ফেনীর এক উপজেলাতেই ‘৬৩ এসএসসির পরীক্ষার্থী’ বাল্যবিয়ের শিকার

অনেক অভিভাবক এলাকায় কিশোরীকে বিয়ে দিলে প্রশাসন বাধা দেয় বিধায় অন্য এলাকায় নিয়ে বিয়ে দিয়ে দেন।  

নাজমুল হক শামীমফেনী প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Sept 2022, 11:30 AM
Updated : 18 Sept 2022, 11:30 AM

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় `বাল্যবিবাহের শিকার ৬৩ ছাত্রী’ এবারের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় বসতে পারেনি। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থী ৪১ জন এবং দাখিল পরীক্ষার্থী ২২ জন।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিন বলেন, “চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় উপজেলার ২৪টি বিদ্যালয় থেকে তিন হাজার ২০৫ জন এবং ১৯টি মাদরাসা থেকে ৮৯৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেছিলো।”

“কিন্তু ৮১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এর মধ্যে ৬৩ জন ছাত্রী এবং ১৮ জন ছাত্র রয়েছে।”

উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কথা বলে জানা গেছে, যেসব ছাত্রী এবার পরীক্ষায় বসতে পারেনি তাদের অধিকাংশই বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। আবার অনেক বাল্যবিবাহের শিকার হয়েও শিক্ষকদের তদারকির কারণে পরীক্ষা দিচ্ছে। 

এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত ১৮ ছাত্রের মধ্যে অনেকেই বিদেশ চলে যাওয়াসহ পরিবারে প্রয়োজনে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়েছে বলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানায়, করোনাভাইরাসের মহামারীর সময় ছাত্রীদের বাল্যবিবাহের প্রবণতা অনেক বেশি ছিল। বিয়ের পিড়িতে বসা অধিকাংশ ছাত্রীর বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছর। অনেক অভিভাবক কিশোরীকে এলাকা বিয়ে দিলে প্রশাসন বাধা দেয় বিধায় অন্য এলাকায় নিয়ে বিয়ে দিয়ে দেন।  

আবার বাল্যবিবাহের শিকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারের দাবি, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, স্কুলে যেতে অনীহার কারণে তারা কিশোরীদের বিয়ে দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাল্যবিয়ের শিকার এক ছাত্রীর অভিভাবকরা বলেন, তিনি দরিদ্র মানুষ। পরিবার চলে খুব কষ্ট করে। হঠাৎ করে ভালো পাত্র পাওয়ায় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের পর মেয়ে পড়বে কি পড়বে না- সেটা স্বামীর বাড়ির লোকজনই ভাল বলতে পারবে।

সোনাগাজী বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান বলেন, গত বছর তার স্কুলের প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্রী বাল্যবিয়ে শিকার হয়েছিল। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ৮৩ জন। তারা পরীক্ষায়ও অংশ নেয়নি।

“তবে এবার মাত্র দুজন বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে পরীক্ষায় বসতে পারেনি। স্কুল থেকে সাধারণ ও ভোকেশনাল মিলিয়ে মোট ১৮৩ জন ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের বিয়ে হয়েছে। তবে আমাদের শিক্ষকরা বুঝিয়ে তাদের পরীক্ষায় বসিয়েছে।”

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন কার্যক্রম চলার সময় থেকেই পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়েছে, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, তারা আর পড়বে না। এখনও নতুন নতুন বাল্যবিবাহের ঘটনা জানতে পারছি। আসলে এসব বিয়ে খুব গোপনে হয়েছে। বেশিরভাগ বিয়ে অন্য এলাকায় নিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাল্যবিবাহ হওয়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছি।”

উপজেলায় মোট ৪৫টি মাধ্যমিক স্কুল ও দাখিল মাদ্রাসা আছে। এর মধ্যে সোনাগাজী ছাবের মোহাম্মদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, আনোয়ারা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, মঙ্গলকান্দি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, তাহেরা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাগাজী দাখিল মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রত্যেকের স্কুলেই এক থেকে দুজন করে ছাত্রী বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় বসেনি। 

সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মনজুরুল হক বলেন, “আমি উপজেলায় যোগদানের পর থেকে বেশ কয়েকটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছি। অভিনব পন্থায় বাল্যবিবাহ হচ্ছে, এটা ঠিক। তবে এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার্থী ছাড়া অন্য শ্রেণির ছাত্রীরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক