Published : 05 May 2026, 02:04 PM
কৃষি প্রধান ও খাদ্য উদ্বৃত্ত সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরে এখন পুরোদমে চলছে বোরো ধান কাটা ও মাড়াই। মাঠের সোনালি ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
ধান কাটাকে কেন্দ্র করে কৃষি শ্রমিকের হাটগুলোও এখন জমজমাট। প্রতিদিন ভোরে ফজর নামাজের সময় থেকে শহরের শেখহাটি বাজার, খরারপাড় ও শেরি ব্রিজ এলাকায় এ কৃষি শ্রমিকের হাট বসে।
কিন্তু ধান কাটার কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকায় পৌঁছেছে; যা অনেক ক্ষেত্রে ধানের দামের চেয়েও বেশি। এতে বিপাকে পড়েছেন গৃহস্থ কৃষকরা।
শেখহাটি বাজার এলাকার কৃষক হাবিবুর রহমান বলছিলেন, “কয়েকদিন আগে কৃষি শ্রমিকের মজুরি ছিল এক হাজার টাকা। আর এখন স্থান ভেদে ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “বাজারে মোটা ধান প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং শিপন (চিকন) ধান ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ ধানকাটা একজন শ্রমিকের মজুরি জোগাতে এখন দুই মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এভাবে গিরস্তি করে টিকে থাকা দায়।”
শেরপুর শহর, আশেপাশের গ্রাম এবং পাশের জেলা জামালপুর থেকে ধান কাটার কৃষি শ্রমিকরা দলে দলে ধান কাটার কাঁচি, ধানের আঁটি বহন করার রশি এবং বাঁশের তৈরি ধান বহনের ঝুড়ি বা ‘ভাং’ নিয়ে হাটগুলোতে হাজির হন।

সরেজমিনে দেভা গেছে, গেরস্থ কৃষকরা সেখানে গিযে শ্রমিকদের সঙ্গে মজুরি নিয়ে দরদাম করেন। বনিবনা হলে তারা শ্রমিকদের নিয়ে কাজের স্থলে চলে যান।
কাছের হলে হেঁটে এবং দূরের হলে অটোরিকশায় করে কৃষি শ্রমিকদের ধানের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত জমজমাট থাকে কৃষি শ্রমিকের হাট।
মাঠ থেকে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধান কাটা, কাঁদা পানি মারিয়ে ধান নিয়ে আসা নিয়ে আসা, মাড়াই করা এবং ঘরে ধান তুলে দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজ করছেন কৃষি শ্রমিকেরা।
সদরের পাকুরিয়া এলাকার কৃষক আব্দুল হাকিম বলেন, “শেরপুরের অধিকাংশ ক্ষেতের বোরো ধান এখন পেকে গেছে। যখন সব ক্ষেতের ধান একসঙ্গে পাকে, তখন সব কৃষকই চান দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে। তাই এ সময়টা কৃষি শ্রমিকের চাহিদার বেড়ে যায়; যার কারণে সংকট তৈরি হয়।
নাগপাড়া আব্দুল কুদ্দুস ও জয়নালসহ অন্যান্য কৃষকরা বলছেন, কৃষি শ্রমিকের কদর অনেক বেড়ে যাওয়ায় এখন মজুরি ১২০০ টাকা থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে।
মজুরি ছাড়াও শ্রমিকদের দুই বেলা খাবার দিতে হচ্ছে বলে জানান তারা।
তবে ধান কাটার শ্রমিকরা বলছেন, মজুরি বেশি হলেও প্রতিকূল পরিবেশ উপেক্ষা করে তাদের ফসল ঘরে তুলতে হয়। পাশপাশি তাদের কাজের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
কৃষি শ্রমিক শফিক আয়নাল বলেন, “মজুরি ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা হলেও আমাদের কাজ করতে অনেক বেশি কষ্ট করতে হয়। বৃষ্টিতে ভিজতে হয়; পানির মধ্যে ধান কেটে কাঁদা পানি মাড়িয়ে ক্ষেত থেকে ধান নিয়ে আসতে হয়। এছাড়া পানিতে জোঁকের ভয় রয়েছে। অনেক সময় কাঁচা ধান হাতে লাগলে কেটে যায়। আবার শামুকে পা কেটে যায়।”
সুমন ও রফিক নামের আরও দুই শ্রমিক বলছিলেন, এখন বাজারে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। ফলে এই আয়েও তাদের সংসার চালানো কঠিন।
একদিকে বৈরী আবহাওয়া, অন্যদিকে শ্রমিকের চড়া মজুরি যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন কৃষকরা।
নাগপাড়া এলাকার আব্দুল কুদ্দুস ও জয়নালসহ অন্য কৃষকরা আক্ষেপের স্বরে বলেন, এখন প্রায়ই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, বৃষ্টি হয়। ক্ষেতে পানি জমে গেছে। ধান কাটা মাড়াই করা ও খড় শুকানো সহ সবকিছুতেই অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। আবার রোদ না উঠলে অনেক সময় ধান ও খড় পচে নষ্ট হয়। এভাবে গিরস্তি করে আর পোষাচ্ছে না।
সদর উপজেলার পলাশিয়া গ্রামের কৃষক আইয়ুব আলী বলছিলেন, “এবার বোরো আবাদ করে লোকসানে আছি। ধান ভালো হইছে। কিন্তু বাজারে ধানের দাম কম। ওইদিকে কামলার দাম বেশি।
“বৃষ্টি হওয়ার কারণে ক্ষেতের মধ্যে পানি ও কাঁদা থাকায় কামলারা সহজে যাবার চায়না। খুব মুশকিলের মধ্যে আছি।”

একই উপজেলার পাকুরিয়া গাংপাড় গ্রামের কৃষক খোকন মিয়া বলেন, “ধান আবাদ করবার গেলে খরচ বেশি। আবার ধান যখন বিক্রি করতে যাই তখন ধানের দাম কম। ধান কাটার কামলার বায়না অত্যধিক; দৈনিক ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা। তাও আবার কামলা পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, “সবকিছু মিলাইয়া ধান আবাদ কইরা আমরা লোকসানের মধ্যে আছি। প্রতি মণ ধান বর্তমানে ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
এদিকে শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাখাওয়াত হোসেন বলছেন, এবার ৯১ হাজার ৮৮৯ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অর্জিত হয়েছে ৯১ হাজার ৮১১ হেক্টরে।
তিনি বলেন, “ফসলের মাঠের অবস্থা ভালো রয়েছে।”
জেলায় এ পর্যন্ত মাঠে থাকা ২৪ শতাংশ জমির বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে বলে জানান সাখাওয়াত হোসেন।