে। দুই সন্তান আর মাকে নিয়ে বিছানায় অবস্থান নিয়েছেন তারা।
সাবিনা বলেন, “রাত থেকে পানি বাড়ার ফলে ঘরের ভিতর পানি ঢুকেছে। ফলে রান্নার কষ্ট হচ্ছে। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, বাচ্চাদের নিয়ে খুব বিপদে আছি।”

এই গ্রামের ওসমানের ছেলে সহিজল বলেন, “সোমবার থেকে বন্যার মধ্যে অবস্থান করছি। বন্যার পানিতে সব ডুবে গেছে। মানুষের দুর্গতি শুরু হয়েছে। চেয়ারম্যান-মেম্বার কোনো খোঁজ-খবর নিচ্ছেন না।”
রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, খিতাব খাঁ গ্রামে ২০০, চর নাখেন্দা গ্রামে ২০০, সরিষাবাড়িতে ৫০ এবং চর গতিয়াসাম মাঝের চরে ২৫০টি বাড়িসহ প্রায় ৭০০ বাড়ি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া একদিনে মাঝের চরে ভেঙেছে ১৬টি বাড়ি। বাড়িগুলি হচ্ছে, ওসমানের ছেলে সহিজল, সালমানের ছেলে সালাম, হায়দার মুন্সির ছেলে মোস্তাক, তাসলিমের ছেলে বোরহান, নুরুলের ছেলে মোকাদ্দেশ ও কুদ্দুছ, ভুট্টুর ছেলে খোরশেদ, হামিদারের ছেলে অহিজল, শুটকোর ছেলে জয়নাল তেলি, মহুবরের ছেলে জহুরুল, জহুরুলের ছেলে তাইজুল, হাবিলের ছেলে আলমগীর, আনছার তেলির ছেলে অবিরুদ্দিসহ আরও তিনটি পরিবার।

এ ছাড়া এই চরের তিনটি মসজিদ নদীগর্ভে চলে গেছে। আরও একটি ভেঙে পড়ছে বলে জানান সাবেক ইউপি সদস্য।
এ ব্যাপারে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল ইমরান বলেন, “তিস্তায় পানি প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে চর এলাকার বসতিগুলোতে পানি প্রবেশ করছে। সেখানে আমাদের পর্যাপ্ত নৌকার প্রস্তুতি রয়েছে। এ ছাড়া আট শতাধিক ত্রাণের প্যাকেট মজুদ রয়েছে। যে কোনো সময় পরিস্থিতির অবনতি হলে আমরা সহায়তা করতে পারব। আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি এবং ভাঙনের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবগত করছি।”