Published : 11 Mar 2026, 08:13 AM
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী এখন ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি। গাছে গাছে ভরে গেছে আমের মুকুল। গন্ধে মৌ মৌ করছে চারপাশ। মৌমাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে এক গাছ থেকে আরেক গাছে। এক মুকুল থেকে আরেক মুকুলে। সেই সঙ্গে ঘটছে পরাগায়ন।
স্বাভাবিকভাবে আমের ফুলে, মুকুলে বসে বিভিন্ন পোকামাকড়ও। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে প্রচুর বাণিজ্যিক আম বাগান। ভাল ফলনের আশায় মুকুলে পোকা দমনে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন কৃষকরা।
একবার নয়, ফল বাজারে না আসা পর্যন্ত কয়েকটি ধাপে করে ছিটাতে হয় এই কীটনাশক। ফলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে, পোকামাকড় দমনে মুকুলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার কি কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে?

বান্দরবান শহরে ও বাইরে বিভিন্ন এলাকায় গেলে দেখা যায়, পাহাড়ে রাস্তার ধারে সারি সারি বাগান। তার মধ্যে বেশির ভাগ আমের বাগান। বিশেষ করে মিয়ানমার প্রজাতির রাংগোয়ে আম বাগান। কিছু রয়েছে আম্রপালি ও অন্যান্য জাতের।
সব বাগান এখন মুকুলে ভরা। এ বছর মুকুল এসেছেও বেশি। পাহাড়ে উপর থেকে দেখলে মনে হয় যেন শ্বেতশুভ্র জাতীয় কোনো ফুল। কিন্তু রাস্তার ধারে হেঁটে গেলে ছিটানো কীটনাশকের বিদঘুটের গন্ধ নাকে এসে লাগে। মুকুল আসার সময় পোকামাকড় দমনে কীটনাশক ছিটিয়ে থাকেন বলে জানান কৃষকরা।
তারা বলছেন, মুকুল আসার পর ফল বড় না হওয়া পর্যন্ত কীটনাশক ছিটানোর প্রয়োজন পড়ে। অনেকে মুকুল আসার আগেও কীটনাশক স্প্রে করে থাকে। বিশেষ করে পরিচর্যা যা করতে হয় মুকুল আসার সময় করতে হয়। তার উপর নির্ভর করবে বাগানের ফলন কেমন হবে।

‘চোখে কম দেখা’
বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী রেংতং ম্রো। ১৫ বছর ধরে আম বাগান করছেন তিনি। চিম্বুক পাহাড়ে তার ৪০০টি রাংগোয়ে প্রজাতির আম গাছের বাগান রয়েছে। প্রত্যেক বছর বাগানে মুকুল আসার আগে থেকেই কীটনাশক স্প্রে করে আসছেন তিনি। তিন বছর হয়েছে এখন চোখে কম দেখেন তিনি। তার ধারণা, বাগানে নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করার কারণে এটি হয়েছে।
রেংতং ম্রো বলেন, “এ বছর অতিরিক্ত মুকুল ধরেছে। মুকুল আসার আগে থেকে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। ফল মার্বেল সাইজ না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে পাঁচবারে মত কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। মুখে কাপড় বেঁধে স্প্রে করি। কখনও হেলমেট পড়েও করা হয়। হেলমেট পড়লে সবচেয়ে নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত গরম লাগে। নিচে থেকে উপরে দিকে যখন গাছে স্প্রে করি তখন আবার কীটনাশক নিচের দিকে এসে ছড়িয়ে পড়ে। হালকা হলেও চোখে-মুখে এসে লাগে। এভাবে দিনের পর স্প্রে করে বাগানের পরিচর্যা করে থাকি।
“আমার মনে হয়, বছরের পর বছর বাগানে কীটনাশকে স্প্রে করার কারণে চোখে কম দেখতে পাই। অন্য কোনো কারণে নয় বলে আমার ধারণা। বাগানে একবার স্প্রে করলে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। স্প্রে করার জন্য কীটনাশকে অকটেনও মেশাতে হয়। সাত লিটারের মত অকটেন লাগে। এ পর্যন্ত তিনবার স্প্রে করা হয়েছে। আরও দুইবারের মত করতে হবে। স্প্রে করলে যে কোনো পোকামাকড় সরাসরি মারা যায়।”

নিজেকে সুরক্ষা করে কীটনাশক ব্যবহার
আম বাগানে ক্ষতিকর পোকাদমনে র্দীর্ঘদিন কীটনাশক স্প্রে করলেও নিজেদের সুরক্ষা করে কীটনাশক ব্যবহার করে আসছেন। ফলে তারা এখনও পর্যন্ত কোনো শারীরিক সমস্যায় পড়েননি বলে জানান দুই আমচাষি।
সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নের লাইমি পাড়ার আমচাষি হাউলিয়ান বম বলেন, তিনি ১৫ বছর ধরে আম বাগান করে আসছেন। এ বছর এখন পর্যন্ত একবার মাত্র কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে। আরও দুইবারের মত করতে হবে। প্রতিবারই মুখে মাস্ক ও ফুল হাতা শার্ট পড়ে স্প্রে করা হয়। করার পর ভাল করে ধুয়ে ফেলা হয়। কীটনাশক ব্যবহার কারণে কখনও কোনো শারীরিক সমস্যা হয়নি।
একই পাড়ার বাসিন্দা সাপদো বম বলেন, তার ৩০০টি আমের গাছ রয়েছে। তিনি ২০ বছর ধরে আম বাগান করে আসছেন। শুরুর দিকে কীটনাশক স্প্রে করা হত না। এখন ব্যবহার করতে হয়। এ বছর এখনও পর্যন্ত দুইবার কীটনাশক ছিটানো হয়েছে। ফল আসার পর মটরদানা সাইজে একবার এবং মার্বেল সাইজ হলে আরও একবার কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। মাস্ক এবং চশমা পড়ে স্প্রে করা হয়। এখনও পর্যন্ত শারীরিক কোনো সমস্যায় পড়েননি তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) দীলিপ চৌধুরী বলেন, “আমের মুকুলে স্প্রে করার সঙ্গে কীটনাশক কুয়াশার মত ছড়িয়ে পড়ে। তখন কৃষকদের সরাসরি গায়ে লাগে। শারীরিক ক্ষতি তাৎক্ষণিক বোঝা যাবে না। এটা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে। তবে মুখে মাস্ক অথবা কাপড় পড়ে করা হলে তারা নিরাপদ থাকবে।”

কীটনাশকের বিকল্প ধোঁয়া!
অনেক কৃষক পোকা দমনে কীটনাশকের বদলে ধোঁয়া ব্যবহার করে আসছেন। বাগানে পড়ে থাকা শুকনা লতাপাতা সংগ্রহ করে একটা ড্রামে জড়ো করা হয়। পরে আগুন লাগিয়ে গাছের নিচে ধোঁয়া ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে কীটনাশক না ছিটিয়ে পোকা দমনে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছেন বলে জানালেন এসানু মারমা নামে রোয়াংছড়ি উপজেলার এক কৃষক।
এসানু মারমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মূলত ঘরে খাওয়ার জন্য ২০০টা আম্রপালি আমের চারা লাগিয়েছিলাম। যেহেতু বাণিজ্যিক নয় ঘরে খাওয়ার জন্য সে কারণে কখনও কীটনাশক ছিটানো হয় না। ক্ষতিকর পোকাগুলো ধোঁয়া দিয়ে তাড়ানো হয়।
“২০১৬ সাল থেকে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছি। হপার নামে একটা পোকা থাকে। মুকুলের কাণ্ডে বসে রস খেয়ে ফেলে। তখন মুকুলগুলো ঝরে যায়। মূলত এই পোকা দমনে কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়।”

তিনি বলেন, “কিন্তু কীটনাশক তো সবসময় ক্ষতিকর। প্রথমে বাগানে যে কীটনাশক স্প্রে করবে সরাসরি তার ক্ষতি হবে। এরপরে যারা সেই ফল খাবে তাদের। কীটনাশক ব্যবহারের কারণে কৃষকরা নানাভাবে রোগাক্রান্ত হয়। অনেকে অসচেতনতার কারণে এগুলো আমলে নেয় না। তবে যারা বাণিজ্যিক বাগান করে তাদের ধোঁয়া ব্যবহার না করার একটা কারণ হল ফলের রঙ। ধোঁয়া ব্যবহার করলে ফল ধরার পর কালো হয়। তখন হয়ত ক্রেতারা আকৃষ্ট হয় না। কিন্তু ফলের সাইজ ও স্বাদের কোনো তারতম্য নেই। সবকিছু একই রকম থাকে।”
এসানু মারমা বলেন, “এ বছর আবহাওয়া ভাল। মুকুলও কম ঝরে। সুযোগ পেলে দিনে দুইবার করে ধোঁয়া দিয়ে থাকি। এটা যেহেতু বিষাক্ত কিছু না। ধোঁয়ায় কারণে পোকাগুলো চলে যায়। ধোঁয়া সকালবেলায় দেওয়া হলে ভাল হয়। তখন বাতাস থাকে না। বাগানে সব জায়গা ছড়িয়ে থাকে। আমের মুকুলগুলো এমনিতে ঘন হয়। একটার সঙ্গে একটা লেগে থাকে। পরে বাতাসে বাতাসে পরাগাায়ন ঘটে।”

মুকুলে কীটনাশক ব্যবহারে ক্ষতি নেই
আমের বাগানে মুকুলের সময় কীটনাশক ব্যবহারে তেমন ক্ষতি নেই। তবে কৃষকদের সুরক্ষা করে স্প্রে করতে হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগ।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, “এ বছর আমের প্রচুর মুকুল এসেছে। আম ফলনের ক্ষেত্রে এক বছর ভাল হলে পরের বছর ভাল হবে না। আবার এক বছর খারাপ হলে পরের বছর ভাল হবে। মুকুল যত আসুক প্রাকৃতিকভাবে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ঝরে যাবে। মুকুলের সময় পোকা এবং রোগ দমনে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। মুকুলের সময় কীটনাশক ছিটানোতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তবে কৃষকদের নিজেকে সুরক্ষা করেই করতে হবে।

“আমের ক্ষেত্রে ফল না ধরা পর্যন্ত তিনবারের মত কীটনাশক স্প্রে করার নিয়ম রয়েছে। স্প্রে করার কিছু নিয়মও আছে। কৃষকদের চোখে চশমা ও ফুল হাতা শার্ট পড়তে হবে। হাতে গ্লাভস থাকতে হবে। পায়েও জুতা ব্যবহার করতে হবে। স্প্রে করার পর কোনো খোলা পুকুরে বা ঝিরিতে না ধুয়ে আলাদা জায়গায় নিয়ে পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।”
কৃষি বিভাগের মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ১০ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ২১ হাজার ৮০৮ টন। এবার ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।