Published : 20 Jun 2026, 06:01 PM
উজানে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এরই মধ্যে নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরগুলোতে ঢলের পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ডালিয়া ডিভিশনের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, শনিবার নীলফামারীর ডিমলার ডালিয়ার পয়েন্টে সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১০ সেন্টিমিটার। যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক (গেজ পাঠক) নুরুল ইসলাম জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তার পানি ছিল ৫১ দশমিক ৯৫ সেন্টিমিটার। এ পয়েন্টে নদীর বিপদসীমা ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার।
“শনিবার সকাল ৬টায় তা ১৫ সেন্টিমিটার বেড়ে ৫২ দশমিক ১০ সেন্টিমিটারে পৌঁছায়। তবে সকাল ৯টায় পানি ৮ সেন্টিমিটার কমে ৫২ দশমিক শূন্য ২ সেন্টিমিটারে নেমে আসে। যা দুপুর ১২টায় একই ছিল। বিকাল ৩টায় পানি আরও দুই সেন্টিমিটার কমে এসে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার (৫২দশমিক ০০) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।”
অপরদিকে দুপুর ১২টায় তিস্তার পানির প্রবাহ একই থাকলেও দুধকুমার নদীর পানি দশমিক ৩০ সেন্টিমিটার ও ধরলা নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার (২৬ দশমিক ০৫) দুই দশমিক ২৩ (২৩.৮২) সেন্টিমিটার নিচে এবং দুধকুমার নদীর বিপদসীমার (২৯ দশমিক ০৬) ১ দশমিক ০৫ (২৮ দশমিক ০১) সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
তিস্তা নদীতে ‘কমলা সংকেত’
এদিকে শনিবার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দায়িত্বরত সহকারি প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার নদীসমূহের পানির সমতল বৃদ্ধি পয়েছে। যা আগামী তিন দিন আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এছাড়া আগামী ৭২ ঘণ্টায় এসব নদী নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলায় বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল এলাকায় সল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
তাই তিস্তা নদীতে ‘হলুদ সংকেত’ জারি করা হয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশের ডালিয়ার তিস্তা ব্যারেজের উজানের ৬৫ কিলোমিটার দূরে রয়েছে ভারতে গজলডোবা ও দোমোহনী তিস্তা নদীর পয়েন্ট। বাংলাদেশ অংশ তিস্তা অববাহিকায় বৃষ্টিপাত না হলেও শনিবারের আগের ২৪ ঘণ্টায় ভারতের তিস্তার মেখলীগঞ্জ পয়েন্টে ৮ দশমিক ৪ মিলিমিটার ও দোমোহনী পয়েন্টে ২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া বাংলাদেশে তিস্তার উজানে ভারতের জলপাইগুড়ি, আলিপুরদয়ার ও ডার্জিলিং জেলায় বৃদ্ধিপাতের ‘লাল সর্তকতা’ জারি করা হয়েছে।
শঙ্কায় চরের চাষিরা
এর আগে শুক্রবার দুপুরে ডালিয়া ব্যারাজ পরিদর্শন শেষে পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছিলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কারিগরি ও প্রশাসনিক কাজ এগিয়ে চলছে। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের পর প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপন করা হবে এবং নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কিন্তু আশ্বাসের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পানি বিপদসীমার এত কাছে চলে আসায় তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে নতুন করে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
টেপাখাড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ি এলাকার কৃষক হযরত আলী বলেন, তিস্তার তলদেশ পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। সামান্য পানি বাড়লেই চরে ঢুকে পড়ে।
“বাদাম, ভুট্টা ও শাকসবজির এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। পানি আর একটু বাড়লে সব তলিয়ে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি ঘোলা ও সাথে কচুরিপানা ভেসে আসছে।
ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, “তিস্তা নদীর পানি বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তবে এখনো চরাঞ্চলের বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেনি। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।”
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেছেন, “উজানের ঢলে পানি বাড়লেও বর্তমানে তা কমতে শুরু করেছে। তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটই খোলা রাখা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর বিভাগের তত্ত্বাধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ও নদীপাড়ে ভাঙ্গন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিস্তার পারে বন্যার শঙ্কা রয়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ধরলা নদ-নদীতে আপাতত বন্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই।