Published : 01 Jun 2026, 08:49 AM
সবুজে ঘেরা সড়ক ধরে নিরিবিলি বিকালে খানিকটা সময় হাঁটতে ভালো লাগে বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাওয়াই মারমার। ব্যস্ততার কারণে সবদিন সে সুযোগ মেলে না। তবে ছুটির দিনগুলোতে হাঁটেন; শহর আর গাছগাছালি দেখেন।
কিন্তু রোয়াংছড়ি বাসস্টেশন পেরিয়ে একটু এগোলেই ‘একটা বদ হাওয়া’ নাকে ঝাপটা মারে। সেখানেই পাহাড়ের উপরে লেমুঝিড়ি আগা পাড়ায় থাকে শতাধিক মারমা পরিবার। তার পাশেই শহরের ময়লা ফেলার জায়গা। সেখান থেকেই দুর্গন্ধটা আসে।
বাওয়াই তখন দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে নাক-মুখ চেপে ধরেন। কিন্তু সামনে এগোলেই আবার আরেক উপদ্রব; ধোঁয়ার কুণ্ডলী এসে লাগে চোখে। জ্বালা করতে শুরু করে। বাওয়াই বুঝতে পারেন, আবর্জনার স্তূপে আগুন দিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
দুর্গন্ধ আর ধোঁয়া থেকে বাঁচতে তাড়াতাড়ি পা চালানোর চেষ্টা করেন বাওয়াই মারমা। কিন্তু সেটাও শ্লথ করে দেয় রাস্তায় উপরে এসে পড়া ময়লার স্তূপ আর নোংরা পানি।
প্রশান্তির জন্য হাঁটতে বেরিয়ে মনটাই বিষাদে ভরে যায় তার।

বওয়াই মারমা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বান্দরবান পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে এই ব্যস্ত সড়কের পাশে। দুর্গন্ধে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলাও দায়।
“লেমুঝিরি ময়লা-আবর্জনার পয়েন্টটা খুবই বিরক্তিকর। ময়লা দূরে ফেলার কথা। কিন্তু সবসময় দেখি ময়লাগুলো একদম সড়কে উপর পড়ে থাকে। যাওয়ার সময় নাক-মুখ চেপে পার হতে হয়।”
বাওয়াই মারমা একবার পার হলেই মনে হয় বেঁচে যান। কিন্তু এই ময়লার স্তূপের পাশেই বছরের পর বছর ধরে দুর্গন্ধ আর ধোঁয়ার উপদ্রবের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে শতাধিক মারমা পরিবারকে।
শুধু পৌরসভার নয়, হাসপাতালের বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে এখানে। সেই ময়লা সরাসরি গিয়ে মিশছে সাঙ্গু নদীতে। তাতে একদিকে নদীর দূষণের শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে নদীর পানি ব্যবহারে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন স্থানীয়রা।
বান্দরবান পৌরসভা গঠন করা হয় ১৯৮৪ সালে। শুরুর দিকে এটি তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত হলেও ২০০১ সালে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়।
কিন্তু এত বছর পরও সুষ্ঠু কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। পৌর বর্জ্য ব্যবস্থপানার সেবার মানে বান্দরবান এখনও ‘তৃতীয় শ্রেণির’ বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

আবর্জনাময় সড়ক
শহরের রোয়াংছড়ি বাসস্টেশনের সামান্য দূরে গেলে পাহাড়ে উপরে লেমুঝিড়ি আগা পাড়া। সেই পাড়া থেকে একটু সামনে গেলেই সড়কের পাশে পৌরসভার আবর্জনার ফেলার জায়গা।
সড়কের একপাশে মারমাদের পাড়া; আরেক পাশে সাঙ্গুী নদী। আর সেখানেই প্রতিদিন পৌরসভার ট্রাক ও ছোট ভ্যানে করে এনে শহরে যাবতীয় ময়লা-আর্বজনা ফেলা হচ্ছে।
রোয়াংছড়ি উপজেলা ও কালাঘাটা এলাকায় যেতে হয় এই পথ দিয়েই। প্রতিদিন শত শত মোটর সাইকেল, অটোরিকশা, বাসসহ অন্যান্য যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচল করে এই পথ ধরে।
লেমুঝিরি আগা পাড়ার বাসিন্দা মংচ মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাড়ার পাশেই পৗরসভার আবর্জনার স্তূপ। পচা-দুর্গন্ধে বাড়িতেই থাকা যায় না।
“এখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে অনেক বছর ধরে। একদিকে সেখান থেকে সারাদিন ধোঁয়া বের হয়। আরেক দিকে পচা-দুর্গন্ধ নাকে এসে লাগে।”
তিনি বলেন, “পৌর কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে জায়গা পরিবর্তন করার জন্য। কিন্তু কোনো পরিবর্তন নেই। এই রাস্তা দিয়ে পথচারী কম চলাচল করে। কিন্তু গাড়ি চলে অনেক। বিকালে অনেকে হাঁটতে বের হয়। এখানে তাদের নাক চেপে চলাচল করতে হয়। এই ভাগাড় এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া এখন খুবই প্রয়োজন।”
শহরে উজানি পাড়ার বাসিন্দা সাচশৈ মারমা বলেন, “আগে শহরে লোকজন কম ছিল। তখন এত এবড়োথেবড়ো অলিগলিও হয়নি। শহরে কিছু ময়লা-আর্বজনা রোয়াংছড়ি বাসস্টেশন পাহাড়ে উপর লেমুঝিরি পাড়ার সামনে গিয়ে ফেলা হত। ময়লা কম হওয়ায় এত তীব্র গন্ধও ছড়াত না। এখন তো এটা রীতিমতো শহর হয়ে গেছে।
“দিন দিন লোকজন বাড়ছে। ময়লা-আবর্জনাও বাড়ছে। সড়কের পাশে যখন ময়লা ফেলা হয়, সেটা যত্ন করেও ফেলা হয় না। কোনোরকমে গাড়ি থেকে ফেলে দিয়ে আসে। ফলে আর্বজনাগুলো যত্রতত্র সড়কের উপর ছড়িয়ে পড়ে।”
মো. জিসান নামে শহরে এক বাসিন্দা বলেন, “ময়লা-আবর্জনা ফেলার পাহাড়ে নিচের একপাশে রয়েছে সাঙ্গু নদী। কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে সাংসারিক কাজে নদীর পানি ব্যবহার করেন অনেকে। তাদের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে ওই আবর্জনা।”

বেকায়দায় মানুষ
শহরে নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণ ও বৈকালিক ভ্রমণে বের হন কিছু মানুষ। ট্রাফিক মোড় থেকে রোয়াংছড়ি বাস স্টেশনের উপরে ময়লা-আবর্জনা ফেলার এই সড়ক ধরে কালাঘাটা হয়ে আবার শহরে আসতে হয় তাদের।
আবার অনেকেই নিউ গুলশান ব্রিজ থেকে কালাঘাটা পার হয়ে ময়লা-আবর্জনার পথ ধরেই শহরে আসেন। দুর্গন্ধের কারণে অনেকে এই রাস্তা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচমং মারমা বলেন, “সাতসকালে বের হয়ে যদি ময়লা-আর্বজনার গন্ধ নাকে এসে লাগে, তাহলে তো ভাল লাগবে না। এজন্য আবর্জনার পয়েন্ট পর্যন্ত কেউ যায় না। কাছাকাছি গিয়ে ফিরে আসে।”
‘কুকুর-গরু এলোমেলো করে দেয়’
বড় ট্রাকে করে এখানে প্রতিদিন আবর্জনা ফেলতে আসেন পৌরসভার গাড়িচালক রফিক উদ্দিন। তিনি বলেন, দিনে কখনও তিনবার, কখনও চারবার করে ফেলতে হয়। কোনো কোনো ওয়ার্ডে ময়লা-আবর্জনা কম জমে। বড় ট্রাক লাগে না। তখন ছোট গাড়িতে করে নিয়ে আসা হয়।
“আমরা সড়কের পাশে নির্ধারিত জায়গায় ময়লা ফেলি। কিন্তু পরে কুকুর-গরু এসে এলোমেলো করে দেয়। তখন সড়কের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়।”
পৌরসভার ময়লা-আবর্জনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কনজারভেন্সি সুপারভাইজার দিদারুল হক চৌধুরী বলেন, পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মোট ১০২ জন লোকবল রয়েছে। তার মধ্যে ৬০ জন নারী ঝাড়ুদার এবং ৪২ জন পুরুষ ঝাড়ুদার। তবে আরও ২০ জনের মত নারী ঝাড়ুদার এবং ১৫ জনের মত পুরুষ ঝাড়ুদার দরকার।
“তিন বছর আগে এডিবি থেকে একটি প্রতিনিধি দল ডাম্পিং স্টেশনের জন্য পরিদর্শন করতে এসেছিল। এরপর থেকে আর কোনো খবর নেই। এগুলো কর্মকতারাই ভালো বলতে পারবেন।”

ভূমি জটিলতায় ‘ডাম্পিং স্টেশন’
স্থানীয়রা বলছেন, নদীর সম্পর্ক আছে এমন জায়গায় বর্জ্য ফেলা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা হতে পারে না। ময়লা-আবর্জনা নদীতে পড়ে; সেই দুষিত পানি ব্যবহারের ফলে মহামরী আকারে রোগ ছড়াতে পারে। আর দুর্গন্ধ বাতাসে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করছে।
তাদের দাবি, যত দ্রত সম্ভব ভূমি জটিলটা দূর করে এসব ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থান পৌর এলাকার বাইরে অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হবে। সেই জায়গা চারদিকে সীমানা দেয়ালে ঘিরে দিতে হবে, যাতে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে না যায়।
শহর থেকে দূরে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থান তৈরি করতে পারলে পরিবেশ নিরাপদ হবে এবং দূষণ থেকে রক্ষা পাবে নদী।
বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা করুণাময় কান্তি বড়ুয়া বলেন, “নথিপত্রে দেখলাম, বর্তমানে যেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে তার একটু দূরে প্রায় ৫ একরের মত জায়গায় একটা ‘ডাম্পিং স্টেশন’ করা হবে। যিনি পৌরসভার কাছে ভূমি হস্তান্তর করেছেন তার সঙ্গে কিছু লোকের জমি সংক্রান্ত সমস্যা আছে। মূলত ভূমি জটিলতার কারণে আটকে আছে। এ সমস্যা মিটে গেলে ময়লা-আবর্জনা ফেলার আর কোনো ঝামেলা থাকবে না।
“সড়কের পাশে যেদিকে সাঙ্গু নদী পড়েছে, সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা এমনিতে নিষেধ। তারপরও অনেকেই না জেনে ফেলে দিয়ে যায়। যার কারণে সাঙ্গু নদীর পাশে ময়লা-আবর্জনা না ফেলার জন্য এখন থেকে একটা সাইবোর্ড টাঙ্গানো হবে।”
পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও বান্দরবান সদর পৌর প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এখন একেবারেই শেষ পর্যায়ে। শুধু ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টা আছে। বাকি সব কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
“একটা ভালো প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন হতে সময় লাগে। বর্জ্য সমস্যা তো একদিনের না। একটু সময় দিতে হবে।”

তিনি বলেন, “‘ডাম্পিং স্টেশনের’ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। মেয়াদের মধ্যে শেষ করার টার্গেট রয়েছে। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির প্ল্যান্টও হবে। সেটা বালাঘটা এলাকার বাকীছড়ার মুখে হবে। বর্জ্য ও বিশুদ্ধ পানি–দুটো বিষয়েই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তর একসঙ্গে কাজ করবে।”
এস এম মনজুরুল হক বলেন, “এটা খুবই উন্নতমানের হবে। এখানে ময়লাকে রিসাইকেল করে ফুয়েল ও সার তৈরি করা হবে। একটু কষ্ট করতে হবে। পৌরবাসীকে আরেকটু ধৈর্য্য ধরতে হবে।”
তিনি বলেন, “বিকল্প ব্যবস্থা না করে ডাম্পিং স্টেশন হঠাৎ কোথায় নিয়ে যাব। আর ময়লা-আর্বজনা রাস্তার উপর যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেটা বলে দেওয়া হবে।”