ভাসানীর নামে চালু হল দ্বিতীয় তিস্তা সেতু
গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামবাসীর দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন দ্বিতীয় তিস্তা সেতু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামবাসীর দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন দ্বিতীয় তিস্তা সেতু চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে; যার নামকরণ করা হয়েছে ‘মওলানা ভাসানী সেতু’।
বুধবার বেলা সাড়ে ১২টায় অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সেতুটি উদ্বোধন করেন।
সেতুর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুরঘাট প্রবেশমুখে ফিতা কেটে সাধারণ জনগণ ও যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এ সময় সেতুতে উৎসুক জনতা ও যানবাহনের ভিড় দেখা যায়।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এর এশিয়া অপারেশনের ডাইরেক্টর জেনারেল সৌদ আইয়িদ আলশাম্মারি, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশীদ মিয়া, গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক চৌধুরী মোয়াজ্জম আহমদ, পুলিশ সুপার নিশাত এ্যঞ্জেলা এবং গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
সেতু উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। সকাল থেকে তিস্তার দুই পাড়ে ভিড় জমাতে থাকেন হাজার হাজার দর্শনার্থী। কেউ পরিবারের সঙ্গে, কেউবা দলবেঁধে ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের সাক্ষী হতে নদী তীরে ভিড় করেন। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে এই আনন্দে সবার চোখে-মুখে ছিল উচ্ছ্বাস।
পরে হরিপুরঘাট এলাকায় উদ্বোধন সভায় যোগ দেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এতে সভাপতিত্ব করেন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশীদ মিয়া। বক্তব্য দেন সেতু বাস্তবায়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল বারেক।
আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চাই, যে রাষ্ট্রে আর কখনও কোনো শাসক কোনো পরা শক্তির কাছে মাথা নত করবে না। যে রাষ্ট্রে প্রত্যেকটা মানুষ মাথা উঁচু করে নিজের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে যাবে।
“যে রাষ্ট্রে যখন ইচ্ছে হবে পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের ডুবিয়ে দেওয়া, যখন ইচ্ছে হবে বাঁধ আটকিয়ে দিয়ে আমাদের পানি শূন্যতা সৃষ্টি করার মতো অমানবিক কাজ কোনো সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দল মেনে নেবে না।”
সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের ঢাকার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের পথ সুগম হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এ অঞ্চলের মানুষের কৃষিজাত পণ্য বাজারজাত ও শিল্প-কলকারখানা প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া নদীর উভয় তীরে সংযোগসহ উন্নত সড়ক নেটওয়ার্ক এই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রসার ঘটবে।”
সেইসঙ্গে এলাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা।
গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী বলেন, সেতুটি গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুরঘাট এলাকায় নির্মিত হয়েছে। সেতুর অপর প্রান্তে কুড়িগ্রামের চিলমারী।
সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৯২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার (জিওবি) ২৬৯ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা, সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের (এসএফডি) ৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রধান ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেছে চীনের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিএসসিইসি)।
এক হাজার ৪৯০ মিটার দীর্ঘ ও ৯ দশমিক ৬ মিটার প্রস্থের পিসি গার্ডার এই সেতুটি দেশের ইতিহাসে এলজিইডির অন্যতম বড় প্রকল্প বলে জানান উজ্জ্বল চৌধুরী।
তিনি বলেন, সেতুর উভয়পাশে প্রায় তিন দশমিক পাঁচ কিলোমিটার নদী শাসন করা হয়েছে। এ ছাড়া সেতু ঘিরে উভয় পাশে ৮৬ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক এবং ৬৮টি কালভার্ট ও ১১টি ছোট সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।
সংযোগ সড়কটি কুড়িগ্রামের চিলমারী, সুন্দরগঞ্জের হরিপুর, পাঁচপীর, ধর্মপুর, গাইবান্ধার হাট লক্ষ্মীপুর, সাদুল্লাপুরের কামারপাড়া ও সাদুল্লাপুর হয়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ধাপেরহাটে গিয়ে শেষ হয়েছে। এই মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও কুড়িগ্রামের চিলমারী।
এতে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকার দূরত্ব কমে আসবে। তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সময় সাশ্রয় হবে। কেবল কুড়িগ্রাম নয়, উত্তরাঞ্চলের আরও কয়েকটি জেলার সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ সহজ হবে।
গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার মধ্যে সংযোগ সৃষ্টির লক্ষে ২০১৪ সালে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু প্রকল্পের অনুমোদন দেয় তৎকালীন সরকার। একই বছরের ২৫ জানুয়ারি সেতুর ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন করা হয়। ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০২১ সালে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কাজ শুরু করে।
আরও পড়ুন:
