Published : 16 Aug 2025, 07:26 PM
টানা তিন দিন পর বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ের ক্ষত। নদীপাড়ে হাঁটলে চোখে পড়ে ঘর ভাঙা বেড়া, ভেজা আসবাবপত্র, কাঁদায় মাখা উঠান আর ফসলহারা কৃষকের দীর্ঘশ্বাস।
চলতি মৌসুমে বন্যায় এ পর্যন্ত দুই দফা রোপা আমন ক্ষেত নষ্ট হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে তিস্তাপাড়ের কৃষকরা।
নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ভাঙন; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার।
কয়েকদিন টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করে। এতে তৃতীয় দফায় জেলার তিস্তার বাম তীরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। শুক্রবার দুপুরে ডালিয়া পয়েন্টে পানি কমতে শুরু করলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে বন্যার ক্ষত।
হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারীর দিকে যেতে যেতে রাস্তার পাশে ভেসে ওঠে আমনের চারার তীব্র গন্ধ। খেতগুলোতে সবুজ ধানের চারা থাকার কথা থাকলেও সেগুলো এখন কালচে রঙের স্লাইমে পরিণত হয়েছে। অনেক জমি বালুতে ঢেকে গেছে।
কৃষক নুরুজ্জামান দাঁড়িয়ে আছেন তার খেতের পাশে। হালকা রোদে শুকাতে থাকা ফসলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, “তিন বিঘা জমিতে দুই দফা ধানের চারা লাগিয়েছিলাম। বন্যার পানিতে সব শেষ। নতুন করে চারা কেনার মত টাকাও নেই।”
বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় অনেক পরিবার ফিরেছে ঘরে। তবে ঘরে প্রবেশ করতেই নতুন বিপদ। মেঝে জুড়ে কাদামাটি, আসবাবপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। রান্নাঘরের জ্বালানি ভিজে যাওয়ায় অনেক পরিবারে চুলা জ্বলছে না।

কালীগঞ্জ উপজেলার নদীপাড়ের দিনমজুর শফিকুল ইসলাম বলেন, “তিন দিন স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন ঘরে ফিরেছি, কিন্তু ঘরই বসবাসের অযোগ্য। সবকিছু ভিজে গেছে, পোকামাকড় ভরে গেছে।”
হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্না গ্রামের এক ঝুপড়ি ঘরে কথা হয় সফুরা বেগমের সঙ্গে। ভেজা খাটের পাশে বসে কাপড়ে পানি মুছছিলেন তিনি। চোখে মুখে হতাশার ছাপ। তিনি বলেন, “তিস্তা আমাদের সব শেষ করে দিল। খেত গেল, ঘর গেল, মাছ গেল। আমরা আর কত সহ্য করব? ত্রাণ দিয়ে তো একদিন চলে, আমাদের চাই স্থায়ী বাঁধ।”
সিন্দুর্না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কক্ষে ঢুকতেই দেখা গেছে, টেবিল-চেয়ার ভিজে কাঠ আলগা হয়ে আছে। শিক্ষকরা বলছেন, পাঠদান শুরু করলেও শিশুরা ঠিকমত বসতে পারবে না। তাছাড়া বিদ্যালয় ভবন ঘেঁষে ভাঙন শুরু হয়েছে। যেকোনো সময় বিলীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার কৃষক হামিদুর রহমান বলেন, “দুই দোন জমির জমির ধান একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। এলা (এখন) যে ওয়া (রোপা) গারমো তার বেচোনও (লাগানো বীজ) নাই। এলা নয়া করি বেচোন ফ্যালে সেই বেচোন দিয়া ওয়া লাগার সমায়ও নাই। হামার কৃষককের ঘরে মরণ ছাড়া আর উপায় নাই।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ কৃষকের কাছে আর রোপণের চারা নেই, নেই নতুন করে চারা কেনার সামর্থ্যও।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তৃতীয় দফার বন্যায় জেলার ৯১৫ হেক্টর আমন ক্ষেতে ও ৬৩ হেক্টর অন্যান্য ফসল নিমজ্জিত হয়েছে; যার সামান্য কিছু নষ্ট হলেও নতুন করে রোপণ করার সময় রয়েছে।
বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ সীমিত দাবি করে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইখুল আরিফিন বলেন, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে সংরক্ষিত আমনের চারা আবার রোপণ করা যাবে।