Published : 08 Jan 2016, 06:42 PM
পুরানো খবর:
ফাঁসিতে ঝুললেন কাজী আরেফের তিন খুনিওই হত্যামামলার চূড়ান্ত রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের ফাঁসির রায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করা হয়।
পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নুরুজ্জামান লাল্টুর বাহিনী ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্য মাঠে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল বলে মামলার এজাহারে বলা হয়েছিল।
কুষ্টিয়া জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং দৌলতপুর থানা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে তালবাড়িয়া গ্রামের শেষ প্রান্তে কালীদাসপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সেদিন সন্ত্রাসবিরোধী জনসভা ছিল জাসদের।
তৎকালীন সরকারের অংশীদার জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা কাজী আরেফ ছিলেন ওই জনসভার প্রধান অতিথি। জেলা নেতারাসহ স্থানীয় নেতারা ছিলেন বিকালের ওই জনসভায়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পাঁচজনের বক্তব্য শেষে ডায়াসে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন কাজী আরেফ। তিনি বক্তৃতার শুরুতেই বলেন, ‘সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে’।
ঠিক ওই সময় পূর্ব দিকের তালবাড়িয়া এলাকা থেকে সশস্ত্র ঘাতক দল অস্ত্র উঁচিয়ে সভা মঞ্চের দিকে আসে বলে জানান ওই সভা পরিচালনাকারী তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা খোরশেদ আলম।
তিনি বলেন, “১২/১৫ জন সশস্ত্র ক্যাডার সভামঞ্চ ঘিরে ফেলে। তাদের মধ্য থেকে সাত-আটজন অস্ত্র হাতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসে। তারা ছিল লাল্টু বাহিনীর সদস্য।”
তার মধ্যে রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু, আনোয়ার হোসেন, সাফায়েত হোসেন হাবিবকেও দেখার কথা জানান মামলার সাক্ষী খোরশেদ। এই তিনজনের মৃত্যুদণ্ডই বৃহস্পতিবার কার্যকর হয়েছে।
মামলার এজহারে বলা হয়, মাথায় লাল গামছা বাঁধা কিলিং মিশনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তি উচ্চস্বরে বলেন, ‘কেউ নড়াচড়া করবি না’। জননসভার সব মানুষ অস্ত্র দেখে ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মঞ্চে থাকা আড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আজিবর রহমান দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে বন্দুকধারীরা তাকে গুলি করে, তিনি এতে আহত হন।
ফাঁকা গুলিবর্ষণে আতঙ্ক সৃষ্টি করে হামলাকারীরা মঞ্চের কাছে গিয়ে সবার নাম জানতে চায় বলে মামলার সাক্ষীরা জানান।
তালবাড়িয়া গ্রামের শমসের মণ্ডল মঞ্চ থেকে চলে যেতে চাইলে প্রথমেই তাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর জাসদ নেতা লোকমান হোসেন, ইয়াকুব আলী ও ইসরাইল হোসেনকে হত্যা করা হয়।
কাজী আরেফ আহমেদ
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এসময় ডায়াসে দাঁড়ানো কাজী আরেফ অস্ত্রধারীদের বলছিলেন, ‘আমার লোকদের এভাবে হত্যা করো না। আমরা কী দোষ করেছি ? তোমরা বললে, আমরা না হয় এখানে রাজনীতি করব না। এভাবে মেরে কী লাভ তোমাদের?”
তখন অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি কাজী আরেফের কাছে গিয়ে বলেন, “তোর নাম কী?”
কাজী আরেফ নিজের নাম বললে ওই ব্যক্তি বলেন, “তোকেই তো খুঁজছি।”
এরপর অন্য দুজন গুলি চালালে মঞ্চের উপরেই রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন কাজী আরেফ।
ঝন্টুর জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা
এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছিলেন, কীভাবে কাজী আরেফকে হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার ১৪/১৫ দিন আগে চুয়াডাঙ্গা জেলার আঠারোখাদা গ্রামের একটি বাড়িতে একটি বৈঠক হয়, তাতে লান্টু, মান্নান মোল্লাসহ কয়েকজন ছিলেন ওই বৈঠকে।
মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত তিনজন (বাঁ থেকে) সাফায়েত হোসেন হাবিব, আনোয়ার হোসেন ও রাশেদুল ইসলাম ঝন্টু
মান্নান মোল্লারও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে এই হত্যামামলার চূড়ান্ত রায়ে। তবে তিনি এখনও পলাতক।
ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঝন্টু কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোলতাডাঙ্গা গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে লাল্টু বাহিনীর দুই সদস্য তার হাতে একটি চিরকুট ধরিয়ে দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। ওই চিঠিতে লেখা ছিল- “পত্রবাহকের সঙ্গে যাবেন এবং ছোট্ট একটা অপারেশন করে আসবেন।”
এরপর অন্যদের সঙ্গে নিয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকালে তালবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে উঠেন ঝন্টু। পরদিন বিকাল ৪টার দিকে কালিদাসপুরে জনসভা মাঠের উদ্দেশে রওনা হন বলে জানান ঝন্টু।
তিনি বলেন, তারা প্রথমে সভাস্থল লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছুড়লে অনেকে ভয়ে পালিয়ে যায়। এরপর তারা মঞ্চে উঠে কাজী আরেফসহ পাঁচজনকে হত্যা করে চুয়াডাঙ্গার আঠারোখাদা গ্রামে ফিরে যান।
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, কাজী আরেফ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে ঝন্টুর হাতে ছিল এসএমজি, আনোয়ারের হাতে ছিল কাটা রাইফেল, হাবিবের হাতে ছিল বন্দুক, নজরুলের হাতে ছিল বন্দুক, এলাচের হাতে ছিল পিস্তল, জাহান ও বাশারের হাতে ছিল রাইফেল।
হত্যার সময় তিনটি নাইন এমএম স্টেনগান, ১টি দোনলা বন্দুক, ৩টি কাটা রাইফেল, ১টি মাকফোর রাইফেল ও ২টি শাটার গানও ব্যবহার হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সভামঞ্চের অদূরে মান্নান মোল্লা ওয়াকিটকি ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন বলে নথিপত্রে দেখা যায়।