সরকার দলীয় প্রভাবশালী একাধিক মহল অবৈধভাবে নদীর পাড় থেকে ড্রেজার দিয়ে সারা বছর বালু উত্তোলন করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
Published : 14 Aug 2023, 09:53 AM
ফেনীর উত্তরের জনপদ ফুলগাজী ও পরশুরামের বিস্তীর্ণ এলাকাকে বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে নির্মিত মুহুরী বাঁধটি প্রতি বছরই কয়েক জায়গায় ভেঙে হাজার হাজার মানুষের দুর্গতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নদীর পানি ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি ঢল আসায় শুধু মাটি দিয়ে তৈরি বাঁধটি নির্মাণের এক যুগের মাথায় বিভিন্ন স্থানে ভেঙে লোকালয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অভিমত। তারা এখন সেখানে নতুন করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
কিন্তু এলাকার ভুক্তভোগী মানুষের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণের সময় সেখানে কোনো ব্লক দেওয়া হয়নি। তাছাড়া বাঁধের সংস্কার কাজে নদীর বালু ব্যবহার করা হয়; যা বৃষ্টিতে ভেসে যায়। এ ছাড়া ইঁদুরের গর্ত দিয়েও পানি ঢুকে বাঁধের ক্ষতি হচ্ছে।
পাউবো জানিয়েছে, মাতামুহুরী নদী ভারত থেকে ফেনীতে প্রবেশ করেছে। তার পাশেই রয়েছে কহুয়া ও সিলোনিয়া নদী। মুহুরী-কহুয়া-সিলোনিয়া নদীর উপর ১৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২২ কিলোমিটার মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ২০০৪ সালে কাজ শুরু হয়, ২০১১ সালে শেষ হয়। বাঁধ নির্মাণের পরের কয়েক বছর এলাকা বন্যামুক্ত ছিল।
কিন্তু ২০১৩ সালে আকস্মিক বাঁধের তিনটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। পরে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাঙন কবলিত অংশ মেরামত হয়। এরপর প্রতিবছর ভাঙে বাঁধের বিভিন্ন স্থান। গত পাঁচ বছরে ‘মুহুরী বাঁধ’ অন্তত ৮৬টি স্থানে ভেঙেছে; আর এগুলো সংস্কারে পাউবো সোয়া সাত কোটি টাকার মত খরচ করেছে।
এর মধ্যে ২০১৮ সালে ২২টি স্থান মেরামতে ২ কোটি ৪৪ লাখ, ২০১৯ সালে ১৫টি স্থান মেরামতে ১ কোটি ৭৯ লাখ, ২০২০ সালে ২২টি স্থান মেরামতে ১ কোটি ৫০ লাখ, ২০২১ সালে ২১টি স্থান মেরামতে ২ কোটি ১৩ লাখ এবং ২০২২ সালে ৬টি স্থান মেরামতে ৭১ লাখ ব্যয় হয়েছে।
এবারও প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের পূর্ব অলকা এলাকায় প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ মিটার ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। এ ছাড়া ফুলগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের উত্তর দৌলতপুর ও উত্তর বরইয়া এলাকায় ১৫ থেকে ২০ মিটার করে ভেঙেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পাউবোর ফেনীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, “মুহুরী নদীর প্রশস্ততা কম, পানি ধারণ ক্ষমতাও কম। যে বাঁধ এক কিউসেক পানি ধারণ করার ক্ষমতা রাখতে পারে সেই বাঁধে ১৫ কিউসেক পানির উচ্চতা হলে তা স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়বে।
“প্রতিবছরই উজানের পানিতে বাঁধের কোনো না কোনো স্থান ভাঙে। এবার কেন ভেঙেছে তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আগামীতে নতুন বাঁধ নির্মাণ করা হলে এ সমস্যা আর থাকবে না”, যোগ করেন পাউবোর প্রকৌশলী।
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ
এবারও বাঁধ ভেঙে ২০ গ্রামে পানি ঢুকে ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এ ছাড়া ফুলগাজীতেই বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৫০ হেক্টর আয়তনের শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। দুই উপজেলায় পানিবন্দি হয়েছে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। বেশ কিছু জায়গায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, “বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর তার আশপাশে ও বাঁধের উপরে প্রচুর পরিমাণ গাছ লাগানো হয়েছিল। গাছগুলোর শিকড় মাটির নিচ দিয়ে যাওয়ায় বড় বড় ইঁদুর গর্ত তৈরি করে। ওই গর্ত দিয়ে পানি ঢুকে প্রতিবছর বাঁধ ভেঙে যায়।
তিনি আরও বলেন, “প্রতিবছর পাউবো বাঁধের ভাঙা অংশগুলো দায়সারাভাবে মেরামত করে। যে কারণে পরের বছর আবারও ওই স্থানে বাঁধ ভাঙে। অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে স্থানীয় লোকজনকে দিয়ে বাঁধের নামমাত্র মেরামত করা হয়। গত বছর স্থানীয়দের বাধায় সংস্কার কাজ কিছুদিন বন্ধও ছিল। পরে আবার রাতের আঁধারে বাঁধটি সংস্কার করে পাউবো।”
চিথলিয়া ইউনিয়নের অলোকা গ্রামের বাঁধের তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, “নদীর উজানে ভারতের অংশে পানি বাড়লে মুহুরী নদীর পানি বাড়ে। তখন পানির তোড়ে হুড়মুড়িয়ে ধসে যায় মাটির বাঁধ আর হু হু করে লোকালয়ে পানি ঢোকে।
“পরে সেই স্থানে দায়সারা মেরামতও করে পাউবো, লুটপাটও হয়। তাই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।”
ফুলগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের দৌলতপুর এলাকার ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, “প্রতিবছর এই বাঁধ ভেঙে আমরা একাধিকবার বন্যার কবলে পড়ি। বিগত ৩৫-৪০ বছর ধরে এভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে স্থানীয়দের। বছর বছর আমরা বাঁধের স্থায়ী সমাধানের দাবি জানালেও পাউবো থেকে শুধু আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই মেলে না।”
বাঁধপাড়ের বাসিন্দা মমতাজ মিয়া বলেন, “টাকা নয়-ছয় করে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে বাঁধ সংস্কার করার কারণে বছরের পর বছর গ্রামবাসী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।”
ফেনী জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ও পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম শফিকুল ইসলাম মহিম বলেন, “প্রতিবছর একই স্থানে বাঁধ ভাঙে। তড়িঘড়ি করে পাউবো দরপত্র ছাড়া কোটেশানে বাঁধগুলো সংস্কার করে। পরে টেন্ডার দিয়ে টাকাগুলো হালাল করে। নদী থেকে বালু উত্তোলন করে সেই বালু দিয়ে দায়সারাভাবে বাঁধগুলো সংস্কার করে।
ফেনীতে মুহুরী নদীর তীর রক্ষা বাঁধে ভাঙন, ১০ গ্রাম প্লাবিত
ফেনীতে মুহুরীর পানি বিপৎসীমার উপরে, বাঁধের নতুন স্থানে ভাঙন
আরসিসি ব্লক কিংবা জিও ব্যাগ তো দূরের কথা মাটি দিয়েও বাঁধগুলো বাঁধা হয় না বলে অভিযোগ করেন এই আওয়ামী লীগ নেতা।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার দলীয় প্রভাবশালী একাধিক মহল অবৈধভাবে নদীর পাড় থেকে ড্রেজার দিয়ে সারা বছর বালু উত্তোলন করেছে। অপরিকল্পিতভাবে এই নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলেই বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সাহাব উদ্দিন নামে এক বাসিন্দা বলেন, চলতি বছর বাঁধের যে তিনটি স্থান ভেঙেছে তার মূল কারণ পাউবোর পক্ষ থেকে মুহুরী সেচ প্রকল্পের আওতায় সেচের জন্য প্রিপেইড স্কিমের ঘর আর জলাধার। বাঁধের পাশ ঘেঁষে বসানো হয়েছে এসব স্কিম।
“অপরিকল্পিতভাবে স্কিম বসানোর কারণে পাইপ বাঁধের নিচ থেকে বোরিং করে নেওয়া হয়েছে। সেই পাইপের বাইরের অংশ লিকেজ হয়েই বাঁধ ভাঙার কারণে পরিণত হয়েছে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মুহুরী নদীর তীর রক্ষা বাঁধ ভাঙার কারণে রোপা আমন ২৬০ একর, বীজতলা ২৫ একর, সরিষা ক্ষেত ২০ একর, ক্ষিরা ক্ষেত ২১ একর, শাকসবজি ৬৪ একর এবং ১০ একর জমির মুগডাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মানুষ বাঁধের স্থায়ী সমাধান চায় উল্লেখ করে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আলীম মজুমদার বলেন, “প্রতিবছর বন্যায় আমাদের অনেক ক্ষতি হয়। এ এলাকার মানুষ স্থায়ী সমাধানের জন্য নদী খনন ও সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগের মাধ্যমে টেকসই বাঁধ নির্মাণ চায়।”
অভিযোগ নিয়ে যা বলছে পাউবো
মুহুরী সেচ প্রকল্পের আওতায় প্রিপেইড স্কিমের ঘর আর জলাধারের কারণে বাঁধের ক্ষতি হচ্ছে- স্থানীয়দের এ অভিযোগের প্রসঙ্গে জানতে মুহুরী সেচ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের (আইএমইপি) উপ-মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মুঠোফোন সংযোগটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অপরদিকে স্থানীয়দের এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন পাউবো ফেনীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুর রহমান ভূঁইয়া।
ফেনীতে বন্যা: ফুলগাজীতে উন্নতি, পরশুরামে অবনতি
তিনি বলেন, “বাঁধের মেরামত কাজ দায়সারা ভাবে হয় না। যে পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া যায় সেই পরিমাণ কাজই হয়। বিগত সময় বাঁধের যতগুলো স্থান ভেঙেছে সেই স্থানগুলো মেরামত করার পরে আর কখনোই ভাঙেনি। প্রতিবছর নতুন নতুন অংশে ভাঙে।
তিনি আরও বলেন, “মুহুরী-কহুয়া-সিলোনিয়ার ১২২ কিলোমিটার বাঁধ বুয়েটের প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়। বাঁধের প্রায় ৭০ কিলোমিটার অংশ স্পর্শকাতর।
“বাঁধের যে জায়গাগুলোতে বাঁক আছে সেখানে সিসি ব্লক (প্রায় ৬০০ মিটার) দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া পুরো বাঁধ মাটি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণের সময় কোথাও জিও ব্যাগ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না।”
হবে নতুন টেকসই বাঁধ
পাউবোর ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) মো. রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, “ফুলগাজী-পরশুরামে বন্যা নিয়ন্ত্রণে টেকসই মুহুরী বাঁধ নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে পরামর্শক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছে।
“চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে পরামর্শকদের প্রতিবেদনের খসড়া পাওয়ার কথা রয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থ ও কর্মপরিকল্পনা নিশ্চিত হবে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, “সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৩১ কোটি টাকার টেকসই মুহুরী বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্মাণ কাজ শুরু হলে শেষ হতে চার থেকে পাঁচ বছরের সময় লাগবে। তখন হয়ত বন্যার সমস্যা থাকবে না।”