Published : 22 Dec 2025, 11:08 AM
রংপুর জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিএনপির প্রার্থীরা দলের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে প্রচার করছেন। তবে দু-একটি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীকে দলীয় বিরোধিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
মনোনয়ন বঞ্চিত নেতারা শোভাযাত্রা, মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি ও প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও বিক্ষোভও হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিরোধিতার মুখে রয়েছেন রংপুর-২ ও রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী।
অপরদিকে প্রার্থীরা স্থানীয় বিভাজন ও চাপা উত্তেজনার মধ্যে ৩১ দফা বাস্তবায়ন, খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা ও ধানের শীষের জনসমর্থন বৃদ্ধির কর্মসূচি চালাচ্ছেন।

বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবীব দুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে মনোনয়ন ঘোষণা করা হয়েছে, তার পক্ষেই সবাই কাজ করছে। পরিবর্তন হবে কি-না তা নিয়ে কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি।
“বিএনপির নেতাকর্মীরা সবাই একসঙ্গে কাজ করবে এটাই আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।”
রংপুর-১:
গংগাচড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য তিন বারের নির্বাচিত আলম বিদিতর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোকারম হোসেন সুজনকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে দল।

মনোনয়ন নিয়ে এ আসনে দলীয় কোনো কোন্দল নেই বরং স্থানীয় নেতা-কর্মীরা সবাই সুজনের পক্ষে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
মোকারম হোসেন সুজন বলছেন, “দল যেহেতু আমাকে প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দিয়েছে, সেহেতু দলের সবাইকে নিয়ে কাজ করছি। নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছি; আমার এখানে কোনো সমস্যা নেই।”
গংগাচড়ার ভোটাররা তাকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠাবে বলে আশা প্রকাশ করেন সুজন।
রংপুর-২:
বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে।

এখানে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন মোহাম্মদ আলী সরকার। মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় ছিলেন বকুল সরকার, কমল লোহানী, আজিজুল হক ও শহিদুল মানিক চেয়ারম্যান।
মনোনয়ন ঘোষণার পর বঞ্চিত প্রার্থীর সমর্থকরা বিভিন্ন সময়ে উপজেলাজুড়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি করছেন। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার বিশাল কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ধানের শীষের পক্ষে প্রচার ও সভা-সমাবেশ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।
রংপুর-২ আসনের মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক বলেন, “তৃণমূল থেকে বিএনপি করি তাই মনোনয়ন পাওয়ার হকদার ছিলাম।
“যেহেতু আমাকে বিএনপি মনোনয়ন দেয় নাই সেহেতু মিছিল, মিটিং, সমাবেশ করেছে আমার সমথর্করা। তাদের জায়গা থেকে তারা করেছে।”
মনোনয়ন বঞ্চিত পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমল লোহানী বলেন, “আমি দলের কাছে মনোনয়ন চেয়েছিলাম, দল আমাকে দেয় নাই। যাকে যোগ্য মনে করেছেন তাকে দিয়েছে। তবে তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। দল যাকে নমিনেশন দিয়েছে, প্রার্থী ঘোষণা করেছে, সেও তো বিএনপি কর্মী। তিনিও ধানের শীষের কাজ করবেন, সেহেতু আমিও পক্ষে কাজ করছি।
“আমি পৌর বিএনপির সব নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় করেছি মোহাম্মদ আলী সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য। আমাদের কোনো দ্বিমত নেই।”
মোহাম্মদ আলী সরকার বলেন, “তারেক রহমান আমাকে যোগ্য মনে করেছেন; তাই আমাকে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী করেছেন। যারা এখনো মনোনয়ন পাওয়ার আসায় কাজ করছেন তারাও তো বিএনপি করে। দিন শেষে সবাই ধানের শীষের জন্য ভোট প্রার্থনা করছেন।”
বিপক্ষের সভা-সমাবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এক বাড়িতে চার ভাই থাকলে এক ভাইয়ের কোনো কারণে খারাপ হতে পারে এটা কোনো বিষয় না। কয়েকদিনের মধ্যে সব ঠিক হয়েছে যাবে।
“তারা আমার সাথি; আমার ভাই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।”
রংপুর-৩
সদরের এ আসনে বিএপির মনোনয়ন পেয়েছেন রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু।
মনোনয়ন প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করার পর সদরের এ আসনে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব মাহফুজ উন নবী ডন ও রিটা রহমানের সমর্থকরা মনোনয়নের দাবিতে বিভিন্ন সময় রাস্তায় নামেন। কেন্দ্রের ‘সুদৃষ্টির প্রত্যাশায়’ নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
মনোনয়ন না পাওয়া মাহফুজ উন নবী ডন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে দলের দায়িত্ব পালন করেছি; দলের জন্য কাজ করি। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী।

“দল প্রাথমিকভাবে একটা তালিকা প্রকাশ করলেও এটা চূড়ান্ত নয়। আমার মতো অন্য যারা প্রত্যাশী আছেন, দল তাদের সঙ্গে বসবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।”
চূড়ান্তভাবে দল যাকে মনোময়ন দেবে, তার সঙ্গে কাজ করবেন বলেও জানান মহানগর বিএনপির এ নেতা।
মাহফুজ উন নবী ডনের সমর্থকরা রোববার দুপুরে নগরবাসীর আয়োজনে নগরীর জিলা স্কুল মোড় থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে। শোভাযাত্রাটি টাউন হল চত্বর, পায়রা চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড় ও প্রেস ক্লাব এলাকা দিয়ে প্রদক্ষিণ করে শাপলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।
এ সময় শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রংপুর-৩ আসনে বিএনপির জনপ্রিয় তরুণ আইনজীবী ও দলের নিবেদিত প্রাণ মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব মাহফুজ উন নবী ডনকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে চুড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার দাবি তাদের। এখনো বিভিন্ন ওয়ার্ডে সমাবেশ করছেন তারা।
এদিকে রংপুরে রিটা রহমানকে নমিনেশনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করছেন তারা অনুসারীরা। রিটা রহমান সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলের মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মেয়ে।
৫ নভেম্বর দুপুরে নগরীতে মনোনয়ন বঞ্চিত রিটা রহমানকে বিএনপির মনোনয়নের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে বিএনপির একটি অংশ। বিক্ষোভ মিছিলটি টাউন হল চত্বর থেকে বের হয়ে নগরীর সিটি বাজার হয়ে পুনরায় সেখানে গিয়ে শেষ হয়।
বিক্ষোভ মিছিলের পর নগরীর রাধাবল্লভের নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে রিটা রহমান বলেন, “আমার থেকে যোগ্য কাউকে নমিনেশন দিলে আমি মেনে নিতাম। কিন্তু একজন চাঁদাবাজ, শহরের মানুষ যাকে চাঁদাবাজ হিসেবে চেনে তাকে মনোনয়ন দিলে তো আমি মেনে নিতে পারি না। তাই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাহেবকে অনুরোধ করব, মনোনয়নের ব্যাপারটা পুনরায় বিবেচনায় নিতে।”
তিনি বলেন, “এখনও সুযোগ রয়েছে। যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তা দলীয়ভাবে জানানো হয়েছে সম্ভাব্য তালিকা। এখনও পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।”
তবে মনোনয়ন পাওয়া মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু নিজেকে দলের ‘যোগ্য প্রার্থী’ হিসেবে দাবি করেছেন।
তিনি বলেছেন, “আমি দলের সব নেতা-কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। যারা মনোনয়ন পান নাই, আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তাদেরকে নিয়ে কাজ করবো।
“আমি মনে করি, দল যোগ্য মনে করেছে বলেই আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমিও বিএনপি করি, তারাও বিএনপি করে। সবাই আমরা জিয়ার সৈনিক। সব ভুলে গিয়ে ধানের শীষের পতাকাতলে এসে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাই।”
রংপুর-৪
কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন রংপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমদাদুল হক ভরসা। এ আসনে এনপির নেতাকর্মীরা তার পক্ষেই নির্বাচনের প্রচার চালাচ্ছেন।

এমদাদুল হক ভরসা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি দলের মনোনয়ন পেয়েছি। আমার দুই উপজেলার বিএনপিসহ সব অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগায়োগ করেছি; তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি।
“আমার আসনে সব বিএনপির নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে দলের স্বার্থে কাজ করছে। এখানে কারো সঙ্গে আমার দ্বিমত নেই। আমরা সবাই জিয়ার সৈনিক।”
তিনি বলেন, “দুই উপজেলার বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা আমার সঙ্গে আছেন। আমরা একসঙ্গে নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছি।”
রংপুর-৫
এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন গোলাম রব্বানি। এ আসনে তার বিরোধিতায় কাউকে মাঠে দেখা যায়নি। দলের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

গোলাম রব্বানি বলেন, “আমার ১৭টি ইউনিয়ান নিয়ে গঠিত মিঠাপুর উপজেলা আমার উপজেলায় কোনো দলের নেতাকর্মীর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য নেই। তারা দিনরাত আমার সঙ্গে ধানের শীষের মার্কার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।”
রংপুর-৬
পীরগঞ্জ উপজেলার এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া রংপুর জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলছেন, তার আসনে কোনো বিভেদ নেই।

তিনি বলেন, “পীরগঞ্জে দলের সব নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছে। এখানে কোনো ধরনের বিভেদ নেই। আমি সবাইকে নিয়ে ধানের শীষের নির্বাচনি প্রচার চালাছি।”