মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ সুরাইয়া নিজের জন্মদিনে পালন করল পুতুলেরও জন্মদিন

‘এখনও প্রতি মাসে সুরাইয়ার চিকিৎসায় খরচ হয় পাঁচ হাজার টাকার বেশি।’ সাত বছর আগের সেই মামলা সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে না আসায় দুঃখ প্রকাশ করেন সুরাইয়ার স্বজনরা।

মাগুরা প্রতিনিধি
Published : 23 July 2022, 06:14 PM
Updated : 23 July 2022, 06:14 PM

মাগুরায় মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ হয়ে জন্ম নেওয়া শিশু সুরাইয়া সপ্তম জন্মদিন পার করেছে।

শনিবার সন্ধ্যায় পর নতুন জামা পরে কেক কেটে পারিবারিক আয়োজেনে সুরাইয়া তার জন্মদিন পালন করে। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের কেক, চানাচুর, পায়েস, সেমাই, মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

২০১৫ সালের ২৩ জুলাই মাগুরা শহরে ক্ষমতাসীন দলের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় সাড়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা নাজমা বেগম নামে এক গৃহবধূ গুলিবিদ্ধ হন। এর কয়েক ঘণ্টা পর মাগুরা সদর হাসপাতালের জটিল অস্ত্রোপচারে সুরইয়ার জন্ম হয়। ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সুরাইয়ার এক দাদা।

নিজের জন্মদিনের আগে সুরাইয়া তার পুতুলেরও জন্মদিন পালন করে বলে তার মা নাজমা বেগম জানান।

নাজমা বলেন, “সকাল থেকে সে জন্মদিনের আনন্দে মেতে ছিল। চাচাত ভাইবোনের সঙ্গে মাটির পুতুল বানিয়ে চানাচুর আর মুড়ি দিয়ে পুতুলের জন্মদিন পালন করেছে। আর সারাদিনই সে বারবার ‘আজ আমার জন্মদিন’ বলে হৈচৈ করে আনন্দ করেছে।”

সুরাইয়া মাগুরা পুলিশ লাইন্স স্কুলের শিশুশ্রেণির শিক্ষার্থী।

মা নাজমা বলেন, “আমাদের জন্মদিন পালন করার মত সামর্থ্য নেই। কিন্তু সুরাইয়ায় ইচ্ছায় জন্মদিন পালন করতে হচ্ছে। জন্মদিন উপলক্ষে সুইরার বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া ও চাচা কামরুল ভূঁইয়া দুইজন দুটি নতুন জামা দিয়েছেন। এছাড়া কানাডা প্রবাসী হেলাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি সুরাইয়ার জন্য একটি নতুন জামা পাঠিয়েছেন।

“জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িতে রান্না হয়েছে। সুরাইয়ার পছন্দে গরুর মাংস, মুরগির মাংস ও পোলাও রান্না হয়েছে। সঙ্গে ছিল পায়েস ও সেমাই।”

এর আগে দুপুরে সুরাইয়াদের বাড়ি গিয়ে দেখে যায়, সুরাইয়া জন্মদিনের নতুন জামা নিয়ে আনন্দ করছে। সে সময় সে সাংবাদিককে জন্মদিনের দাওয়াত দেয়।

“আজ আমার জন্মদিন। সন্ধ্যার পর কেক কাটা হবে। আপনি আসবেন কিন্তু। খুব মজা হবে। প্রতিদিন জন্মদিন হলে প্রতিদিই মজা হত।”

সন্ধ্যার পর কেক কাটার সময় সুরাইয়ার মা নাজমা বেগম, বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া, একমাত্র বড় ভাই সোহাগ, বোন সুমাইয়া, চাচা-চাচিসহ পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা উপস্থিত ছিলেন।

তাছাড়া মাগরিবের নামাজের পর স্থানীয় মসজিদে দোয়ামহফিলের আয়োজন করা হয় বলে জানান নাজমা বেগম।

সুরাইয়া এখনও পুরোপুরি সুস্থ না।

তার চাচা কামরুল ভূঁইয়া বলেন, “প্রতি মাসে সুরাইয়াকে ঢাকার সাভারে পক্ষাঘাত পুর্নবাসনকেন্দ্রে নিতে হয়। সেখানে যাতায়াতসহ প্রতি মাসে পাঁচ হাজারের বেশি টাকা খরচ হয়।”

সেদিনের গুলির ঘটনায় মামলার বিচার এখনও না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন চাচা বাচ্চু ভূঁইয়া।

তিনি বলেন, “মামলার আসামিরা জামিনে বের হয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এখনও সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে গেল না।”

ঘটনার কয়েক দিন পর নিহত মোমিন ভূঁইয়ার ছেলে রুবেল ভূঁইয়া মাগুরা থানায় ১৬ জনের নামে মামলা করেন। পরে পুলিশের তদন্তে একজনের নাম বাদ পড়ে। তাছাড়া মামলার ২ নম্বর আসামি আজিবর শেখ পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। তবে পুলিশের তদন্তে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হয় তিন নাম। মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

মাগুরা জজ আদালতের পিপি এস্কেন্দার আজম বাবলু বলেন, মামলাটি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। দীর্ঘদিন এ আদালতে বিচারক শূন্যতা ছিল। সে কারণে মামলাটির বিচারকাজ থেমে ছিল। সম্প্রতি এ আদালতে বিচারক শূন্যতা পূরণ হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুত বিচারকাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক