আলোয় ফেরানোর ভাসমান স্কুল এখন ডাঙ্গায়

ডাঙায় উঠার পর সেখানকার মানুষের সঙ্গে মান্তা শিশুদের ‘বৈষম্য দূর’ হলেও তারা আগের মত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে।

সঞ্জয় কুমার দাসপটুয়াখালী প্রতিনিধি . বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 Feb 2024, 04:34 AM
Updated : 12 Feb 2024, 04:34 AM

যাযাবর মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুদের নিরক্ষরতা মুক্ত করতে পটুয়াখালীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ এলাকার ভাসমান ‘বোট স্কুলটি’ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন তাদের পড়াশোনা চলছে ডাঙ্গায় নির্মিত একটি বিদ্যালয়ে। 

রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ ইউনিয়নে ২০১৯ সালে বেসরকারি সংস্থা ‘জাগো নারীর’ উদ্যোগে জলেভাসা মান্তা সম্প্রদায় শিশুদের জন্য প্রথমবারের মতো চালু হয়েছিল প্রাক-প্রাথমিক ভাসমান ‘শিশু বাগান বোট স্কুল’।  

ভাসমান প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ডিসেম্বরে একতলা লঞ্চ আকৃতির ভাসমান স্কুলটি ওই 

সংস্থার উদ্যোগে বরগুনায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানেই নদীর চরে মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য সাইক্লোন শেল্টার কাম বিদ্যালয় নির্মাণ করে দেয় জাগো নারী। 

নতুন বিদ্যালয়ের নাম রাখা হয়েছে ‘শিশু বাগান স্কুল’। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেখানে পাঠদানও শুরু হয়।

ডাঙ্গায় ঠিকানা নেই, তাই নদী আর নৌকাতেই জীবন কাটে মান্তা সম্প্রদায়ের। যুগ যুগ ধরে এ সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ছোট ডিঙি নৌকায় করে পটুয়াখালীর সাগর উপকূলের বিভিন্ন নদ-নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। 

এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে নৌকায় পরিবার নিয়ে ঘুরেন তারা। এমনকি এ সম্প্রদায়ের কেউ মারা গেলে মরদেহ নদীর চরে কবর দেওয়া হয়। স্থানীয় লোকজন আপত্তি তুললে ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদীতে। মান্তা শিশুরাও মা-বাবার সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই মাছ ধরে। সব মিলিয়ে লেখাপড়ার সুযোগ না থাকায় এরা নিরক্ষরই থাকে। 

এদিকে ডাঙার ওঠার পর সেখানকার মানুষের সঙ্গে মান্তা শিশুদের ‘বৈষম্য দূর’ হলেও তারা আগের মত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে বলে ভাসমান স্কুলের শিক্ষক মো. আইয়ুব খান জানান। তিনি এখন নতুন স্কুলেরও শিক্ষক। 

আইয়ুব জানান, মান্তা সম্প্রদায়ের কাছে শিক্ষা শুধুই স্বপ্ন ছিল। ২০১৯ সালের জুন মাসে বেসরকারি সংস্থা ‘জাগো নারীর’ উদ্যোগে মুসলিম চ্যারিটির অর্থায়নে এ সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য ‘এডুকেশন ফর ইনক্লুশন অফ মান্তা কমিউনিটি-ইআইএমসি’ চার বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭৫ ফুট লম্বা ও ১৮ ফুট প্রশস্ত স্টিলের একটি ভাসমান নৌকা নির্মাণ করে স্কুল স্থাপন করা হয়। 

এর ফলে মান্তা শিশুদের জীবনে শিক্ষার ছোঁয়া লাগে। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের লেখাপড়ার সুযোগ পেয়ে অনেক শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়েও গেছে। ফলে তাদের জীবনে এসেছে পরিবর্তন। 

আইয়ুব বলেন, “ভাসমান স্কুলের প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একই সংস্থার নির্মিত স্কুলে ডাঙ্গায় লেখাপড়া করার সুযোগ পায় এই শিশুরা। ভাসমান স্কুল ছেড়ে ডাঙ্গায় লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়ে মান্তা শিশুরা আনন্দিত। এখানে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে; চলে নাচ-গান, আবৃত্তিও। নতুন বিদ্যালয়ে শিশুদের মানসিক বিকাশে করা হয়েছে খেলনা পার্ক। 

“কিন্তু ভাসমান স্কুলটি নিয়ে যাওয়ার পর থেকে শিশুদের এখানে শুধু পড়াশোনাই করানো হয়। তাদের সেই আগের সুবিধার কিছুই পাচ্ছে না; কারণ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ। এমনকি আমরা দুজন শিক্ষক বেতনও পাই না।” 

স্কুলের শিক্ষার্থীদের সরকারিভাবে বই দেওয়া হলেও বাদবাকি খরচা শিশুদের অভিভাবকদের চালাতে হয়। অভিভাবকদের অনেকের ব্যয় মেটাতে কষ্ট হচ্ছে বলেও জানান আইয়ুব খান। 

ভাসমান বোট স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগী সংস্থা ‘জাগো নারী’র পরিচালক ডিউক ইবনে আমিন বলেন, “মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য ২০১৯ সালের জুনে চালু করা হয়েছিল উপকূলের একমাত্র ভাসমান বোট স্কুল। এর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। প্রকল্পটির মাধ্যমে শিশুদের স্কুলগামী করার অভ্যাস করা হয়েছে। 

“তবে স্কুলটির শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা এখানে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। পাশের চরেই তাদের জন্য সাইক্লোন সেল্টার কাম বিদ্যালয় বানিয়ে করে জানুয়ারিতে পড়াশুনা শুরু করা হয়েছে। দ্বিতল ওই ভবনে রয়েছে মসজিদ। আছে সুপেয় পানির ব্যবস্থা টিউবওয়েল। পাশেই করা হয়েছে শিশুদের জন্য খেলনা পার্ক।” 

একতলা লঞ্চ আকৃতির সেই ভাসমান স্কুলটি ‘জাগো নারী’র তত্ত্বাবধানে বরগুনায় নিয়ে যাওয়ার সময় বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর তীরে এসে অঝোরে কেঁদেছিল স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে রাজিয়া, মিম, ছখিনা, সায়েম, শাহিদা, দ্বীন ইসলাম, রহমান, খুকুমণি, শেফালী, মর্জিনা ও আমেনাসহ স্কুলটির অর্ধশত শিক্ষার্থী ছিল বলে জানান শিক্ষক আইয়ুব জানান।  

নূরজাহান বেগম নামের এক অভিভাবক বলেন, “আমরা তো শিক্ষার আলো পাই নাই। ভাসমান স্কুলের সুবাদে আমাদের ছেলে-মেয়েরা কিছুটা হলেও সেই সুযোগ পেয়েছে। ভাসমান স্কুলটি চলে গেছে। কিন্তু আমাদের ছেলে- মেয়েরা ডাঙ্গায় নির্মিত স্কুলে পড়ালেখা করে আরও আনন্দিত। 

“কিন্তু এটাও সত্যি যে, আগে যে সুবিধা দেওয়া হত সেটা বর্তমানে পায় না শিশুরা। এটি দ্রুত চালু না করলে আমাদের পক্ষে চালানোর সাধ্য নেই।” 

অভিভাবক আজমত হোসেন বলেন, “আমাদের শিশুরা চার বছর ভাসমান স্কুলে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। বর্তমানে তাদের জন্য ডাঙ্গায় স্কুল চালু করায় শিশুদের মত আমরাও আনন্দিত। কিন্তু আগে বই, খাতা, কলম ও দুপুরের খাবার দেওয়া হত সেটা শিশুরা পায় না।” 

আরেক অভিভাবক লিপি বেগম বলেন, “আমাদের জীবন অন্ধকারেই ছিল। এখন আমাদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নতুন করে পাকাপোক্ত হল।” 

ভাসমান স্কুলে শিশুদের টিফিন সরবরাহ করা হলেও এখন সে সুযোগ মিলছে না বলে জানান শিক্ষিকা নাজমুন্নাহার। তিনি বলেন, “এখন বাচ্চারা বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসে।” 

ভাসমান স্কুলের প্রকল্পের মোট খরচ ৬০ লাখ টাকা ছিল বলে প্রকল্প সমন্বয়কারী ফজলুল করিম জানান। যার মধ্যে শিক্ষকদের বেতন এবং বই, স্টেশনারি, ব্যাগ, টিফিন বক্স, ম্যাট এবং লাইফ জ্যাকেটে খরচ রয়েছে। 

নৌকাটিতে কম্পিউটার এবং টেলিভিশনসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল, যা সৌরশক্তি দ্বারা চালিত হত এবং একটি অভ্যন্তরীণ জেনারেটর ছিল। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত স্কুল পরিচালনার জন্য নিয়োগ ছিল দুজন শিক্ষক। 

রাঙ্গাবালী উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বায়েজিদ ইসলাম বলেন, নিরক্ষর মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো দিতে, ভাসমান স্কুলটি সহায়ক ভূমিকা পালন করছিল। 

ওইসব শিশুদের জন্য মান্তা সম্প্রদায়কে দেওয়া মুজিববর্ষের ঘর সংলগ্ন এলাকায় সরকারি স্কুল নির্মাণের প্রস্তাব প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে দেওয়া হয়েছে। 

আর বই দেওয়ার প্রসঙ্গে বলেন, মান্তা শিশুদের স্কুলে তারাই বই দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক যেকোনো স্কুলের শিক্ষার্থী সরকারি বই পাবে।