২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ফাঁসিতে ঝুললেন কাজী আরেফের তিন খুনি

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাসদ নেতা কাজী আরেফ আহমেদ হত্যামামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত তিন আসামিকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে।

শিকদার খালিদ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Jan 2016, 10:45 AM

Updated : 11 Oct 2022, 07:32 PM

Image
কাজী আরেফ আহমেদের খুনিদের দণ্ড কার্যকরের আগে কড়া নিরাপত্তা যশোর কারাগারে
Image
কাজী আরেফ আহমেদ হত্যায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত তিনজন (বাঁ থেকে) সাফায়েত হোসেন হাবিব, আনোয়ার হোসেন ও রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু
Image
কাজী আরেফ আহমেদ
Image
দৌলতপুরের কালিদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯৯৯ সালে এই মাঠেই জনসভায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল কাজী আরেফ আহমেদকে
Image
কাজী আরেফ আহমেদের স্ত্রী রওশন জাহান সাথী
Image
কাজী আরেফ আহমেদ হত্যাকারীদের শাস্তি কার্যকরের দাবি জানিয়ে আসছিল বিভিন্ন সংগঠন

পুরানো খবর:

যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল কাজী আরেফকে

পুরানো খবর:

ফাঁসিতে সন্তোষ কাজী আরেফের স্ত্রীর, পলাতকদের নিয়ে প্রশ্ন

১৭ বছর আগের এই মামলায় চূড়ান্ত রায় শেষে আসামিদের রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে যশোর কারাগারে এই তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

দণ্ডিত তিনজন হলেন- কুষ্টিয়ার মীরপুর উপজেলার রাজনগর গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে সাফায়েত হোসেন হাবিব, কুর্শা গ্রামের উম্মতের ছেলে আনোয়ার হোসেন এবং আবুল হোসেনের ছেলে রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু।

কারা উপ-মহাপরিদর্শক টিপু সুলতান রাত সোয়া ১২টার দিকে টেলিফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

যশোর কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক শাহজাহান আহম্মেদ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড বৃহস্পতিবার রাতে কার্যকর হবে বলে আগেই সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন।

রাত ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, পুলিশ সুপারসহ কর্মকর্তারা কারাগারের ভেতরে ঢোকেন।

রাত ১২টার সময় তিনটি অ্যাম্বুলেন্স কারাগারের ভেতরে ঢুকলে বোঝা যাচ্ছিল যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

Image
মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত তিনজন (বাঁ থেকে) সাফায়েত হোসেন হাবিব, আনোয়ার হোসেন ও রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু

মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত তিনজন (বাঁ থেকে) সাফায়েত হোসেন হাবিব, আনোয়ার হোসেন ও রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু

রাত ১১টা ১ মিনিটে আনোয়ার ও হাবিবকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এর ৪৪ মিনিট পর ঝন্টুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় বলে কারা কর্মকর্তা শাহজাহান জানান।

আসামির স্বজনরা লাশ নেওয়ার জন্য আগে থেকেই কারাফটকে অবস্থান নিয়েছিলেন। শুক্রবার সকালে মিরপুর উপজেলার রাজনগরে হাবিব এবং চুয়াডাঙ্গার উজিরপুরে ঝন্টুর লাশ দাফন করা হয়।  আনোয়ারের দাফন হয় কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে।

চূড়ান্ত রায়ে আরও দুই আসামি ইলিয়াস হোসেন এবং মান্নান মোল্লারও মৃত্যুদণ্ড হয়। এর মধ্যে ইলিয়াস মারা গেছেন, মান্নান এখনও পলাতক।

দণ্ড কার্যকরের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কাজী আরেফের স্ত্রী রওশন জাহান সাথী সন্তোষ জানালেও পাঁচ আসামি এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

“এত বছর পর রায় কার্যকর হচ্ছে, এটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে পাঁচজন আসামি ১৭ বছর ধরে পলাতক রয়েছে। কিন্তু কেন?” বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন তিনি।

১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের কালিদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জনসভায় ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়েছিল জাসদের সাবেক সভাপতি কাজী আরেফকে। 

Image
এই মাঠেই জনসভায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল কাজী আরেফ আহমেদকে

এই মাঠেই জনসভায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল কাজী আরেফ আহমেদকে

চরমপন্থিদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে রক্তাক্ত ওই জনসভায় কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব আলী, স্থানীয় নেতা ইসরাইল হোসেন ও সমশের মণ্ডলও নিহত হন।

পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নুরুজ্জামান লাল্টু এই হামলার পরিকল্পনায় ছিলেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত লাল্টুও পরে নিহত হন।  

মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর নেতা কাজী আরেফ স্বাধীনতার পর জাসদ গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন, জাতীয় কৃষক লীগের সভাপতি ছিলেন তিনি।

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমানের আমলে আগের বৈরিতা ভুলে আওয়ামী লীগ-জাসদ ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কাজী আরেফের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

’৯০ এর দশকে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠিত হলে তাতে সক্রিয় ছিলেন তিনি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে জাসদের অংশগ্রহণেও কাজী আরেফের ভূমিকা ছিল। তার স্ত্রী রওশন নবম সংসদে আওয়ামী লীগ থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হয়েছিলেন। 

কারাফটকে কড়া নিরাপত্তা

আইনি সব বিষয় নিষ্পত্তি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার হাবিব, আনোয়ার ও ঝন্টুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ নেয় যশোর কারা কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা থেকে তানভীর হাসান রাজু ও হযরত আলী নামে দুই জল্লাদকে বুধবার রাতেই যশোর আনা হয়েছিল বলে কারা কর্মকর্তারা জানান।

ফাঁসিকাষ্ঠে নেওয়ার আগে কারাগার মসজিদের ইমাম মাওলানা রমজান আলী তিন আসামিকে গোসল করিয়ে তওবা পড়ান। তার আগে সিভিল সার্জন ডা. শাহাদৎ হোসেনের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল টিম আসামিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে।

জেলা প্রশাসক হুমায়ুন কবীর, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল হাসান, পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন ফাঁসি কার্যকরের সময়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি উৎসুক জনতার ভিড় ছিল কারা ফটকের সামনে। সেখানে ছিল কড়া নিরাপত্তা। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দারাও ছিলেন।

আসামি আনোয়ারের তিন স্বজন দুপুর থেকে কারাগারের সামনে অবস্থান করছিলেন। আনোয়ারের ভাগ্নে সোহেল জানান, বিকালে তার মামার সঙ্গে শেষ দেখা করে এসেছিলেন তিনিসহ অন্যরা।

আনোয়ারের ছেলে ডালিম এবং ভাই আবদুল হান্নানও কারাফটকে ছিলেন।

ঝন্টুর লাশ নিতে আসেন তার চাচাত ভাই আবুল কাশেম, ভাগ্নে খায়রুল ইসলাম ও প্রতিবেশী নজরুল ইসলাম। হাবিবের লাশ নিতে আসেন তার ছেলে মিঠুন মণ্ডল, ছোট ভাই হাসিবুর রহমান।

মামলার বৃত্তান্ত

কাজী আরেফসহ পাঁচজনকে হত্যার পরদিন দৌলতপুর থানার তৎকালীন এসআই মো. ইসহাক আলী বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।

আলোচিত এ মামলার রায়ে ২০০৪ সালের ৩০ অগাস্ট কুষ্টিয়া জেলা জজ আদালত ১০ জনের ফাঁসি এবং ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়।

Image
কাজী আরেফ আহমেদ হত্যাকারীদের শাস্তি কার্যকরের দাবি জানিয়ে আসছিল বিভিন্ন সংগঠন

কাজী আরেফ আহমেদ হত্যাকারীদের শাস্তি কার্যকরের দাবি জানিয়ে আসছিল বিভিন্ন সংগঠন

ওই রায়ে ইলিয়াস, রাশেদুল ইসলাম ওরফে ঝন্টু, সাফায়েত হোসেন (হাবিব), আনোয়ার হোসেন, সাহির হোসেন, মান্নান মোল্লা, বাকের, রওশন, জাহান ও জালালের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়।  

এছাড়া রাফাত ওরফে রাফা, গারেস, তাসিরুদ্দিন, আসগর জোয়ারদার, নজরুল ইসলাম, ওয়ালিউর রহমান, একুব্বার, টিক্কা ওরফে জাব্বার, লাবলু, ফিরোজ ওরফে ফরু, লাল্টু ওরফে নুরুজ্জামানকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের কয়েকজনের আপিলে হাই কোর্ট ২০০৮ সালের ৩১ অগাস্ট নয়জনের মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে রায় দেয়।

হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে ২০১১ সালের ৭ অগাস্ট সর্বোচ্চ আদালতের রায় আসে, যাতে পাঁচজনের ফাঁসি এবং সাতজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ওই রায় পর্যালোচনায় গ্রেপ্তার তিন আসামি আবেদন করলে গত নভেম্বরে তা খারিজ হয়ে যায়। 

[এই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হাসান আলী]