Published : 23 Jun 2026, 08:01 PM
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে ক্যালকুলেটরে হিসাব করে ‘কমিশন বা ঘুষ আদায়ের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ প্রশাসন শাখার এক প্রজ্ঞাপনে পিআইও বাবুল চন্দ্র রায়কে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইন্দ্রজীত সাহা।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ২৪ জুনের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজড) হিসেবে গণ্য করা হবে।
এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাবুল চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দের বিপরীতে ১৫ শতাংশ কমিশন গ্রহণের অভিযোগ উঠে আসে।
ক্যালকুলেটরে হিসাব করে তার ঘুষ আদায় সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

৪ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র রায় নিজ কার্যালয়ে কয়েকজন প্রকল্প সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যের সঙ্গে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দের বিপরীতে ১৫ শতাংশ কমিশন নির্ধারণ সংক্রান্ত ‘দরদাম’ করছেন।
ভিডিওতে পিআইও বাবুল চন্দ্র রায়কে এক ইউপি সদস্যের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, “মেম্বার সাহেব আপনার ৮ টন গম না, ৪০ করে?” মেম্বার উত্তর দেন, “না স্যার ৩২ হাজার করে।”
তখন পিআইও ক্যালকুলেটর চেপে হিসাব কষে বলেন, “তাহলে ৩২ ইন্টু ৮, ২ লাখ ৫৬ হাজার; ইন্টু ১৫ পারসেন্ট যদি দেন, ৩৮ হাজার টাকা আসে।”
টাকা কমানোর আকুতি জানিয়ে ওই ইউপি সদস্য বলেন, “এতো স্যার! একটু কম করে নেন, কাজের তো লাভও হয়নি।”
জবাবে পিআইও হাসতে হাসতে বলেন, “মেম্বারদের কোনোদিন লাভ হয় না। আমি যে এতদিন পিআইও করতেছি, আমাকে কোনো মেম্বার বলে নাই আমার লাভ হইছে।”
একই ভিডিওতে অন্য ইউপি সদস্যর ১ লাখ ৬২ হাজার টাকার টিআর প্রকল্পের বিপরীতে ১৫ শতাংশ হারে ২৪ হাজার টাকা এবং আরেক ইউপি সদস্যর ১ লাখ ২০ হাজার টাকার প্রকল্পের বিপরীতে ১৮ হাজার টাকা কমিশন দাবি করতে দেখা যায় পিআইও-কে।
একপর্যায়ে এক মেম্বার টাকা গুনে ‘কমিশন পরিশোধ’ করলে পিআইও-কে হাসিমুখে বলতে শোনা যায়, “পিআইও অফিসটাতো আপনাদেরই।”
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে স্থানীয় জনগণ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র রায়। তার দাবি, সংশ্লিষ্টরা কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের চেষ্টা করছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটেই কথোপকথন হয়েছে, কমিশন গ্রহণের অভিযোগ সঠিক নয়।
এদিকে বাবুল চন্দ্র রায়কে প্রত্যাহারের আদেশ জারি হলেও অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের অগ্রগতি বা পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি। এ কারণে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেবীগঞ্জে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
দেবীগঞ্জের ইউএনও ইন্দ্রজীত সাহা বলেন, “পিআইওর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরপরই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিযোগের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় তাকে বদলির জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। মঙ্গলবার দুপুর ১টার সময় প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “অভিযুক্ত কর্মকর্তা এখনও তার বর্তমান কর্মস্থলেই রয়েছেন। বুধবার মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের টিম সরেজমিনে দেবীগঞ্জে এসে পুরো বিষয়টি তদন্ত করবেন।”