Published : 02 Sep 2024, 09:46 AM
“আন্দোলনে গিয়ে আমার ছেলেটা মারা গেলো। আমাদের একমাত্র সম্বল ছিলো সে। এখন যারাই দেশ চালাক তারা যেন আমাদের দিকে খেয়াল রাখেন।” কথাগুলো বলছিলেন পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া।
গত ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন হৃদয় গুলিবিদ্ধ হলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ছয়দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ২৩ জুলাই ভোর সাড়ে ৫টার হেরে যায় সে। ওই রাতেই মির্জাগঞ্জ উপজেলার ঘটকের আন্দুয়া নিজ গ্রামে হৃদয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়।
আরও পাঁচটা যুবকদের মতো জীবন নিয়ে বুকে অনেক স্বপ্ন লালন করেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (সম্মান) ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র হৃদয় তরুয়া। কিন্তু একটি বুলেটেই সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ২২ বছরের টগবগে এ যুবকের। সে আর কোনো দিনও ঘরে ফিরবে না বাবা-মায়ের স্নেহের টানে অথবা ক্লাসে সহপাঠীদের কোলাহলে।
ভবিষ্যতের আশার প্রদ্বীপ একমাত্র ছেলে সন্তানকে হারিয়ে তার স্মৃতি নিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন হৃদয়ের হত দরিদ্র বাবা-মা। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলও শুকিয়ে গেছে তাদের।
পেশায় কাঠমিস্ত্রি রতন চন্দ্র তরুয়া বলছিলেন, “হৃদয়কে নিয়েই ছিল আমার পরিবারের সব আশা-ভরসা। কিন্তু এখন সবকিছু চুরমার হয়ে গেছে। আমার সন্তানকে তো আর কেউ ফেরত দিতে পারবে না। কিন্তু এই কোটা আন্দোলনে যত মায়ের বুক খালি হয়েছে, তার সুষ্ঠু বিচার যেন হয়।”
হৃদয়ের মা অর্চণা রানী তরুয়া পেশায় গৃহপরিচারিকা। রতন-অর্চণা দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানদের ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করানোর জন্য এক যুগ আগে পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রাম ছেড়ে জেলা শহরের মুন্সেফপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন এ দম্পতি।
এরপর থেকে রতন কাঠমিস্ত্রির এবং অর্চণা বাসা-বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ শুরু করেন। দুজনের আয় দিয়ে খুব কষ্ট করে ছেলে-মেয়েকে পড়াশোনার খরচ চালাতে হতো তাদের। টানাটানির সংসারে এইচএসসি পাস করার পরই মেয়ে মিতু রানীকে বিয়ে দেওয়া হয়। একমাত্র ছেলে সন্তান হৃদয় লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকে সংসারের হাল ধরবে বলে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হৃদয় ২০১৮ সালে পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২০ সালে পটুয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে সুযোগ পায় সে। মেধাবী ছেলের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ ও ভালো রেজাল্ট থেকে স্বপ্ন বুনতে থাকেন বাবা-মা। আর কয়দিন পর হৃদয় পাস করে বের হলেই ভালো চাকরি করবে-সেই সুখ আর আনন্দ হাতছানি দিচ্ছিল তার পরিবারে। কিন্তু একটি গুলি নিমিষেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয় হতদরিদ্র এ পরিবারের।
অর্চণা রানী বলেন, “আমার হৃদয়ের একটাই স্বপ্ন ছিলো, সে কিভাবে আমাদের কষ্ট দূর করবে। তার লক্ষ্যই ছিলো পড়াশোনা করে ভালো চাকরি পেয়ে বাবা-মায়ের কষ্ট ঘোচাবে। ছেলেটা আমাদের আর তিনটা বছর কষ্ট করতে বলেছিল। তারপরই আমাদের নিয়ে ঢাকায় উঠবে বলেছিল।
“আমি বলতাম, বাবা পড়া শেষ করে চাকরি পেতে তো অনেক টাকা লাগবে তা পাবো কোথায়? তখন আমার হৃদয় বলেছিল, মা আমি কি সেই রকম পড়াশুনা করি যে, চাকরি পেতে টাকা লাগবে।?”
দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে অর্চণা বলেন, “ভগবান যে এভাবে পোলাডারে লইয়া যাইবে স্বপ্নেও ভাবিনি। যেসব মায়েরা আমার মত সন্তান হারিয়েছে, বর্তমান সরকার যেন আমাদের প্রতি সুদৃষ্টি রাখেন।”
নিহত শিক্ষার্থী হৃদয়ের একমাত্র বোন মিতু রানী বাবা-মায়ের কথা শুনে কাঁদছিলেন। তার কাছে ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে বলেন, “ভাই একেবারে চলে গেছে; আর তো ফিরে পাবো না। তার তো অনেক স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু সব স্বপ্ন তো পূরণ হয় না।
“যারা আমার ভাইকে হত্যা করলো তাদের আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু বিচার করা হোক, এটাই এখন আমাদের দাবি।”
হৃদয়ের সহপাঠী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসমিয়া হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “টিউশন থেকে বের হয়ে হৃদয় মিছিলে যোগ দিয়েছিল। মিছিলে যখন গুলি শুরু করে তখন মিছিল টার্ন করা শুরু করে। হৃদয় তখন মিছিলের পেছনে পড়ে গেছিল। এ সময় গুলিটা তার পেছন থেকে লেগে সামনে দিয়ে বের হয়ে যায়।”