Published : 10 Mar 2026, 06:45 PM
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে লিফটের নিচে নিখোঁজ নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় লিফটের ত্রুটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি করছে গণপূর্ত বিভাগ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গণপূর্ত বিভাগ বলছে লিফটে আপাতত কোনো বড় ত্রুটি পাওয়া যায়নি, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি- মাসখানেক ধরেই লিফটির দরজা হাতে টান দিলেই খুলে যেত। তা জানানো হলেও ব্যবস্থা নেয়নি গণপূর্ত বিভাগ।
গত শনিবার সকালে হাসপাতালের একটি লিফটের নিচ থেকে কোহিনূর আক্তারের (৩২) আংশিক পচে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ ।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের দক্ষিণ ডেইলপাড়া এলাকার এই নারী মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। মেয়ের দেখাশোনা করার মধ্যেই বুধবার দুপুরে নিখোঁজ হন তিনি। চারদিন পর লিফটের নিচে পাওয়া যায় তার মরদেহ।
হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কোহিনূর চতুর্থ তলায় লিফটের সামনে এসে দুই হাতে দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এরপর তাকে আর কোনো তলায় নামতে দেখা যায়নি।
এর মধ্যেই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও স্বজন অভিযোগ করেন, লিফটের সেন্সর ঠিকমতো কাজ না করার বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই নানা অভিযোগ ছিল। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।
কিন্তু তখন হাসপাতালের লিফটের ত্রুটির অভিযোগ অস্বীকার করে সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তাগিন মাহমুদ শহেল লিফটের ত্রুটির কথা অস্বীকার করে দুর্ঘটনার জন্য ওই নারীর অসচেতনতাকে দায়ী করেছিলেন।
পরে অবশ্য হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (প্রশাসন) ডা. শান্তনু ঘোষ লিফটের ত্রুটির কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ২০২৩ সাল থেকেই লিফটের নানান ত্রুটি দেখা দিয়েছিল।
কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার দায় তিনি দিয়েছেন গণপূর্ত বিভাগকে।
তিনি বলেন, হাসপাতালের দুটি লিফটই দেখাশোনা করে গণপূর্ত বিভাগ। তাদের নিয়োগ করা ব্যক্তিরাই লিফট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “লিফটের নানান ত্রুটি নিয়ে একাধিক চিঠি দেয়া হয় গণপূর্ত বিভাগের কাছে। এমনকি লিফট পরিবর্তনের চিঠিও দেয়া হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।”
তবে তা অস্বীকার করে কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, “এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের কোনো অভিযোগ দেয়নি।”
মঙ্গলবার তারা হাসপাতালের লিফটটি পরিদর্শন করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা লিফটটি পরিদর্শন করেছি। আপাতত তেমন কোনো বড় ত্রুটি চোখে পড়েনি। ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে লিফটটি পরীক্ষা করা হয়েছিল।”
ত্রুটি না থাকলে এমন দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটল- এ প্রশ্নে নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী দেখা গেছে, লিফটের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগেই তিনি হাত দিয়ে ফেলেছিলেন। সে কারণে দরজাটি আবার খুলে গেছে।”
তিনি জানান, আরও দুই দিন লিফটটি পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এরপর সেটি আবার চালু করা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন
তবে এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে কয়েকজন যন্ত্র প্রকৌশলী বলছেন, আধুনিক লিফটে সাধারণত ইন্টারলক সিস্টেম থাকে, যার ফলে লিফটের কেবিন নির্দিষ্ট তলায় না থাকলে দরজা খোলার কথা নয়।
যন্ত্র প্রকৌশলী হাসিনুর রেজা চঞ্চল বলেন, “যদি লিফট অন্য তলায় থাকে, তাহলে নিচের তলায় এত সহজে দরজা খোলা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। দরজা খুলে সরাসরি শ্যাফটে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে সেটি লিফটের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।”
তিনি বলেন, লিফটের সেন্সর, ডোর লক ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
স্বজনদের অভিযোগের আলামত মিলেনি
ঘটনার পর নিহতের স্বজনদের কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে কোহিনূরের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুললেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ ও চিকিৎসক।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. শান্তনু ঘোষ বলেন, “এ ধরনের কোনো আলামত আমরা পাইনি।”
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মো. ছমি উদ্দিন বলেন, “ঘটনার দিনই একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। সুরতহাল কিংবা মরদেহ উদ্ধারের সময় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।”
ময়নাতদন্তে থাকা একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তারাও প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের কোনো লক্ষণ পাননি। মৃত্যুর কারণ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে।
তদন্তে কমিটি
ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিং নিও বলেন, কমিটির প্রধান করা হয়েছে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আলী হোসেনকে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
কমিটির সদস্য ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. ইয়াসির আরাফাত বলেন, “প্রাথমিকভাবে এটি দুর্ঘটনা মনে হচ্ছে। তবে মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
কক্সবাজারের প্রায় ২৭ লাখ মানুষের জন্য জেলা সদর হাসপাতালটি অন্যতম প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন এখানে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও আশপাশের এলাকা থেকে শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে লিফটের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কক্সবাজার কমিউনিটি এলায়েন্স এর মূখ্য সমন্বয়ক মোহিব্বুল মোক্তাদির এর মতে, কোহিনূর আক্তারের মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
আগের সংবাদ
কক্সবাজার হাসপাতালের লিফটে 'ত্রুটি', নিচে মিলল নিখোঁজ নারীর লাশ