Published : 19 Dec 2025, 04:48 AM
“ও (শরীফ ওসমান বিন হাদি) শাহবাগের মোড়ে যা বলে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও একই কথা বলে। হাদি এমন একজন ব্যক্তি যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সম্পূর্ণটা দেশপ্রেম।”
এভাবেই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির দেশের প্রতি টানের কথা তুলে ধরেন তার বোনের স্বামী মনির হোসেন।
দৃঢ়তার সঙ্গে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরে দেশজুড়ে পরিচিতি পাওয়া ৩২ বছরের তরুণ এ সংগঠকের বিষয়ে শুধু পরিবারের এই সদস্য নন, ঝালকাঠি জেলার নলছিটি পৌর শহরের বাসিন্দারাও হাদির ভয়ডরবিহীন ভূমিকার জন্য পছন্দ করতেন।
চব্বিশের আন্দোলনের সময়ই শুধু নয়, ছোটবেলা থেকেই হাদি যেকোনো বিষয়ে অন্যায়ের বিষয়ে জোরালো প্রতিবাদ করতেন বলে তুলে ধরেন তার শিক্ষক, প্রতিবেশী ও এলাকার লোকজন।
নলছিটির পৌর শহরের বাসিন্দা শাহাদাত আলম ফকির বলেন, “হাদি আমাদের নলছিটির সন্তান। ৫ অগাস্টের পর থেকে সে দেশের জন্য লড়াই শুরু করেছিল; ন্যায় ও ইনসাফের প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছিল। দুর্নীতি-অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় কথা বলেছে হাদি।”
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হাদি নিজের এলাকা নলছিটি উপজেলার মানুষের কাছে প্রিয়মুখ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছেন।
উপজেলায় খাসমহল এলাকায় তার প্রতিবেশী ও স্বজনরা বলছেন, ভদ্র ব্যবহার ও পরোপকারী স্বভাবের কারণে তিনি পছন্দের মানুষ হয়ে ওঠেন।
রাশিদা বেগম নামে আরেক এলাকাবাসী বলেন, “খুব ভালো ছেলে ছিল। এমন কেউ নাই, যার জন্য তার চোখের পানি পড়েনি। তাকে যে গুলি করেছে, তার আমরা বিচার চাই।”
তিনি বলেন, “হাদি দালানে থাকে না, ভাঙা একটি টিনের ঘরে থাকত। চাইলে অনেক কিছু করতে পারত; কিন্তু করেনি। তাদের পরিবারের সবাই ভালো।”
২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাহসী ভূমিকার জন্য হাদি অনেকের কাছে বিশেষ পরিচিতি পান।
এরপর টকশো ছাড়াও ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যের কারণে তিনি আলোচিত হয়ে ওঠেন।
ইনকিলাব মঞ্চের এই আহ্বায়ক ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন জনসংযোগও।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ওসমান হাদির হাত ধরে গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। ‘সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ’ সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য।

ঝালকাঠির এনএস কামিল মাদ্রাসায় হাদির শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
ঝালকাঠির এনএস কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা গাজী মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, এই মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণি থেকে আলিম পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন হাদি। এখানে রয়েছে তার অসংখ্য স্মৃতি। ছাত্রজীবন থেকে ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। সুবক্তার পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন ছাত্রজীবন থেকেই।
সংগ্রামী জীবন
নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে শিক্ষাজীবনে হাদি এক সময় টিউশনি করেছেন।
পরে কোচিং সেন্টার সাইফুরসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতাও করেন। সবশেষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস এ তিনি শিক্ষকতা করছিলেন।
১৯৯৩ সালে জন্মগ্রহণকারী ওসমান হাদি তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। তার মাদ্রাসা শিক্ষক বাবা মারা গেছেন। বড় ভাই আবু বক্কর ছিদ্দিক বরিশাল গুঠিয়ার ঐতিহ্যবাহী শরফুদ্দীন আহম্মেদ সেন্টু প্রতিষ্ঠিত জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব। তার মেজ ভাই মাওলানা ওমর ফারুক ঢাকায় ব্যবসা করেন।
হাদি বরিশালের রহমতপুরে বিয়ে করেন। তার এক বছরের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে।
হাদিকে হত্যাচেষ্টার পর তার এক প্রতিবেশী নাছির খান বলেন, “হাদি ছোট থেকেই আমাদের এখানে বড় হয়েছে। কখনো আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেনি। ও এলাকায় আসলে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকত, সবার খোঁজ-খবর নিত। হাদি যে এত জনপ্রিয় তা আমরা কল্পনাও করিনি।”
ছোট-বড় সবার সঙ্গে হাদির সখ্যতা থাকার কথা তুলে ধরে স্থানীয় তরুণ রাকিব হোসেন বলেন, “হাদি ভাই এলাকায় এলে আমাদের সঙ্গে খেলাধুলা করতেন।
সব বয়সী এসব শুভাকাঙ্খীকে শোকে ভাসিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুর থেকে আসে তরুণ এ রাজনৈতিক সংগঠকের মৃত্যুর খবর।
চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে।
এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে রিকশায় করে যাওয়ার সময় ওসমান হাদির উপর আক্রমণ হয়। ওই সময় মোটরসাইকেলে করে এসে দুজন তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়।
পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে পরিবারের ইচ্ছায় তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার চিকিৎসা চলে।
পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সোমবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়।