ফেনী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, বন্যার পানিতে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় ৩৭৫টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।
Published : 09 Aug 2023, 02:37 PM
ফেনীতে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি ফুলগাজীতে কিছুটা উন্নতি হলেও পরশুরাম উপজেলায় অবনতি হয়েছে। ফুলগাজীর কিছু গ্রাম থেকে পানি নামলেও পরশুরামে নতুন করে অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ফেনী-বিলোনিয়া সড়কে কোমর পানি থাকায় পরশুরামের সঙ্গে যান চলাচলও বন্ধ রয়েছে।
পানিবন্দি হয়ে আছে দুই উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। তিন দিনের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ সড়ক, মৎস্যখাত ও কৃষি।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, বুধবার সকালে মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ১৪১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দুপুরে যা ১৫৪ সেন্টিমিটারের নিচে নেমে এসেছে।
পানির চাপে সোমবার ও মঙ্গলবার বেড়িবাঁধের তিনটি স্থানে ভেঙে ফুলগাজী ও পরশুরামের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
বন্যার পানিতে প্রায় ৫০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের কৃষক আলাউদ্দিনের।
তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ড আর জনপ্রতিনিধিদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিবছর ঢল আইবো আর যাইবো, লাভ অইবো হেতেরগো। আন্ডা মইদ্দে হড়ি মরি যাইয়ের।” (প্রতি বছর বন্যা আসবে আর যাবে। লাভ হবে তাদের। আমরা মাঝখানে মরে যাচ্ছি।)
ফুলগাজীর মৎস্য চাষি সাহাব উদ্দিন জানান, তার নিজের দুটি পুকুরে চাষের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বানের পানিতে ভেসে গেছে।
তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “এক দিকে এত টাকার মাছ ভেসে গেছে অপর দিকে মাছের খাদ্যের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে এই ভেবে চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছি।”
ফুলগাজী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা উজ্জ্বল বণিক জানান, বন্যায় প্রায় ৫০ হেক্টর আয়তনের শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে চাষিদের ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বুধবার সকালে পরশুরামের উত্তর ধনিকুন্ডা থেকে ফুলগাজীর আনন্দপুর বোর্ড অফিসে যাচ্ছিলেন ষাটোর্ধ্ব মনোয়ারা বেগম। মূল সড়কে পানি জমে গাড়ি চলাচল না করায় তিনি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পানিতে হেঁটেছেন। কোমর পর্যন্ত ভেজা কাপড়ে তিনি সারাদিন কীভাবে থাকবেন এ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
পরশুরামের রাজেশপুরের বাসিন্দা ও ফেনী সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সুফি হায়াত মাহমুদ বলেন, “পরীক্ষার আর মাত্র ৭দিন বাকি। চারিদিকে থৈ-থৈ পানি। বৃহস্পতিবার কলেজে অ্যাডমিড কার্ড দিবে। পানি ভেঙে কীভাবে কার্ড সংগ্রহ করবো বুঝতে পারছি না।”
একই কথা জানিয়েছেন পরশুরামের আলাউদ্দিন নাসিম কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সাব্বির হোসেনও।
তিনি বলেন, “ঘরে পানি, রাস্তায় পানি। পরীক্ষার কোন প্রস্তুতিই নেওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ১৭ আগস্ট পরীক্ষা কেন্দ্রে কীভাবে যাব তাই নিয়ে চিন্তায় আছি।”
দুই উপজেলার স্থানীয়রা বলছেন, মুহুরী নদীতে স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করার কারণে প্রতিবছর এমন ক্ষতির মুখে পড়ছেন লক্ষাধিক বাসিন্দা।
তাদের সাথে একাত্মতা জানিয়ে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আলিম মজুমদার বলেন, “প্রতিবছর বন্যায় আমাদের অনেক ক্ষতি হয়। এ এলাকার মানুষ বন্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য মুহুরী নদী খনন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ চায়।”
ফেনী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. একরাম উদ্দিন বলেন, পাহাড়ি ঢলে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার অন্তত ৮২৫ হেক্টর আমনের জমি পানির নিচে তলিয়ে আছে৷ ১০ হেক্টর আমন বীজতলা ও ১৫ হেক্টর সবজি ক্ষেতও পানিতে নিমজ্জিত। সহসাই পানি না নামলে এসব জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ফেনী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, বন্যার পানিতে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় ৩৭৫টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষিদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে, মন্ত্রণালয় থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পেলে ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের প্রদান করা হবে বলে জানান তিনি।
ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া ভূঁইয়া ও পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা শমসাদ বেগম জানান, দুই উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজারেও বেশি মানুষ পানিবন্দি। বানভাসি মানুষদের জন্য শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে মানবিক দিক বিবেচনায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে জেলা পুলিশ৷ মঙ্গলবার বিকালে ফেনী পুলিশ সুপার জাকির হাসান তার পুলিশ সদস্যদের নিয়ে বন্যা দুর্গত এলাকা ঘুরে শতাধিক পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন।