Published : 27 Feb 2026, 10:14 PM
নরসিংদীতে ‘ধর্ষণের’ ঘটনা ধামাচাপা দিতে বাবার কাছ থেকে ‘ছিনিয়ে নিয়ে’ কিশোরীকে হত্যার ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি করেছে।
শুক্রবার পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
হত্যার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে মাধবদী ও নরসিংদী শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মামলায় যা বলা হয়েছে
মামলায় বাদী বলেছেন, তার কিশোরী মেয়ের সঙ্গে নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সূত্রেই তাকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে যেত নূরা। ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে ‘পরিবারের অগোচরে ফুসলিয়ে’ তার মেয়েকে মহিষাসুরা ইউনিয়নের কোতোয়ালিরচর হোসেন বাজারে চৈতি টেক্সটাইল মিলের পিছনে নিয়ে যায় আসামি। সেখানে আগে থেকেই আসামি এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), গাফফার (৩৭) সহ কয়েকজন ছিলেন। তারাই দলবেঁধে কিশোরীকে ধর্ষণ করেন। এবং ঘটনা কাউকে না জানানোর জন্য হুমকি দেয়।
কিশোরী বাড়ি ফিরে ঘটনাটি পরিবারকে জানায়নি। কিন্তু বাদী স্থানীয় একজনের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে মেয়েকে জিজ্ঞাস করেন। মেয়ে ঘটনা স্বীকার করলে, বাদী তখন বিষয় পুলিশকে জানানোর কথা ভাবেন।

তখন স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আহাম্মদ দেওয়ান বাড়ি এসে বাদীকে বলেন, বিষয়টি পুলিশকে জানানো যাবে না। তারাই এর বিচার করবেন বলে আশা দেন। কিন্তু আসামিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ধর্ষণের কোনো বিচার না করে তারা বাদীর পরিবারকে এলাকা ছেড়ে যেতে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
এতে বলা হয়, এরপরও তারা এলাকায় ছিলেন। এতে আসামিরা ক্ষুব্ধ হন। বাদী আতঙ্কের মধ্যে মেয়েকে তার বোনের বাসায় পাঠানোর চিন্তা করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বাদীর স্বামী কিশোরী মেয়েকে নিয়ে রওনা হন। কোতয়ালীরচর বড়ইতলার তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছালে নূরা নেতৃত্বে কয়েকজন তাদের পথরোধ করে। তখন নূরা বিয়ে করার কথা বলে কিশোরীকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। কিশোরীর বাবা প্রতিবাদ করলেও তারা শুনেনি। কিশোরীকে তারা মাঠের প্রান্তের দিকে নিয়ে যায়।
মেয়েটির সৎ বাবার ভাষ্য, পরে স্বজনরা অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও তাকে না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। বৃহস্পতিবার সকালে একটি সরিষা ক্ষেতে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় মেয়েটির লাশ পড়ে থাকতে দেখে থানায় খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে স্বজনরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে কিশোরীর মা বাদী হয়ে নয়জনকে আসামি করে মামলা করে। এর মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে মাধবদী থানা পুলিশ। তারা হলেন- মাধবদী থানার মহিষাশুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য আহম্মদ আলী দেওয়ান, তার ছেলে ইমরান দেওয়ান, প্রধান আসামি নূরার চাচাত ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব, একই এলাকার এবাদুল্লাহ এবং হোসেন বাজার এলাকার গাফফার।
মামলার বাকি চার আসামি হলেন- নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা, ইছহাক ওরফে ইছা, আবু তাহের এবং মো. আইয়ুব। আসামিরা সবাই কোতোয়ালীরচর এলাকার বাসিন্দা।
শুক্রবার বিকালে কিশোরীর মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। তার আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক এবং সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন।

‘বহিরাগত ইস্যু’
স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান আওয়ামী লীগের আমলেই সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এলাকায় বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এবং স্থানীয়ভাবে আহম্মদ আলীর প্রভাবও রয়েছে।
সেই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আহম্মদ আলী এবং তার ছেলেরা ঝুট ব্যবসা করতেন এবং জমি-জিরাতের ব্যাপারেও এলাকায় নানাভাবে হস্তক্ষেপ করতেন।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, যেহেতু এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে, ফলে এখানে প্রচুর বাইরের শ্রমিকও রয়েছে। নিজেদের প্রভাব দিয়ে পরিবারটি এসব শ্রমিকদের চাপে রাখার চেষ্টা করতেন। বহিরাগত শ্রমিকদের ফাঁদে ফেলে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে।
তারা বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা’ দিতে যে কিশোরীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তারাও এখানকার স্থানীয় নন। তাদের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায়। তারা কোতোয়ালীরচর এলাকায় একটি বাড়িতে ভাড়া থেকে শ্রমিকের কাজ করতেন। যেহেতু পরিবারটি বাইরের ফলে তাদের সহজেই এলাকা ছাড়ার হুমকি দিতে পারেন আহম্মদ আলী। স্থানীয়ভাবে যেহেতু পরিবারটির স্বজন নেই, ভয়ের কারণেই ‘প্রভাবশালী’ আহম্মেদ আলীর কথার বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় হয়ত তাদের ছিল না। ফলে তারা পুলিশের কাছেও যায়নি।
স্থানীয়রা মনে করেন, এভাবে হত্যার একটাই কারণ থাকতে পারে, আসামিরা হয়ত মনে করেছেন, কিশোরী বা তার পরিবার পুলিশের যেতে পারে। সেরকম কিছু হলে তারা ফেঁসে যাবেন। সেই ভয়েই হয়ত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

আহম্মদ আলী দেওয়ান ও তার ছেলে ইমরান দেওয়ান গ্রেপ্তারের পর পরিবারের বাকি সদস্যরাও কিছুটা গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। ফলে অভিযোগের ব্যাপারে এই পরিবারের কোনো সংগ্রহ করা যায়নি।
বিএনপি থেকে বহিষ্কার
মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
শুক্রবার সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সালেহ চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, আহম্মদ আলীর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার রাজনৈতিক কার্যকলাপ দলীয় গঠনতন্ত্র পরিপন্থি। তার কার্যকল্প দলীয় ভাব-মূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্নু করেছে।
তাই তাকে দলীয় প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব ধরনের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে।
আর পড়ুন:
'ধর্ষণ' ধামাচাপা দিতে হত্যা: 'কেউ ছাড় পাবে না', নরসিংদীতে ডিআইজি
নরসিংদীতে কিশোরীকে বাবার থেকে 'ছিনিয়ে' হত্যা, ১৫ দিন আগে 'ধর্ষণ'
'ধর্ষণের' শিকার কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে 'ছিনিয়ে হত্যা': গ্রেপ্তার ৪