Published : 02 Mar 2026, 09:12 AM
এবারও নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি সুনামগঞ্জের হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ। ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সরকারি হিসাবে ৭৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
যদিও স্থানীয় হাওর আন্দোলনের সংগঠক ও কৃষকরা বলছেন, এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তারা বাঁধের কাজে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতির অভিযোগে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচিও পালন করেছেন।
২৭ ফেব্রুয়ারি বাঁধের কাজ পরিদর্শনে এসে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। অন্যদিকে কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় সময় বাড়ানোর জন্য ২৫ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো।
পাউবো কার্যালয় থেকে জানা গেছে, ২০১৭ সালে হাওরের বোরো ফসল সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়ার পর স্থানীয় কৃষকদের আন্দোলনের কারণে সরকার ঠিকাদারি প্রথা বিলোপ করে হাওরে কৃষকদের অংশগ্রহণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। জেলা কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক এবং সদস্যসচিব পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্পের সার্বিক দেখভাল করেন।
একইভাবে উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পাউবোর সাব স্টেশন অফিসার-এসও কমিটিতে থাকেন। তারাই পিআইসি গঠন, অনুমোদন দিয়ে থাকেন।

তবে নীতিমালা অনুযায়ী, প্রকৃত কৃষক এবং বাঁধের ঠিক পাশের জমির মালিককে পিআইসিতে রাখার নির্দেশনা থাকলেও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ সেটা মানছে না। প্রতি বছর একটি সুবিধাভোগী শ্রেণির কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তারা প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদন দেন বলে অভিযোগ করে আসছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা।
অনুমোদনকারীরা ব্যক্তিগত যোগাযোগ বাড়িয়ে প্রকল্পের বরাদ্দ বৃদ্ধি, অক্ষত প্রকল্পে বিপুল বরাদ্দ, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প করে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন এমন অভিযোগ রয়েছে।
২৭ ফেব্রুয়ারি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সামনেও ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনারথাল হাওরের বাঁধ পরিদর্শনের সময় সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল এই অভিযোগ করেন।
পাউবো জানিয়েছে, চলতি বোরো মৌসুমে হাওরে ৭১০টি প্রকল্প গ্রহণ করে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর থেকে কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ১৫ ডিসেম্বর নিয়মরক্ষার জন্য কাজের উদ্বোধন করলেও কাজ শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে এসে। এখনো কিছু প্রকল্পে কাজই শুরু হয়নি।
পিআইসি নিয়ে অনুমোদনকারীদের সঙ্গে দরকষাকষি ও কাঙ্ক্ষিত সুবিধালাভের আশায় পিআইসি গঠনে বিলম্ব হওয়ায় কাজেও বিলম্ব হয়েছে বলে মনে করেন কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা। তারা এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সম্প্রতি শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের উথারিয়া ও শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের কয়েকটি বাঁধ দেখতে গেলে স্থানীয়রা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য, উথারিয়া এলাকায় প্রায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে অক্ষত বাঁধে। পুরনো বাঁধগুলোর প্রায় ৮০ ভাগ অক্ষত থাকলেও সমান বরাদ্দ দিয়ে সরকারি অর্থ লুটের সুযোগ দিয়েছে উপজেলা কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি- এমন অভিযোগ আছে।
দিরাই ও শাল্লা উপজেলায় কিছু প্রকল্পে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার পছন্দের ব্যক্তিকে প্রকল্প দিতে প্রভাব খাটিয়েছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। উপজেলা ও জেলা কমিটিতে রাজনৈতিক দলের নেতাদের না রাখার নির্দেশনা থাকলেও সেটা মানা হয়নি।
শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের ৮৪, ৮৫, ৮৬, ৮৭, ১১৮, ১১৯, ১২২, ১৭১, ১৭০ প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, এখনো কাজ শেষ হয়নি। মাটির কাজই বাকি রয়ে গেছে। দুর্বাঘাস লাগানোও হচ্ছে না।
ছায়ার হাওরের ৩৩ নম্বর প্রকল্পের সদস্যসচিব বৃহষ্পতি দাসকে মৌরাপুরে পিআইসি দেওয়া হয়েছে। হাওরে তার কোনো জমি নেই। ৭০ নম্বর প্রকল্পের রাজেন্দ্র দাসেরও হাওরে জমি নেই। এই প্রকল্পের সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র দাসেরও হাওরে জমি নেই। এ ঘটনায় ৯ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে ছায়ার হাওরের মনুয়া গ্রামের কৃষক সুজন চৌধুরীকে ৫১ নম্বর প্রকল্পে মাত্র ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ এখানে কাজের পরিমাণ বেশি। কিন্তু একই এলাকায় অক্ষত আরেকটি বাঁধের ৫২ নম্বর প্রকল্পে প্রায় ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সুজন চৌধুরী বলেন, “আমার প্রকল্পটি বড়ো। কিন্তু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কম। আমি বিষয়টি বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেছি।”
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, “পিআইসির লোকজন টাকা পাচ্ছে না। তাই তাদের কাজে গতি কম। নির্বাচনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ব্যস্ত থাকায় এবং পরবর্তীতে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ায় বরাদ্দ ছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে। তবে আমরা পিআইসিদের ১০ মার্চের মধ্যেই বিল পরিশোধ করার নিশ্চয়তা দিয়ে তাদেরকে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছি।”
শাল্লা উপজেলা কৃষকদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মো. একরামুল হোসেন বলেন, “জেলা প্রশাসক বিএনপিকে বঞ্চিত করে অন্যান্য দলের পদবীধারীদের জেলা ও উপজেলা কমিটিতে নিয়েছেন। ফলে কমিটি গঠন ও পিআইসিতে পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে। আমাদের নেতা নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী নির্বাচনের দুইদিন আগে ডিসি সাহেবের এসব বিষয়ে ইসিতে লিখিত অভিযোগও করেছিলেন।”
হাওর, নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা সাংগঠনিকভাবে তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান, শনির হাওরসহ একাধিক হাওরের অন্তত ২০টি বাঁধ ঘুরে দেখেছি। বাঁধের কাজে নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করা, বরাদ্দে দুর্নীতি এবং পিআইসি গঠনেও দুর্নীতি হয়েছে। যার ফলে কাজে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এবার কাজে বিলম্ব হয়েছে। তাছাড়া অক্ষত ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে বিপুল বরাদ্দ দেওয়ায় সরকারি অর্থ লোপাটের চেষ্টা চলছে।”
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায় বলেন, “যে আশা নিয়ে কৃষকরা আন্দোলন করে পিআইসি এনেছিলেন সেই আশা পূরণ হয়নি। পিআইসি গঠন, কার্যক্রম বাস্তবায়নের নানা ধাপে নীতিমালা লঙ্ঘিত হচ্ছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছে পিআইসি অনুমোদনকারী ও বাস্তবায়নকারীরা। এবারও অক্ষত, অল্প ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে বিপুল বরাদ্দ দিয়ে মোটা অংকের টাকা লোপাট করা হচ্ছে। এ ছাড়া কাজও যথাযথ হচ্ছে না।
“আমাদের টিম সারাজেলা সরেজমিন ঘুরে বাঁধের কাজে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। আমরা তথ্যপ্রমাণ দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বললেও সংশ্লিষ্টরা উদাসীন। আমরা দুর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগে এবং যথাযথভাবে কাজ বাস্তবায়নের জন্য মানববন্ধন করেছি, স্মারকলিপি দিয়েছি। তারপরও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।”
পাউবো সুনামগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, “বাঁধের কাজ ৭৬ ভাগ শেষ হয়েছে। সময় বাড়ানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো ক্লোজারের ১৬ ভাগ কাজ বাকি আছে। কাজ যথাযথভাবে শেষ করতে পিআইসিসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার মোবাইলে ফোন করলে তিনি ধরেননি।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, “এখনো অনেক কাজ বাকি। এবার হাওরের ফসল ঝূঁকিতে আছে। কারণ আমরা অভিজ্ঞতায় দেখেছি, চার বছর পর পর দুর্যোগ আসে। তাই ভালো করে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ না হলে হাওরের ফসল ডুবে যাতে পারে। আমি সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ও যথাযথভাবে কাজ শেষ করতে নির্দেশনা দিয়েছি।”